পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।
দুর্গাপুজোর আবহে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থী দলগুলির বইয়ের স্টল ঘিরে বিতর্ক ক্রমশ বাড়ছে। কোথাও স্টল সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ, কোথাও ভাঙচুরের অভিযোগ, আবার কোথাও প্রশাসনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছেন বাম কর্মী-সমর্থকেরা। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার, ১৭ অক্টোবর, কলকাতার যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে সিপিআই(এম)-এর একটি বইয়ের স্টল সরাতে বুলডোজার নিয়ে হাজির হন কলকাতা পুরসভার কর্মীরা। কিন্তু দলীয় কর্মী-সমর্থক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পড়ুয়াদের বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হয় বুলডোজারটিকে। যদিও ভোর রাতে ভাঙা হয় এপিডিআর-এর স্টল। এইটবিতে সারারাত অন্যান্য বুক স্টলগুলিও ভাঙার চেষ্টা চলে। দফার দফায় বাম কর্মীদের সঙ্গে পুলিশি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, দুর্গাপুজোর মতো সর্বজনীন উৎসবে বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে প্রশাসনিক বাধার কারণ কী এবং এই ধরনের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে অনুমতির নিয়ম কতটা স্বচ্ছভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে দুর্গাপুজো উপলক্ষে সিপিআই(এম)-এর বইয়ের স্টলটি তৈরি হয়েছিল চার দিন আগে। শনিবার সন্ধ্যায় সেই স্টল সরাতে কলকাতা পুরসভার একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। সঙ্গে ছিল পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা। স্টল ভাঙার জন্য বুলডোজার নিয়ে আসা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী, দলের রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত-সহ একাধিক নেতা-কর্মী। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারাও। স্টলটি ঘিরে মানববন্ধন তৈরি করে প্রতিবাদ জানান তাঁরা। কোথাও জাতীয় সঙ্গীত গেয়েও প্রতিবাদ করতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের। বাম নেতৃত্বের বক্তব্য, স্টলটি ভাঙতে হলে তাঁদের উপর দিয়েই বুলডোজার চালাতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদের মুখে বুলডোজারটি সেখান থেকে সরে যায়। যদিও ভোর রাতে ভাঙা হয় এপিডিআর-এর স্টল। এইটবিতে সারারাত অন্যান্য বুক স্টলগুলিও ভাঙার চেষ্টা চলে। দফার দফায় বাম কর্মীদের সঙ্গে পুলিশি সংঘর্ষ হয়।
দলীয় কর্মী-সমর্থক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পড়ুয়াদের বাধার মুখে ফিরে যেতে হয়েছিল বুলডোজারকে
সিপিআই(এম)-এর রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্তের দাবি, স্টল বসানোর জন্য তাঁরা কলকাতা পুলিশের কাছে আগেই আবেদন জানিয়েছিলেন। পুরসভাকে প্রয়োজনীয় করও দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎ ব্যবহারের অনুমতিও ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, স্টল তৈরির পর চার দিন কেটে গেলেও প্রশাসন কোনো আপত্তি জানায়নি। আদালত বন্ধ হওয়ার পরেই স্টল সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক পদক্ষেপের পক্ষে অনুমতি সংক্রান্ত প্রশ্ন রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভার কর্মীরা পুলিশি অনুরোধের ভিত্তিতে স্টল সরাতে গিয়েছিলেন। পুলিশ ও পুরসভার তরফে প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল কি না, সেই প্রশ্নই এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। ফলে একদিকে বাম নেতৃত্বের অনুমতি থাকার দাবি, অন্যদিকে প্রশাসনের অনুমতি সংক্রান্ত আপত্তি—দুইয়ের মধ্যে প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Caine Prize winning story AI allegations: ১১ অক্টোবর লেখক ও সাংবাদিক ভোহিনি ভারা ‘দ্য আটলান্টিক’-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন—যার শিরোনাম ছিল “Yet Another Literary Prizewinner Seems to Be AI”। সেখানে তিনি জানান, ‘পাংগ্রাম’ নামের একটি এআই-ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গল্পটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এটি প্রায় পুরোটাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত।
