দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

inscript
২ মিনিট
দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন বহু মানুষ। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন ফেলে আসা ভিটেমাটি, পরিচিত পরিবেশ আর শিকড়ের স্মৃতি। সেই স্মৃতিরই এক নিদর্শন দক্ষিণ কলকাতার ঢাকা কালীবাড়ি। প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরের প্রকৃত নাম শ্রীশ্রী রক্ষাকালীমাতার মন্দির।

দেশভাগের স্মৃতি থেকেই নামের সূত্রপাত

এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ননীগোপাল চক্রবর্তীর পরিবারের নাম। ১৯৫০-এর দশকে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু হিন্দু পরিবার পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য হয়। সেই সময় বরিশাল থেকে কলকাতায় চলে আসেন ননীগোপাল চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবার। নতুন শহরে এসে তাঁরা দেখেন, বাড়ির আশপাশে কোনও হিন্দু মন্দির নেই।

তখন প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের যাদবপুর থানা থেকে টালিগঞ্জ মোড় পর্যন্ত এলাকার মানুষ একটি বেদিতে দেবী রক্ষাকালীর পুজো করতেন। সেই বেদির পিছনেই ছিল ননীগোপালবাবুর বাড়ি। একদিন বৃষ্টির পরে তিনি দেখেন, খোলা আকাশের নীচে থাকা বেদিতে দেবী বৃষ্টিতে ভিজছেন। এই দৃশ্য তাঁকে খুব কষ্ট দেয়। এরপরই তিনি দেবীর জন্য একটি পাকা মন্দির তৈরির উদ্যোগ নেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শুধু ব্যারাকপুর নয়, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে বাংলাতেই আছে আরও এক মন্দির, জানেন কোথায়?

Kali Temple : রামকৃষ্ণ এবং কালী নিয়ে বাঙালি তথা হিন্দুদের মধ্যে চিরকালই একটা ঘোরতর আবেগ রয়েছে, তাই দূর থেকে যাঁরা দক্ষিণেশ্বর দর্শন করতে যেতে পারেন না তাদের জন্যই এরূপ ভাবনার বহিঃপ্রকাশ বনগাঁর মন্দিরে।

তবে মন্দির তৈরির কাজ সহজ ছিল না। স্থানীয় কয়েকজন মানুষের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের উপর একটি চালাঘরে দেবীর পুজোর ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

ননীগোপাল চক্রবর্তীর নিজের শিকড় ছিল ঢাকায়। দেশভাগের কারণে তাঁকে জন্মভূমি ছেড়ে কলকাতায় আসতে হয়েছিল। তাই নতুন শহরে মন্দির গড়ে তুললেও নিজের পুরনো শহরের স্মৃতি মুছে যেতে দিতে চাননি তিনি। ঢাকার বিখ্যাত ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ভাবনা ও স্মৃতি থেকেই কলকাতার এই মন্দিরের নাম রাখেন ‘ঢাকা কালীবাড়ি’।

ঢাকা কালীবাড়ি নামের আর একটি ব্যাখ্যা

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শিব নয়, পায়ের নীচে থাকে অসুর, সিংহ! চমকে দেবে ৩০০ বছরের পুরনো বাংলার এই কালীর রহস্য

Balurghat Kali Puja: দোল উৎসবের সময় হয় এই বিশেষ পুজো, অবাক করবে বাংলার তিনশ বছরের পুরনো এই কালীর রহস্য

মন্দিরের নামকরণ নিয়ে আরও একটি স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে। কথিত আছে, একসময় এই এলাকায় ‘ঢাকা ঔষধালয়’ নামে একটি পরিচিত ওষুধের দোকান ছিল। সেই দোকানের নাম থেকেই এলাকার একটি মোড়ের নাম হয় ‘ঢাকার মোড়’। পরে সেই এলাকার কালীমন্দিরও লোকমুখে ঢাকা কালীবাড়ি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ

প্রথমদিকে মন্দির পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। যজমানদের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য অর্থেই পুজোর আয়োজন চলত। প্রতি বছর কালীপুজোয় মাটির প্রতিমা এনে পুজো করা হতো এবং সেই প্রতিমা এক বছর ধরে রাখা হতো। পরে ১৯৭৯ সালে মাটির প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে সেখানে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে সেই কষ্টিপাথরের মূর্তিতেই দেবী পূজিতা হন।

এই মন্দিরে দক্ষিণাকালী রূপে দেবীর আরাধনা করা হয়। পাশাপাশি আগে এই জায়গায় রক্ষাকালীর পুজো হতো বলে এখনও রক্ষাকালীর পুজো এবং নিত্যপুজোর রীতি বজায় রয়েছে। মূলত বৈদিক নিয়ম মেনেই এখানে পুজো হয়। তাই মন্দিরে বলিপ্রথার প্রচলন নেই।

কালীপুজোয় বিশেষ আয়োজন

ঢাকা কালীবাড়িতে সারা বছরই নিয়মিত পুজো হয়। তবে কালীপুজোর দিন মন্দিরে বিশেষ আয়োজন থাকে। ষোড়শ উপচারে দেবীর আরাধনা করা হয়। ভোগে থাকে অন্ন, নিরামিষ তরকারি, পাঁচ রকমের ভাজা, পায়েস, চাটনি এবং দু’ধরনের মাছের পদ। পরের দিন অন্নকূট উৎসবের আয়োজন করা হয়। সেদিন খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, ইলিশ ও রুই মাছ, চাটনি এবং পায়েস নিবেদন করা হয়। এই অন্নকূটে প্রায় তিন হাজার মানুষ অংশ নেন বলে জানা যায়। এ ছাড়াও বৈশাখ মাসের শেষ শনিবার মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করা হয়। বিশেষ তিথিতে বিশেষ পুজোর আয়োজনও থাকে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেন মানবাজারে জোট বাঁধল আদিবাসী সমাজ?

