ওমান এয়ার থেকে বাদ পড়েও কীভাবে হামাম আল-হাম্মামি পেলেন ফ্লাইদুবাইয়ের উড়ানের ছাড়পত্র?
Hamam al-Hammami Flydubai: ঘটনার পর হামামের সমাজমাধ্যমের পাতাগুলি মুছে ফেলা হলেও ফরেনসিক তদন্তে তাঁর চরমপন্থী মানসিকতার ভয়াবহ ছবি বেরিয়ে এসেছে। ২০২১ ও ২০২২ সালের মধ্যে করা প্রায় তিন হাজার মুছে ফেলা টুইট বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দেখেছে, চরম নারীবিদ্বেষ এবং ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ‘ফ্লাইদুবাই’-এর FZ 1073 ফ্লাইট তখন মাঝআকাশে। হঠাৎই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটি প্রায় ১৭,০০০ ফুট নিচে নেমে আসে। ককপিটের ভিতরে তখন চলছিল সংঘাত। ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধান পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছারকে ইমার্জেন্সি ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করছেন ফার্স্ট অফিসার—অর্থাৎ কো-পাইলট নিজে। উদ্দেশ্য একটাই: বিমানের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়ে যাত্রী সমেত সেটিকে মাটিতে আছড়ে ফেলা।
আহত, রক্তাক্ত অবস্থাতেও ক্যাপ্টেন স্মিত অসীম সাহসিকতায় ককপিটের জরুরি লক খুলে দেন। ভিতরে ছুটে যান ক্রু সদস্য, এক অফ-ডিউটি পাইলট এবং যাত্রীরা। রক্তক্ষয়ী ধস্তাধস্তির পর অবশেষে কাবু করা যায় সেই কো-পাইলটকে। বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করায় রক্ষা পান প্রায় ১৮০ জন যাত্রী, যাঁদের সিংহভাগই ছিলেন ইসরায়েলি নাগরিক।
মাঝআকাশে যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংসের এই চক্রান্তের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিটির নাম হামাম আল-হাম্মামি। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) অ্যাটর্নি জেনারেল ইতিমিধ্যেই এই ঘটনাকে স্পষ্ট “সন্ত্রাসবাদী হামলা” বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু কে এই হামাম আল-হাম্মামি? কীভাবেই বা উগ্রপন্থার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তিনি একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ককপিটে বসার ছাড়পত্র পেলেন?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Captain Smit Machchhar: স্পাইসজেটে থাকাকালীন তাঁর ৯,৫০০ ঘণ্টার বেশি উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছিল, যার মধ্যে ৬,৪০০ ঘণ্টার বেশি সময় তিনি পাইলট-ইন-কমান্ড হিসেবে ছিলেন। ২০২২ সালের জুন মাসে অভিজ্ঞ পাইলট হিসেবে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ‘ফ্লাইদুবাই’-তে ডাইরেক্ট-এন্ট্রি ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দেন এবং দুবাইয়ে বসবাস শুরু করেন।
হামাম আল-হাম্মামির বর্তমান বয়স প্রায় ২৯ বছর। জন্ম সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে (UAE)। তাঁর বাবা ওমানের নাগরিক এবং মা সিরিয়ান বংশোদ্ভূত। কাগজে-কলমে ওমানি নাগরিক হলেও জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ওমানের বাইরে কাটিয়েছেন। তদন্তকারী সংস্থাগুলির মতে, তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায়। গোয়েন্দাদের প্রাথমিক অনুমান, সিরিয়ায় অবস্থানের সময়ই কোনো একটি নির্দিষ্ট উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের সংস্পর্শে আসেন তিনি এবং সেখান থেকেই তাঁর ভিতর বিষাক্ত মৌলবাদী মতাদর্শের শিকড় ছড়াতে শুরু করে। পারিবারিক জীবন নিয়ে খুব বেশি নথি প্রকাশ্যে না এলেও মায়ের সঙ্গে তাঁর মানসিক ঘনিষ্ঠতা ছিল প্রবল। সমাজমাধ্যমে তাঁর অতীতের বিভিন্ন কার্যকলাপ থেকে জানা যায়, উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি একটি অত্যন্ত গোঁড়া ও অন্ধ রক্ষণশীল বিশ্বাসের ভিতর দিয়ে তাঁর মানসিক বিকাশ ঘটেছিল।
পেশাগত জীবনে প্রবেশের আগে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ব্রিটেনের বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটি (Buckinghamshire New University) থেকে দূরশিক্ষার মাধ্যমে ‘এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট’-এ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন হামাম। এরপর তিনি ওমান এয়ারে পেশাদার পাইলট হিসেবে কেরিয়ার শুরু করেন। প্রায় ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর তিনি ওমান এয়ারের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালে তিনি কো-পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পান। কিন্তু ২০২৪ সালে ওমান এয়ারের কো-পাইলট ট্রেনিং চলাকালীনই গোয়েন্দা নজরদারিতে হামামের গতিবিধি সন্দেহজনক ঠেকে। সেখানে তাঁকে ‘সিকিউরিটি রিস্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করে ওমান কর্তৃপক্ষ। শাস্তিস্বরূপ তাঁকে বিমান ওড়ানোর যাবতীয় দায়িত্ব থেকে চিরতরে সরিয়ে কেবল সাধারণ অফিশিয়াল ডেস্কে বসিয়ে দেওয়া হয়। ককপিটে ঢোকার দরজা তাঁর জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এই চরম পদক্ষেপের মুখে পড়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ হামাম নিজেই ওমান এয়ার ত্যাগ করেন। এরপর জুন ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মরক্কোর জাতীয় বিমান সংস্থা রয়্যাল এয়ার মারকে তিনি তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ নেন, যদিও সেখানে তিনি সরাসরি বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালিয়েছিলেন কি না তা নিশ্চিত নয়। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি কো-পাইলট হিসেবে যোগ দেন ফ্লাইদুবাইতে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এখানেই—যে ব্যক্তিকে একটি দেশের জাতীয় বিমান সংস্থা ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক’ ঘোষণা করে ককপিট থেকে বের করে দিল, তিনি কয়েক মাসের ব্যবধানে আরেকটি বহুজাতিক বিমানে উড়ান পরিচালনার ছাড়পত্র পেলেন কী করে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel flight emergency: ককপিটে পাইলটের উপর ছুরি হামলার পর কীভাবে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেল ইজরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান? আহত অবস্থাতেও কী ভূমিকা নিলেন ভারতীয় পাইলট? কীভাবে এক প্লাম্বার, দন্ত চিকিৎসক এবং কয়েকজন যাত্রী মিলে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে সাহায্য করলেন? শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাঁচল বিমানে থাকা ১৭৪ জনের প্রাণ?
