চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?
Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?
কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনাকে ঘিরে শোকের পাশাপাশি শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। ভিড় সামলানোর ব্যবস্থা, পুলিশের ভূমিকা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং দুর্ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসা—একাধিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই ঘটনার জন্য প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করছে। অন্যদিকে, কংগ্রেসের তরফে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য তদন্ত জরুরি হলেও, এই ঘটনা উৎসবের সময় জননিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে দুর্ঘটনার পরে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং মাইকে ঘোষণা নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়টি কলকাতা পুলিশের নজরে এসেছে। হিন্দুর প্রতিবেদনেও, অব্যবস্থাপনা ও বিভ্রান্তিকর ঘোষণাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার কারণ, প্রশাসনিক দায় এবং হতাহতের পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
মহম্মদ সেলিমের দাবি, দ্রুত চিকিৎসা ও স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ করুক সরকার
চোরবাগানের দুর্ঘটনার পর সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন,
উৎসবের মাঝে কলকাতার চোরবাগানে এই ভয়াবহ ঘটনায় আমরা সবাই স্তম্ভিত ও শোকস্তব্ধ। মৃতদের স্বজনদের সমবেদনা জানানোর কোনো ভাষা নেই। এখন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দ্রুত আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং স্বচ্ছভাবে মৃত ও আহতদের তালিকা প্রকাশ করা, যাতে পরিজনদের উদ্বেগ কমে।
একই সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, জননিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের পরিবর্তে পুলিশকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। সেলিম আরও জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর এসএফআই এবং বামকর্মীরা সাধারণ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন।
সুজন চক্রবর্তীর নিশানায় রাজ্য সরকার ও পুলিশ
সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তীও দুর্ঘটনার জন্য রাজ্য সরকার ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, দুর্গাপুজোর মতো বড় উৎসবে বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন,
শারদ উৎসবের সময় বাংলার মানুষকে কখনও এমন বিপন্নতার মুখে পড়তে হয়নি। হাজার হাজার মানুষের ভিড় সামলানোর কোনো দায়িত্ব পুলিশ বা প্রশাসনের ছিল না। পুলিশের কাজ ছিল উৎসব সুচারুভাবে পরিচালনা করা, তা না করে তারা অন্য কাজে ব্যস্ত ছিল। এই চূড়ান্ত অপদার্থতার ফলেই এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Durga Puja stampede: যে শিশুটি বাবার হাত ধরে মণ্ডপ দেখতে চেয়েছিল, কিংবা যে তরুণ উৎসবের দিনেও শুধু মায়ের হাসিমুখ দেখতে ভিড়ে সামিল হয়েছিল—মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে তাদের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।
সুজনের বক্তব্যে পুলিশের কাজের অগ্রাধিকার নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের বিষয়গুলির সঙ্গেও সম্পর্কিত। ভিড় নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি, বিভ্রান্তিকর ঘোষণা এবং বৃষ্টির কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
দুর্ঘটনা এড়াতে কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ কতটা নিরাপদ ছিল, পর্যাপ্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা প্রয়োজন।
শতরূপ ঘোষের প্রশ্ন, ঘটনার দায় নেবে কে?
সিপিআই(এম) নেতা শতরূপ ঘোষ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী ও প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার কারণেই এত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন,
বিজেপি সরকার আসার পরে প্রথম দুর্গাপুজোয় রক্তের দাগ লাগল। ক্রাউড ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ ব্যর্থতার কারণে ১৭ জন (সরকারি ভাবে পরে জানানো হয়েছে মৃতের সংখ্যা ১৯) মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে সামনে এসে জবাব দিতে হবে এই ঘটনার দায় কার? পুলিশকে সঠিক কাজে ব্যবহার না করে বিরোধীদের দমন বা অন্য কাজে নামানোর ফলেই এই মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছে। আমরা দাবি জানাচ্ছি, কোনো তথ্য আড়াল না করে সমস্ত সত্য সামনে আনা হোক।
তাঁর দাবি, পুলিশকে কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং উৎসবের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হবে।
তৃণমূলের কুণাল ঘোষের বক্তব্য, দায় নিতে হবে পুজো কমিটিকেও
চোরবাগানের দুর্ঘটনা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা কুণাল ঘোষও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যে পুজো কমিটির দায়ের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এএনআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুণাল ঘোষ বলেন,
This accident is a complete failure of the administration, and the concerned Puja Committee must take responsibility for it.
অর্থাৎ, এই দুর্ঘটনা প্রশাসনের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা এবং সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটিকেও এর দায় নিতে হবে।
কুণাল আরও জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সহায়তা করা। তাঁর দাবি, মৃতদের ময়নাতদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে এবং শেষকৃত্যের সময় শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলি যাতে কোনো অসুবিধা বা হয়রানির মুখে না পড়ে, তা পুলিশকে নিশ্চিত করতে হবে। আহতদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থার উপরেও তিনি জোর দিয়েছেন।
তৃণমূল নেতার এই বক্তব্যে একদিকে প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে পুজো কমিটির জবাবদিহির দাবিও রয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে আয়োজকদের প্রস্তুতি, নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের সঙ্গে তাঁদের সমন্বয় কতটা ছিল, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কংগ্রেসের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্ত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য
চোরবাগানের ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছে কংগ্রেসও। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে মৃতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে দলটি।
তারা বলছেন, দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে অবিলম্বে সাহায্য করতে হবে। শুধু তদন্তের ঘোষণা নয়, সেই তদন্তের মাধ্যমে কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হওয়াও জরুরি।
রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্যে, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং বিভ্রান্তিকর ঘোষণার বিষয়টি উঠে এসেছে। বৃষ্টির মধ্যে দর্শনার্থীদের ভিড় কীভাবে সামলানো হয়েছিল, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ যথেষ্ট নিরাপদ ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অভিযোগের বাইরে গিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল কি না, পুজো কমিটি ও পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল কি না এবং বিপদের মুহূর্তে দর্শনার্থীদের সঠিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না—তদন্তে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।