Adivasi Mahasamavesh in Purulia's Patharkata: পুরুলিয়ার মানবাজার মহকুমার পাথরকাটায় ‘ভারত জাকাত মাঝি পরগনা মহল’-এর ডাকে প্রায় ২০টি আদিবাসী সংগঠনের মহাসমাবেশ ঘটে গেল। কুড়মিদের এসটি তালিকাভুক্তি করার রাজনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা, বন অধিকার আইন ২০০৬-এর বাস্তবায়ন, ২০২৩ বন সংরক্ষণ আইন বাতিল, অষ্টম তফসিলে আদিবাসী ভাষা অন্তর্ভুক্তির দাবি নিয়ে তারা জমায়েত করলেন এই মহাসমাবেশে।

শহরজুড়ে ভূতের গল্পের আসর

Bhoot Chaturdashi: ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায় বাঙালিকে তার নিজের ভূত, সাহিত্য আর ছেলেবেলার স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে ‘কলকাতা ৯ ক্যাফে’ (Kolkata 9 Cafe)। সেখানে আয়োজন করা হয়েছে ভূতের গল্প পাঠের আসর। আর সেই সন্ধ্যায় বাঙালির প্রিয় অতিপ্রাকৃত সাহিত্যকে পাঠকদের সামনে জীবন্ত করে তুলতে হাজির হচ্ছেন প্রখ্যাত কবি জয় গোস্বামী।

ভূত চতুর্দশীর দেশে হ্যালোউইনের দাপট, কোথায় হারাল বাঙালির ভূতেরা?

Bengali ghosts: ইদানীং শুনছি কলকাতার উঁচু উঁচু আবাসনে ‘হ্যালোউইনে’র প্রতাপ খুব। ভূত চতুর্দশীর ‘দেশীয়’ ঐতিহ্য ভুলে কাছাখোলা বাঙালি ‘ভদ্রবিত্ত’ ‘উচ্চবিত্ত’ বাবুসমাজ এখন হ্যালোউইনে ‘স্বাধিকার প্রমত্ত’!

তান্ত্রিকের স্বপ্নাদেশে প্রতিষ্ঠা, আজও চলছে প্রাচীন রীতি! শিবপুরের হাজার হাত কালীর ইতিহাস

Hazaar Haath Kali: হাওড়ার শিবপুরের হাজার হাত কালীমন্দিরের ইতিহাস প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। কথিত আছে, তান্ত্রিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নাদেশেই এই মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়। প্রায় ২৫ ফুট উঁচু দেবীমূর্তির হাজার হাত ঘিরে রয়েছে নানা লোকবিশ্বাস। তন্ত্রমতে পুজো হলেও এখানে নেই পশুবলির রীতি। কীভাবে শুরু হয়েছিল এই মন্দিরের ইতিহাস?

কালীপূজার আলোয় সোহরাইয়ের ছায়া, আদিবাসী লোকধর্মের সঙ্গে শাক্ত ঐতিহ্যের সম্পর্ক কতটা গভীর?

Tribal Folk Religion in Bengal: কার্তিক মাসের অমাবস্যায় বাংলার বহু অঞ্চলে যখন দীপাবলি ও শ্যামাপূজা উদ্‌যাপিত হয়, তখন রাঢ়বাংলা ও ছোটনাগপুর মালভূমির বিভিন্ন জনপদে কৃষিজীবন, গৃহপালিত পশু এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে সোহরাই বা বাঁদনা পরব পালিত হয়।

শিকলে বাঁধা দেবী, ডাকাতদের আরাধ্যা! দক্ষিণ কলকাতার চেতলার ডাকাত কালীর ইতিহাস

Dakat Kali: দক্ষিণ কলকাতার চেতলায় রয়েছে রহস্যে মোড়া প্রাচীন ডাকাত কালীবাড়ি। লোককথা অনুযায়ী, একসময় ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরে পুজো দিত দস্যুরা। লুটের সম্পদও নিবেদন করত দেবীর চরণে। কিন্তু কেন শিকলে বাঁধা রয়েছে দেবীমূর্তি? নীলু-ভুলু ডাকাতের কাহিনি থেকে সারদা দেবীর আগমন—জানুন এই মন্দিরের ইতিহাস।

বাংলার ভূতেরা কেমন দেখতে, কোথায় থাকে, কী খায়?

Ghosts of Bengal: পাশ্চাত্যের বহু ভৌতিক আখ্যানের তুলনায় বাংলার লোককথায় ভূতেরা অনেক বেশি গৃহস্থালি জীবন, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক পরিচয়, শ্রেণিবিন্যাস এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত। তারা কখনও মাছের প্রতি আসক্ত, কখনও গাছের ডালে আশ্রয় নেওয়া ভবঘুরে, কখনও অসমাপ্ত সংসারের স্মৃতি বহনকারী নারী, আবার কখনও ব্রাহ্মণ্য সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।