ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?
Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির শোচনীয় পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঘটনাদুটির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। কারণ, গত কয়েক মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, গাজা ও লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ভূমিকা—সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কার্যত একই অবস্থানে ছিলেন। একে অপরের রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। কিন্তু নভেম্বরের শুরুতে দুই দেশের নির্বাচনী ফলাফল সেই হিসাবেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন, এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?
৩ নভেম্বর আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেট—দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরা ট্রাম্প এখন অনেকটাই রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। এই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পিছনে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, মূল্যবৃদ্ধি, প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয়কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেছেন। অন্যদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলে পড়েছে। যদিও সামরিক অভিযানকে ভুল বলে মানতে রাজি নন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আবার সুযোগ পেলেও তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন।
কিন্তু জানুয়ারি মাসে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে ট্রাম্পকে অনেক বেশি রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হবে। প্রশাসনের কাজকর্ম নিয়ে তদন্ত, সামরিক খাতে অর্থ বরাদ্দের উপর নজরদারি এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার মতো ক্ষমতা থাকবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। অবশ্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। মার্কিন প্রেসিডেন্টই সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এবং রাজনৈতিক সমর্থন জোগাড় করা অনেক কঠিন হয়ে উঠবে।
নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় ফেরার পথও কঠিন
ট্রাম্পের পরাজয়ের কয়েক দিন আগেই ইজরায়েলের নির্বাচনে ধাক্কা খেয়েছেন নেতানিয়াহু। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন দক্ষিণপন্থী জোট ১২০ আসনের নেসেটে পেয়েছে ৫৩টি আসন। সরকার গড়তে প্রয়োজন ৬১টি। বিরোধী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আর আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলি পেয়েছে ১৯টি আসন।
অর্থাৎ, একক বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁর হাতে নেই। ফলে নতুন সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের সমর্থন আদায় করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই ইজরায়েলের জন্য আমেরিকার নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন নিশ্চিত করতে পারে। সেই কারণেই আমেরিকার নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের প্রতি এবং ইজরায়েলের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রতি পরস্পরের প্রকাশ্য সমর্থন ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু দুজনের নির্বাচনী পরাজয় সেই রাজনৈতিক কৌশলকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এখন ইজরায়েলের বিরোধীরা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন, তাঁর নীতির কারণেই আমেরিকার সঙ্গে ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে। এতদিন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের কাছেই ইজরায়েল সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু গাজা এবং ইরান যুদ্ধের পর আমেরিকার সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে ইজরায়েলকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা বেড়েছে।
এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটাই। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে। ইরানের পালটা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়েছে।
আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক অভিযান ইরানের সামরিক পরিকাঠামোর বড় ক্ষতি করলেও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। ফলে যুদ্ধের লক্ষ্যও এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে রয়েছে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা। অন্যদিকে, আরও সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে ইরানকে চাপে ফেলার চেষ্টা। প্রথম পথটি তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় পথ বেছে নিলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলির একাংশ মনে করছে, নির্বাচনী পরাজয়ের পর ট্রাম্পের কাছে যুদ্ধ শেষ করার জন্য সমঝোতায় পৌঁছনোর তাগিদ বাড়বে। তবে ইরান যদি আমেরিকার দুর্বলতাকে সামরিক সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ইতোমধ্যেই চিনও এই সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়াচ্ছে
দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তাকারী আমেরিকা। প্রতি বছর ইজরায়েলকে প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিয়ে এসেছে ওয়াশিংটন। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদেও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে একাধিক প্রস্তাবে আমেরিকা ভেটো দিয়েছে।
কিন্তু এখন এই সম্পর্কের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। আমেরিকার ভোটারদের একাংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে, ইজরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকাকে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে। ফলে ইজরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন করার নীতি নিয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উঠছে।
নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান, গাজায় মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আমেরিকার অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে আরও বেশি আলোচনা ও তদন্ত হতে পারে। ট্রাম্প নিজেও ২০২৬ সালের শেষের পর ইজরায়েলকে বার্ষিক সামরিক সহায়তা বন্ধ করার বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। যদিও এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ নীতি এখনও স্পষ্ট নয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নে যে অবস্থান নিয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা তার বিরোধিতা করতে পারে। নতুন কংগ্রেস ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার জন্য উদ্যোগী হলে ট্রাম্পের নীতির উপর চাপ বাড়বে। তবে রাতারাতি ইউক্রেনের জন্য মার্কিন সামরিক সাহায্য বাড়বে, এমন সম্ভাবনা এখনই নেই।
চিনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্তি বৃদ্ধির ফলে সেই নীতির উপর কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ আসতে পারে। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় কৃষিক্ষেত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রশ্নে নয়াদিল্লির দরকষাকষির সুযোগ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নির্বাচনী বিপর্যয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। সামরিক শক্তি, জাতীয়তাবাদী প্রচার এবং বিদেশে শত্রু চিহ্নিত করে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের কৌশল সব সময় নির্বাচনে সাফল্য এনে দেয় না। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মূল্য শেষ পর্যন্ত ভোটারদের কাছে বড় হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই পরাজয়কে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা বলে ধরে নেওয়ারও কারণ নেই। বরং রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা দুই নেতা নিজেদের অবস্থান বাঁচাতে আরও আগ্রাসী সামরিক নীতি গ্রহণ করতে পারেন। বিশেষত ইরান যুদ্ধের কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ট্রাম্পের হাতে এখনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা রয়েছে, নেতানিয়াহুও এখনও সরকার গঠনের লড়াই থেকে পুরোপুরি ছিটকে যাননি। কিন্তু দুজনের রাজনৈতিক শক্তির ভিত যে আগের মতো অটুট নেই, তা স্পষ্ট। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ নির্ভর করবে তাঁরা এই নির্বাচনী বার্তা থেকে সমঝোতার শিক্ষা নেবেন, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আরও সংঘাতের পথে হাঁটবেন তার উপর। বিশ্ববাসীর কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ক্ষমতার এই টানাপোড়েনের মূল্য কি আবারও দিতে হবে সাধারণ মানুষকে?







