রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?
Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?
দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বর বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সভাকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় কারচুপি এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই সভার আয়োজন করেছিল বিরোধীরা। সভায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব-সহ বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সভার রাজনৈতিক গুরুত্ব ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে সভায় কত মানুষের সমাগম হয়েছিল এবং সেই ভিড় দেখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না।
কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, রামলীলা ময়দানে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল, এমন ধারণা তৈরি করতেই কংগ্রেস এই ছবি ব্যবহার করেছে। সমাজমাধ্যমে একটি ছবি তুলে ধরে রিজিজু কটাক্ষ করেন, কংগ্রেস যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ভরা মাঠের ছবি তৈরি করেই থাকে, তা হলে অন্তত ছবিটি আরও নিখুঁত করা উচিত ছিল। তাঁর এই মন্তব্যের পরেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
বিতর্কের সূত্রপাত মূলত কংগ্রেস সাংসদ ভামসি গাড্ডাম এবং দলের অন্য কয়েকজন নেতার সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবি থেকে। ছবিতে রামলীলা ময়দানকে বিপুল জনসমাগমে পরিপূর্ণ দেখানো হয়েছিল। ছবির মঞ্চে রাহুল গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীর যে প্রতিকৃতি দেখা যায়, সেগুলির সঙ্গে বাস্তবের মঞ্চের মিল ছিল না। ছবির ব্যানার এবং মঞ্চের নকশাতেও অসংগতি নজরে আসে। রিজিজু সেই ছবিকেই সামনে রেখে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কৃত্রিম ছবি ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রচারের অভিযোগ তোলেন।
অন্য দিকে, বিজেপি নেতারা দাবি করেন, কংগ্রেস সভায় ১০ লক্ষ মানুষের জমায়েতের কথা বললেও বাস্তবে মাঠের প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গা ফাঁকা ছিল। বিজেপি সাংসদ তথা দলের মুখপাত্র সম্বিত পাত্রও সভাকে ব্যর্থ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেস যে বিপুল জনসমাগমের দাবি করছে, বাস্তবের ছবি তার সঙ্গে মেলে না। পাল্টা কংগ্রেসের তরফে সভার ড্রোনের মাধ্যমে তোলা ছবি এবং ভিডিয়ো প্রকাশ করে দাবি করা হয়, বিপুল সংখ্যক মানুষ এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন। ফলে ভিড়ের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
loss claim for Ramlila rally: রামলীলা ময়দানের সমাবেশ ঘিরে ছোট দোকানদারদের ‘২.৫ লক্ষ দোকান বন্ধ’ ও ‘১০-১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি’র দাবি আসলে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠন সিটিআই-এর অনুমান আসলে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের হিসাবের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বিজেপি-কংগ্রেস পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই সংখ্যাগুলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার।

সাইটইঞ্জিনের এআই শনাক্তকারী পরীক্ষা ব্যবস্থায় ছবিটি পরীক্ষা করা হয়
ফ্যাক্ট চেক করে দেখা গিয়েছে, ছবিটি ১ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় রামলীলা ময়দানের বলে প্রচার করা হয়েছিল। ছবিতে রাহুল ও সোনিয়া গান্ধীর ছবি-সহ ব্যানার দেখা গেলেও সেগুলির সঙ্গে বাস্তবের মঞ্চের মিল পাওয়া যায়নি। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত সভার আসল মঞ্চের ছবির সঙ্গে তুলনা করেও এই অসংগতি ধরা পড়ে। পাশাপাশি হাইভ মডারেশন এবং সাইটইঞ্জিন নামের এআই শনাক্তকারী ব্যবস্থায় ছবিটি পরীক্ষা করা হয়। হাইভ মডারেশন ছবিটিকে ৬৯ শতাংশ সম্ভাবনায় এআই-নির্মিত বলে চিহ্নিত করে। ওপেনএআইয়ের সিন্থআইডি শনাক্তকারী ব্যবস্থাতেও ছবিটি কৃত্রিমভাবে তৈরি অথবা সম্পাদিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। সাইটইঞ্জিন নামের একটি এআই শনাক্তকরণ টুলেও দেখা গিয়েছে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

ছবিটি ওপেনএআই দিয়ে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে।
কোনো ছবি এআই দিয়ে তৈরি হয়েছে বলে প্রমাণিত হওয়া এবং কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ছবি তৈরি করে প্রচার করেছে বলে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফ্যাক্ট চেকে ছবির কৃত্রিম উৎস এবং ভুল পরিচয়ে ছড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। কিন্তু ছবিগুলি তৈরির নির্দেশ কে দিয়েছিল, দলের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচার বিভাগ এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, কিংবা কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি জানত কি না, তা এই অনুসন্ধানগুলি থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না। তাই রিজিজুর রাজনৈতিক অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার অবকাশ নেই।
এক দিকে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা রাস্তায় নেমেছে। অন্য দিকে বিজেপি বিরোধীদের আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনসমর্থন নিয়েই প্রশ্ন তুলতে চাইছে। এই পরিস্থিতিতে সভার ভিড় নিয়ে বিতর্ক আন্দোলনের মূল দাবিগুলিকে আড়াল করার সুযোগ তৈরি করছে।
আসলে রাজনৈতিক সভায় কত মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন, তা নির্ধারণের জন্য কেবল একটি ছবি বা প্রতিপক্ষের দাবি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একাধিক নির্ভরযোগ্য ছবি, ভিডিয়ো, মাঠের আয়তন, প্রবেশপথের হিসাব এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রচারে এআইয়ের ব্যবহার এবং পুরনো ছবি নতুন ঘটনার নামে ছড়ানোর প্রবণতাও উদ্বেগজনক। কারণ, ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো ছবি একবার ছড়িয়ে পড়লে তার সত্যতা যাচাইয়ের আগেই সেটি রাজনৈতিক প্রচারের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
রামলীলা ময়দানের সভায় ঠিক কত মানুষের জমায়েত হয়েছিল, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু ভাইরাল হওয়া কিছু ছবি যে বিভ্রান্তিকর এবং অন্তত একটি ছবি এআই দিয়ে তৈরি, তা ফ্যাক্ট চেকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ফলে কংগ্রেসের জনসমর্থনের দাবি কিংবা বিজেপির সভাকে ব্যর্থ বলার বক্তব্য—কোনোটিকেই শুধু প্রচারিত ছবি দেখে চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য যাচাই করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।