এই ধরনের ক্ষেত্রে অনুমতি চাওয়ার প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত জবাব এবং স্টল সরানোর নির্দেশের ভিত্তি প্রকাশ্যে এলে বিতর্কের নিষ্পত্তি সহজ হতে পারে। কারণ, নিয়ম ভাঙা হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন যেমন রয়েছে, তেমনই নিয়ম মেনে অনুমতি চাওয়ার পরেও কোনো স্টল সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে তারও ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
দুর্গাপুজোর আগে থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থী দলগুলির বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে আপত্তি ও বাধার অভিযোগ উঠেছে। শনিবারই কলকাতার ঢাকুরিয়ায় সিপিআইয়ের একটি বইয়ের স্টল ভেঙে দেওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। স্থানীয় সিপিআই নেতা প্রবীর দেবের দাবি, প্রায় ৪৯ বছর ধরে সেখানে তাঁদের বইয়ের স্টল বসছে। প্রতি বছরই স্থানীয় থানাকে বিষয়টি জানানো হতো।
Loading Facebook embed…
উত্তর ২৪ পরগনার বিজপুরের পলাশি মাঝিপাড়ায় বৃহস্পতিবার সিপিআই(এম)-এর আর একটি বইয়ের স্টলে ভাঙচুর এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। রাজ্যের অন্যত্রও বামপন্থী দলগুলির স্টল তৈরিতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। তবে প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও প্রশাসনিক অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কোথাও আবার ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে সব ঘটনাকে একই ধরনের বলে ধরে না নিয়ে পৃথকভাবে তদন্ত ও তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলায় দুর্গাপুজোর সঙ্গে বইয়ের স্টলের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পুজোমণ্ডপের আশপাশে রাজনৈতিক বই, সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিবিষয়ক বইয়ের বিক্রি বহু দশক ধরে বামপন্থী দলগুলির সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অংশ। এই স্টলগুলি কেবল বই কেনাবেচার জায়গা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আলোচনা, মতবিনিময় এবং পাঠকের সঙ্গে দলের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।
বামপন্থী দলগুলি সাধারণত পুজোর সময় বইয়ের স্টলের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বিকল্প সামাজিক চিন্তা তুলে ধরে। কিন্তু এ বার সেই পরিচিত পরিসরেই প্রশাসনিক বাধা এবং রাজনৈতিক বিরোধের অভিযোগ সামনে এসেছে।
সিপিআই(এমএল) লিবারেশন সামাজিক মাধ্যমে এই ধরনের পদক্ষেপের সমালোচনা করে অভিযোগ করেছে, বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বামপন্থীদের বইয়ের স্টলকে নিশানা করছে। তাদের বক্তব্য, বইয়ের মধ্যে থাকা সমতা, ন্যায়বিচার এবং মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসের ধারণাকে দমন করা যায় না। তবে এটি বামপন্থী দলের রাজনৈতিক অভিযোগ; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলির প্রমাণ ও প্রশাসনিক নথি গুরুত্বপূর্ণ।
১০ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে সতর্ক করে বলেছিলেন, কোনো স্টল ‘দুর্গাপুজো’র বদলে ‘শারদোৎসব’ শব্দ ব্যবহার করলে সেই স্টলকে জায়গা দেওয়া উচিত নয়। এই মন্তব্যের পর পুজোর নামকরণ এবং বইয়ের স্টল ঘিরে বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়।
বইয়ের স্টল ঘিরে বিরোধ গড়িয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। বনগাঁয় দলীয় কার্যালয়ের কাছে বইয়ের স্টল বসানোর অনুমতি নিয়ে সিপিআই(এম)-এর করা মামলায় বৃহস্পতিবার একক বিচারপতি দলটিকে নির্দিষ্ট জায়গার ১০০ মিটারের মধ্যে স্টল বসানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। রাজ্য সরকার সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে।
যাদবপুরে বুলডোজার ফিরে গেলেও বইয়ের স্টল নিয়ে বিরোধের অবসান হয়েছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না। এই ঘটনা প্রশাসনিক নিয়মের প্রয়োগ, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পুজোর মতো সর্বজনীন উৎসবে সাংস্কৃতিক পরিসরের চরিত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। অনুমতির প্রশ্নে প্রশাসনের অবস্থান এবং বাম দলগুলির অভিযোগ—দুইয়েরই স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কারণ, গণতান্ত্রিক পরিসরে নিয়ম মানা যেমন জরুরি, তেমনই সেই নিয়ম প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।





