যা ঘটেছিল চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে

Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।

inscript
৫ মিনিট
যা ঘটেছিল চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে

উত্তর কলকাতার শারদোৎসবের আনন্দময় ও ব্যস্ত সন্ধ্যার আবহ মুহূর্তেই এক মর্মান্তিক রূপ নেয়, যখন শনিবার রাতে মহাসপ্তমীর ভিড়ের মধ্যে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের শারদা পার্কে অবস্থিত চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে একটি ভয়াবহ হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। চলতি বছরে ৯১ বছরে পা দেওয়া এই পুজোমণ্ডপ ও এর এ বছরের থিম ‘অরব’ (‘Beyond Sound’) দেখতে সপ্তমীর সন্ধ্যায় সাধারণ দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় জমেছিল। ৩৬০ ডিগ্রি ভিউইং অভিজ্ঞতার আদলে তৈরি এই মণ্ডপে একটি উঁচু গোল প্যাসেজ রাখা হয়েছিল দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য।

কী ঘটেছিল?

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হয় এবং বাইরে অপেক্ষমাণ বিপুল সংখ্যক মানুষ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একসঙ্গে হুড়মুড় করে মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। মণ্ডপের প্রবেশ ও নিকাসপথ তুলনামূলকভাবে সরু হওয়ায় এবং হঠাৎ মানুষের এই অতিরিক্ত ও তীব্র চাপের জেরে মুহূর্তের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অনেকেই মাটিতে পড়ে যান এবং পিছনের ভিড়ের চাপে পদপিষ্টের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে এমন ইঙ্গিতও মিলেছিল যে ভিড়ের চাপে মণ্ডপের কাঠামোর একটি অংশ বা ওই প্যাসেজের আশেপাশে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, তবে এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও কারণ এখনও তদন্তাধীন।

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ও সূত্রে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। পিটিআই প্রথমে অন্তত ২৫ জন মানুষকে গুরুতর অবস্থায় কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা জানালেও, পরবর্তীতে ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র প্রতিবেদনে আহতদের সংখ্যা ৩৫ বলে উল্লেখ করা হয়। হাসপাতালের সূত্রের খবর অনুযায়ী ১৭ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। আর সেই খবরকে ভিত্তি করে এনডিটিভি সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করে, এবং তাদের সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সও অন্তত ১৭ জনের মৃত্যুর খবর বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়, যেখানে চিকিৎসকদের তৎপরতা শুরু হয়।

তবে ঘটনার পরপরই স্থানীয় মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের পক্ষ থেকে মারাত্মক সব অভিযোগ সামনে আসে। একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে যে, ঘটনার ঠিক পরমুহূর্তে মণ্ডপের আশেপাশে কোনো পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্সের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। সমাজ মাধ্যমে একটি ভিডিও আমরা ঘুরতে দেখছি, যেখানে এক যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, “আমরা বডি নিয়ে যাচ্ছি। প্রাইভেট গাড়িতে। ওলা-উবর করে নিয়ে যাচ্ছি। অ্যাম্বুল্যান্স, পুলিশ নেই।” অনেক আহত ও মৃতদেহ স্থানীয় মানুষ ও দর্শনার্থীরা নিজেরাই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ওলা, উবার বা অন্যান্য প্রাইভেট গাড়িতে করে দ্রুত কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যান। পরবর্তীতে অবশ্য পুলিশ, দমকল, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম (DMG) এবং অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছয় এবং বাকি আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। যদিও প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে যে আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছিল এবং অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হয়েছিল।

পুলিশ তৎক্ষণাৎ মণ্ডপের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যান। এছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালও হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন বলে জানানো হয়। এই ঘটনা সম্পর্কে তথ্যের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি টোল-মুক্ত হেল্পলাইন নম্বর (১৮০০৩৪৫৫৬৭৮) চালু করেছে এবং কলকাতা পুলিশও ‘০৩৩২২১৪১৩১০’ নম্বরে আরেকটি হেল্পলাইন জারি করেছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনায় তীব্র শোক প্রকাশ করেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সংহতি জানান।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন এবং প্রতিটি মৃতের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং প্রতিটি আহতকে ৫০,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছেন।

এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত বিস্ফোরক ও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করেছে, দেবদীপ অধিকারী এই পুজোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক; আবার কিছু প্রতিবেদনে তাঁকে উল্লেখযোগ্য উদ্যোক্তা বলা হয়েছে। তবে তাঁর সঠিক পদ ও দুর্ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এখনও তদন্তাধীন। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ তাঁর ফেসবুক পোস্টে সরাসরি দাবি করে লিখেছেন—"চোরবাগানে আগের কমিটিকে জোর করে ইস্তফা দিয়ে নতুন কমিটি 'দখল' করা হয়েছিল। আগের কমিটির ইস্তফাপত্র এবং নতুন কমিটিতে কে কে আছেন, দেখে নিন।" তিনি আগের কমিটির ইস্তফাপত্র ও নতুন কমিটির সদস্যদের তালিকাও সামনে আনেন।

Loading Facebook embed…

পুজো শুরুর ঠিক আগে এমন জোর করে কমিটি বদল এবং তারপরেই এই ধরনের বড় মাপের অব্যবস্থাপনার ঘটনা ঘটায়, নতুন কমিটির প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে।

দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে কলকাতার বিভিন্ন জনপ্রিয় মণ্ডপে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়। চোরবাগান ট্র্যাজেডি জনবহুল উৎসবগুলিতে ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলিকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। পর্যালোচকদের মতে, সপ্তমী ও শনিবারের সন্ধ্যায় যে অতিরিক্ত ভিড় হবে তা প্রত্যাশিত থাকলেও, হঠাৎ বৃষ্টি নামলে মানুষ যে একসঙ্গে আশ্রয়ের জন্য ছুটবে, তা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত বিকল্প গেট বা ব্যারিকেড ব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল না। এছাড়া মণ্ডপের নকশা, সরু যাতায়াত পথ এবং বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের ঘোষণা বা হুইসেলের মতো বিষয়গুলি ভিড়ে অতিরিক্ত আতঙ্ক তৈরি করেছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভিড় নিয়ন্ত্রণকারী স্বেচ্ছাসেবক এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের মধ্যে সমন্বয়েরও মারাত্মক ঘাটতি ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের জেরে শহরের অন্যতম প্রধান দুর্গোৎসব উদযাপন ‘টালা প্রত্যয়’ সাময়িকভাবে তাদের মণ্ডপ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এতসবকিছুর পরও প্রশ্ন ওঠে, এতগুলি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার দায় কি শুধু প্রকৃতির রোষের উপর চাপিয়ে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব?

বাঙালির প্রাণের উৎসবের আনন্দ ঠিক কোন প্রশাসনিক গাফিলতিতে নিমেষেই মহাশ্মশানে পরিণত হলো?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।

বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই চোরবাগানে ছিলেন সম্পূর্ণা

পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।