ঘটনার পর হামামের সমাজমাধ্যমের পাতাগুলি মুছে ফেলা হলেও ফরেনসিক তদন্তে তাঁর চরমপন্থী মানসিকতার ভয়াবহ ছবি বেরিয়ে এসেছে। ২০২১ ও ২০২২ সালের মধ্যে করা প্রায় তিন হাজার মুছে ফেলা টুইট বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দেখেছে, চরম নারীবিদ্বেষ এবং ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি। হামাম একাধিক পোস্টে লিখেছিলেন, তাঁর মা এমন পাত্রী খুঁজছেন যিনি মুখ ঢেকে নিকাব পরবেন এবং বিয়ের পর সমস্ত চাকরি ছেড়ে দেবেন। এমন পাত্রী খুঁজে না পেয়ে বহু পরিবার তাঁর প্রস্তাব নাকচ করেছিল। পরে যখন তাঁর মা বলতেন যে পাত্র কমার্শিয়াল পাইলট, তখন পরিবারগুলি রাজি হতো—এই নিয়েও তিনি গর্ব করে পোস্ট করেছিলেন। তাঁর চোখে ছেলে-মেয়েদের একসঙ্গে কাজ করার জায়গা ছিল ‘নারীদের নষ্ট হওয়ার জায়গা’। অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে তিনি হাত মেলাতেন না এবং স্বাভাবিক মেলামেশা থেকেও নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সরাসরি আল-কায়েদা মতাদর্শের সঙ্গে তাঁর ডিজিটাল সংশ্লিষ্টতা। ঘটনার ঠিক ৯ ঘণ্টা পর তাঁর লিঙ্কডইন ও ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে দুটো পূর্ব-নির্ধারিত (scheduled) পোস্ট দেখা যায়। একটি ভিডিওতে বোয়িং ককপিট থেকে অন্য এক ইসরায়েলি বিমানের ফুটেজ জুম করে দেখানো হয়, যার শেষভাগে ছিল আল-কায়েদার কুখ্যাত নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং ২০০৯ সালে সিআইএ ঘাঁটিতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটানো হুমাম আল-বালাউইয়ের ছবি। অন্য পোস্টে ছিল মক্কা-মদিনা-জেরুজালেমের এআই ছবি এবং মৃত্যুভয়কে অস্বীকার করে আত্মত্যাগের কবিতা। ইজরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, হামাম সামাজিক মাধ্যমে ইহুদিদের হত্যার উস্কানি দিতেন এবং ঘটনার পর তাঁর ব্যক্তিগত সামগ্রী থেকে উগ্র প্রোপাগান্ডা সাহিত্য উদ্ধার হয়েছে।
দুবাই থেকে তেল আবিব রুটে বিমান চালানোর ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও ইসরায়েলের মধ্যে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। স্বাভাবিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, যে সমস্ত দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সরাসরি সম্পর্ক নেই, সেই দেশের নাগরিকদের এই সংবেদনশীল রুটে চালকের আসনে বসানো যায় না। ওমানের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন ওমানি নাগরিককে এই ফ্লাইটের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলো, তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। তাছাড়া ওমান এয়ার যখন তাঁকে উগ্রপন্থার কারণে সাসপেন্ড করল, সেই তথ্য কি আন্তর্জাতিক এভিয়েশন ডেটাবেসে নথিভুক্ত ছিল না? ফ্লাইদুবাই কি নিয়োগের আগে ওমান সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেনি? এই নিরাপত্তা ব্যর্থতা আজ গোটা এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির নজরদারি ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
সৌদি আরব ইতিমধ্যেই হামামকে আমিরশাহির গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিয়েছে। সেখানে চলছে রুদ্ধদ্বার জেরা। তিনি একাই ছিলেন, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি মডিউল—তদন্তকারীরা সেই জট খোলার চেষ্টায় ব্যস্ত। তবে ব্ল্যাকবক্সের অডিও এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ যে একটি বিষয়ের দিকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত করছে তা হলো, মাঝআকাশে যদি সেদিন ভারতের ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার চরম সাহসির সঙ্গে রুখে না দাঁড়াতেন, তবে বিমানের প্রায় ১৭৪ জন নিরপরাধ যাত্রী সেদিন মারা যেতেন। হামাম আল-হাম্মামির এই ঘটনা তাই কেবল একক কোনো অপরাধ নয়, বাণিজ্যিক বিমান পরিবহনের অন্তর্নিহিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক বিপজ্জনক সতর্কবার্তা।







