তান্ত্রিকের স্বপ্নাদেশে প্রতিষ্ঠা, আজও চলছে প্রাচীন রীতি! শিবপুরের হাজার হাত কালীর ইতিহাস
Hazaar Haath Kali: হাওড়ার শিবপুরের হাজার হাত কালীমন্দিরের ইতিহাস প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। কথিত আছে, তান্ত্রিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নাদেশেই এই মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়। প্রায় ২৫ ফুট উঁচু দেবীমূর্তির হাজার হাত ঘিরে রয়েছে নানা লোকবিশ্বাস। তন্ত্রমতে পুজো হলেও এখানে নেই পশুবলির রীতি। কীভাবে শুরু হয়েছিল এই মন্দিরের ইতিহাস?
হাজার হাত তাঁর! প্রায় ২৫ ফুট উঁচু বিশালাকার কালীমূর্তি। দেবীর এমন রূপ দেখলে বিস্মিত হতে হয়। হাওড়ার শিবপুরে এই হাজার হাত কালীর পিছনে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাস। কথিত আছে, এক তান্ত্রিকের স্বপ্নাদেশ থেকেই এই মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। পরে স্থানীয় এক ধনী পরিবারের সহযোগিতায় ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মন্দিরটি। তন্ত্রমতে পুজো হলেও এখানে নেই পশুবলির প্রচলন।
স্বপ্নাদেশে মন্দির প্রতিষ্ঠা
প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, শিবপুরের মুখোপাধ্যায় পরিবারের সন্তান তান্ত্রিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একদিন স্বপ্নে মা চণ্ডীর দর্শন পান। দেবী তাঁকে কালীর এক বিশেষ রূপ দেখিয়ে সেই রূপের মন্দির প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর থেকেই আশুতোষবাবু দেবীর এই রূপের পুজো শুরু করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কিন্তু মন্দির তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তাঁর বা তাঁর পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। সেই সময় স্থানীয় ধনী হালদার পরিবার এগিয়ে আসে। তাঁদের আর্থিক সহযোগিতায় ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শিবপুরের হাজার হাত কালীমন্দির। মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয় দেবীর সেই বিশেষ রূপ। এরপর থেকেই তন্ত্রমতে দেবীর পুজো হয়ে আসছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?
দেবীর হাজার হাতের বিশেষ মাহাত্ম্য
প্রায় ২৫ ফুট উঁচু দেবীমূর্তি। দেবীর রূপ অন্য কালীমূর্তির তুলনায় একেবারেই আলাদা। তাঁর বাঁ হাতে রয়েছে খড়্গ এবং ডান হাতে পঞ্চশূল। দেবীর বাঁ পা সিংহের উপরে এবং ডান পা পদ্মফুলের উপরে স্থাপিত।
মন্দিরের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীর দুই পা দুই জায়গায় থাকার অর্থ, তিনি জল ও স্থল—সর্বত্র বিরাজমান। ডান হাতে থাকা পঞ্চশূল দিয়ে তিনি ভক্তদের রক্ষা করেন। অন্যদিকে, বাঁ হাতে থাকা খড়্গ ভুল পথে চলা মানুষকে সতর্ক করার প্রতীক।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dakat Kali: দক্ষিণ কলকাতার চেতলায় রয়েছে রহস্যে মোড়া প্রাচীন ডাকাত কালীবাড়ি। লোককথা অনুযায়ী, একসময় ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরে পুজো দিত দস্যুরা। লুটের সম্পদও নিবেদন করত দেবীর চরণে। কিন্তু কেন শিকলে বাঁধা রয়েছে দেবীমূর্তি? নীলু-ভুলু ডাকাতের কাহিনি থেকে সারদা দেবীর আগমন—জানুন এই মন্দিরের ইতিহাস।
দেবীর হাজারটি হাতের কথা প্রচলিত থাকলেও এখনও পর্যন্ত কেউ সেই হাত গুনে শেষ করতে পারেননি বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। এমনকি দেবীর হাত গোনা উচিত নয় বলেও একটি লোকবিশ্বাস রয়েছে। দেবীর নাম থেকেই এলাকার নাম হয়েছে ‘হাজার হাত কালীতলা’।
তন্ত্রমতে পুজো, নেই বলিপ্রথা
প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এই মন্দিরে তন্ত্রমতে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। তবে এখানে পশুবলির প্রচলন নেই। প্রাচীন রীতি মেনে এখনও মুখোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরাই দেবীর পুজোর দায়িত্ব পালন করেন। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা আশুতোষ মুখোপাধ্যায় দেবীর নিত্যপুজো ও মঙ্গলারতিতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেই ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। মন্দিরের নামে তিনি কিছু সম্পত্তি রেখে যান। সেই সম্পত্তি থেকে পাওয়া আয় দিয়েই দেবীর পুজো, মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের কাজ চলে বলে জানা যায়।
কালীপুজো ও বিশেষ ভোগের আয়োজন
প্রতিদিন নিয়ম মেনে দেবীর পুজো হলেও বুদ্ধপূর্ণিমা ও দীপাবলিতে বিশেষ আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে কালীপুজোর দিন মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ দেবীর দর্শন করতে আসেন। ভিড় সামলাতে নিরাপত্তারক্ষীও মোতায়েন করতে হয়। দেবীর পুজো দিনে তিনবার হয়—ভোরে, দুপুরে এবং রাতে। ফল ও মিষ্টি দিয়ে নিত্যপুজোর পাশাপাশি বিশেষ তিথিতে দেওয়া হয় নানা ধরনের ভোগ। কালীপুজোর দিন খিচুড়ি, পায়েস, পোলাও, ভাত, মাছ ও মিষ্টি-সহ বিভিন্ন পদ দেবীকে নিবেদন করা হয়।






