সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: অভিযোগ জানার পরেও কেন সক্রিয় হলো না বাংলাদেশ কনস্যুলেট?
Bangladesh consulate Saudi Arabia: সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় নৈতিকতার নামে শাস্তি, ন্যায়বিচারের অধিকার, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতার প্রশ্ন।
দুই বাঙালির মৃত্যুদণ্ড সৌদি আরবে। কিন্তু যে দেশের নাগরিক তাঁরা, সেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা কি জানতেন, তাঁদের মৃত্যুদণ্ড হতে চলেছে? আরও বিস্ময়কর বিষয়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ওই দুই বন্দির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কথা জানতে পেরেছিল বাংলাদেশি কনস্যুলেট। তা সত্ত্বেও তাঁদের বাঁচানোর জন্য শেষ মুহূর্তে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেল না কেন?
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় নৈতিকতার নামে শাস্তি, ন্যায়বিচারের অধিকার, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতার প্রশ্ন।
কিন্তু কেন দুই বাঙালিকে এমন নির্মম শাস্তি দেওয়া হলো? কী করেছিলেন তাঁরা?
সৌদি আরবের সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, তাঁরা মক্কার একটি মসজিদের ভিতরে ‘অনৈতিক কাজে’ লিপ্ত হয়ে সেই স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘন করেছিলেন।
কিন্তু বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেটের হাতে আসা বন্দিদের তালিকায় ছিল আলাদা তথ্য। সেখানে পুরুষ বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম আবদুল বাসিরের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি বা সাইবার অপরাধের অভিযোগের কথা লেখা ছিল। অন্যদিকে, নারী বাংলাদেশি সুইটি আখতারের বিরুদ্ধে ছিল ‘জেনা’ বা বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের অভিযোগ। দু’জনেই সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন এবং ২০২৩ সালের অগাস্ট থেকে আটক ছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladeshi execution Saudi Arabia viral video: সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের ভাইরাল ভিডিওটি কি আদৌ সত্যি?
এখানেই উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কনস্যুলেটের নথিতে আলাদা অভিযোগ, আর সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে মসজিদের ভিতরে ‘অনৈতিক কাজের’ কথা। এই দুই বর্ণনার মধ্যে ঠিক কী সম্পর্ক, মামলার প্রকৃত ঘটনা কী, কোন প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তবে কেন এই মৃত্যুদণ্ড?
সৌদি আরবে বিচারব্যবস্থায় শরিয়াহর ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিচারকদের বিবেচনাধীন শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে এই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডকে ‘তা’জির’ শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, মামলার সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ও পূর্ণ রায় না দেখে মৃত্যুদণ্ডের পিছনের যুক্তি সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সৌদি আরবে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং এ ধরনের অভিযোগে শাস্তি দেওয়ার সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির মতে, সম্মতিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এমন শাস্তি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিরুদ্ধে।
এখানে ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় শাস্তির পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম পালন মানুষের অধিকার। কিন্তু ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে ব্যবহার করে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হলে, সেই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার অধিকারও মানুষের রয়েছে। কোনো স্থানের পবিত্রতা রক্ষার যুক্তি কি মানুষের জীবনের অধিকারের চেয়ে বড় হতে পারে? কোনো অভিযোগের জবাবে মৃত্যুদণ্ডই কি একমাত্র পথ?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
history of book burning: শারদ-আবহে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী বইয়ের স্টল, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা, বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে জুডার রাজা যিহোয়াকিমের স্ক্রল পোড়ানো থেকে নালন্দার গ্রন্থাগার, নাৎসিদের ২৫,০০০ বই পোড়ানো, জাফনা পাবলিক লাইব্রেরি, সারায়েভো হয়ে মাওয়ের চিন, সর্বত্র বই ধ্বংসকারিরা, প্রতিরোধী স্মৃতি ও কল্পনার উপর আঘাত হেনেছে বারবার।
এটা শুধু ধর্মীয় মৌলবাদের প্রশ্ন নয়; এটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নও। ধর্মের নামে এমন শাস্তিকে সমর্থন করা যায় কি না, তা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তোলা জরুরি। কারণ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে ভুল বিচার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পাওয়ার ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় না।
কেন কিছুই জানতে পারল না বাংলাদেশ?
এই ঘটনার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক এটাই। বিবিসি বাংলা ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের একটি তালিকা পায়। সেই তালিকায় এই দুই নাগরিকের নাম ও অভিযোগ ছিল। কিন্তু তাঁদের নামের পাশে মৃত্যুদণ্ডের কথা লেখা ছিল না বলে কনস্যুলেটের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সৌদি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ তাঁদের আটকের কথা একেবারেই জানত না, এমনটা নয়। কনস্যুলেটের কাছে তাঁদের নাম, আটক হওয়ার তারিখ, কারাগারের অবস্থান এবং অভিযোগের তথ্য পৌঁছেছিল। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের কথা জানা ছিল না, এমনটাই জানিয়েছে কনস্যুলেট। আর এখানেই বাংলাদেশের নিজস্ব দায়ের প্রশ্ন উঠছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অভিযোগের কথা জানার পর কনস্যুলেটের আরও দ্রুত তৎপর হওয়া উচিত ছিল। অন্যদিকে, কনস্যুলেটের ব্যাখ্যা হলো সৌদি কর্তৃপক্ষ সাজা কার্যকরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো আগাম বার্তা দেয়নি; বন্দিদের তালিকাতেও সাজার উল্লেখ ছিল না। দুই পরিবারের তরফেও আইনগত সহায়তা চেয়ে যোগাযোগ করা হয়নি বলে কনস্যুলেট জানিয়েছে।
কিন্তু এই ব্যাখ্যার পরেও প্রশ্ন থেকেই যায়। তালিকায় ‘জেনা’ বা সাইবার অপরাধের উল্লেখ পাওয়ার পর কেন মামলার রায় ও সম্ভাব্য শাস্তি সম্পর্কে জরুরি ভিত্তিতে জানতে চাওয়া হলো না? কেন দুই বন্দির আইনি অবস্থান যাচাই করে তাঁদের সহায়তার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হলো না? বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব কি শুধুই পরিবারের আবেদনের অপেক্ষায় থাকতে পারে?
এখানে সৌদি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মৃত্যুদণ্ডের কথা আগে জানানো হয়নি বলে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে কনস্যুলার বিজ্ঞপ্তির আইনি দিকটি সতর্কভাবে দেখতে হবে: ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে আটক বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার এবং বন্দির অনুরোধের ভিত্তিতে কনস্যুলেটকে জানানোর বিধান রয়েছে। এই নির্দিষ্ট ঘটনায় সেই অধিকার কীভাবে প্রয়োগ হয়েছিল, বন্দিরা কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কি না এবং কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘিত হয়েছে কি না— তা নির্ধারণের জন্য আরও নথি ও আইনি বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ধর্মের নামে কোনো রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা যদি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও তথাকথিত নৈতিকতার প্রশ্নে প্রাণদণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে তাকে প্রশ্ন করা ধর্মের বিরোধিতা নয়— বরং মানুষের বাঁচার অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে এবং মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অর্থ, কোনপো অভিযোগকেই বিচার ছাড়াই সত্য ধরে না নেওয়া, আবার ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের নামেও নিষ্ঠুর শাস্তিকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে না রাখা।







