প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

inscript
৩ মিনিট
প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

আনন্দের মাঝেই বিষাদের সুর। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্টের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৯ জনের প্রাণহানির খবর সামনে এসেছে। এই ঘটনার পর ভিড় নিয়ন্ত্রণ, মণ্ডপের ভিতরের আলোর ব্যবস্থা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সপ্তমীর সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে চোরবাগানের মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন ব্যারাকপুরের বাসিন্দা, ২৬ বছর বয়সি রিয়াঙ্কা রায়। দুর্ঘটনার ঠিক আগেই মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তাঁরা। ফলে ভয়াবহ ঘটনার সরাসরি সাক্ষী না হলেও, মণ্ডপের ভিতরে ভিড়ের চাপ এবং বেরিয়ে আসার সময়কার পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। ইনস্ক্রিপ্টের প্রতিনিধির সঙ্গে কথোপকথনে সেই অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে পুজো উদ্যোক্তাদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছেন রিয়াঙ্কা।

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল। ভিড়ের চাপে তাঁরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফোনে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। রিয়াঙ্কার অভিযোগ, ভিআইপি ও সাধারণ দর্শনার্থীদের একই প্রবেশপথ দিয়ে ঢোকানো হচ্ছিল। অথচ তাঁর আগের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ওই মণ্ডপে একাধিক প্রবেশপথ খোলা থাকত। কেন অন্য গেটগুলি বন্ধ রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

মণ্ডপের ভিতরের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে রিয়াঙ্কা জানান, “সেখানে এতটাই অন্ধকার ছিল যে পাশের মানুষকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। দীর্ঘক্ষণ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে গরমে অসুস্থ বোধ করছিলাম।” তাঁর অভিযোগ, সামান্য সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়া বা হাওয়া খাওয়ার চেষ্টা করলেও স্বেচ্ছাসেবকেরা দর্শনার্থীদের সরিয়ে দিচ্ছিলেন। বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের পক্ষে এই পরিস্থিতিতে ঠাকুর দেখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারত বলে মনে করেন তিনি। তাঁর দাবি, ভিড় সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত পুলিশকর্মীও চোখে পড়েনি। স্বেচ্ছাসেবকদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই চোরবাগানে ছিলেন সম্পূর্ণা

পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

রিয়াঙ্কার আরও অভিযোগ, ভিড়ের চাপের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে মণ্ডপের ভিতরে দর্শনার্থীদের বারবার দৌড়োদৌড়ি না করার জন্য সতর্ক করা হচ্ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “ঘোষণায় এমন কথাও বলা হচ্ছিল যে কেউ পদপিষ্ট হলে উদ্যোক্তাদের দোষ দেওয়া যাবে না।” রিয়াঙ্কার মতে, এই ধরনের সতর্কবার্তার পাশাপাশি ভিড় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া আরও জরুরি ছিল। তাঁর দাবি, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শনার্থীদের একসঙ্গে না ছেড়ে অল্প অল্প করে এগোতে দেওয়া হচ্ছিল। ফলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর যখন কিছুটা এগোনোর সুযোগ মিলছিল, তখন ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ি তৈরি হচ্ছিল।

সামনের দিকে ভিড় বাড়তে থাকায় এক পুলিশকর্মী তাঁদের পিছনের একটি পথ দিয়ে বেরিয়ে যেতে বলেন বলে জানিয়েছেন রিয়াঙ্কা। সেই পথ ব্যবহার করেই বন্ধুরা মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে আসেন। বাইরে বেরিয়ে একটি চায়ের দোকানে চা অর্ডার করার পরই বৃষ্টি নামে। তাঁর কথায়, চা হাতে পাওয়ার আগেই তাঁরা দুর্ঘটনার খবর শুনতে পান। অর্থাৎ, কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই তাঁরা সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। রিয়াঙ্কার ধারণা, বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর ভিজে যাওয়া এড়াতে অনেকেই আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন, যা ভিড়ের চাপে আরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তাঁর মতে, শুধু বৃষ্টিকে এই ঘটনার কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

মণ্ডপ থেকে বেরিয়ে আসার পরেও ভিড় থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ ছিল না বলে দাবি রিয়াঙ্কার। তাঁর অভিযোগ, আশপাশের কয়েকটি বড় রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং দর্শনার্থীদের নির্দিষ্ট একটি গলি দিয়ে বের করে দেওয়া হচ্ছিল। সেখানেও ঠেলাঠেলি হচ্ছিল বলে জানান তিনি। ওই পথে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক না থাকায় পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছিল বলে তাঁর দাবি। রিয়াঙ্কার বক্তব্য, মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশ থেকে শুরু করে বাইরে বেরিয়ে আসা পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাপনাতেই ভিড় নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি ছিল।

চোরবাগানের মণ্ডপে ভিড় তৈরি হওয়ার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রিয়াঙ্কা। তাঁর দাবি, দর্শনার্থীদের দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা হচ্ছিল এবং অল্প অল্প করে এগোতে দেওয়া হচ্ছিল। তাঁর অনুমান, মণ্ডপে ভিড়ের ছবি তুলে প্রচার করার জন্যও এই পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। পুরস্কার বিতরণের সময় সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি এবং ভিড়ের ছবি তোলার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি এই অভিযোগ করেন।

একই দিনে আহিরীটোলা ও কাশী বোস লেনের মতো উত্তর কলকাতার অন্য পুজোও দেখেছিলেন রিয়াঙ্কা। তাঁর দাবি, সেখানেও সরু গলি দিয়ে দর্শনার্থীদের যাতায়াত করতে হলেও ভিড়কে একটানা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। চোরবাগানে সেই ব্যবস্থার অভাব ছিল বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতায়, এত বছরের পুজো পরিক্রমায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। বিশেষ করে মণ্ডপের ভিতরে অন্ধকার, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা এবং ভিড়ের চাপে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তাঁকে আতঙ্কিত করে তোলে।

চোরবাগানের একটুর জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন রিয়াঙ্কা। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— ভিড়ের সম্ভাবনা আগে থেকে বোঝা সত্ত্বেও কেন পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, মণ্ডপের ভিতরে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা ছিল কি না এবং পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা কতটা কার্যকর ছিল। রিয়াঙ্কার এই প্রশ্নগুলির উত্তর কি পাওয়া যাবে? তবে এই অভিজ্ঞতা পুজোর মতো বড় জনসমাগমে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি নির্গমনপথ এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।

বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই চোরবাগানে ছিলেন সম্পূর্ণা

পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

যা ঘটেছিল চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে

Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।