জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন কোথায় কোথায় সংক্রমিত হলো?
Gyanesh Kumar resignation: ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তীতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়ল প্রতিবাদ?
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তীতে দেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ শহর দিল্লি ও মুম্বইয়ে ব্যাপক আন্দোলন হলো। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিবাদে যুক্ত হয়েছে ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজ, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নতুন প্রজন্মের একটি অংশ।
দিল্লিতে এর প্রথম বড় প্রকাশ দেখা যায় ২৫ সেপ্টেম্বর। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসএইআর প্রক্রিয়া প্রত্যাহারের দাবিতে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, স্বরাজ ইন্ডিয়া-র যোগেন্দ্র যাদব, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এবং একাধিক নাগরিক সমাজের সংগঠন যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দিয়েছিল। সেই কর্মসূচিতে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাত হয় এবং একাধিক নেতা-অ্যাক্টিভিস্টকে আটক করা হয়। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন-এর নেত্রী নেহা বোরাও আটক হন।
এই ঘটনার পর জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলন আর শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের কর্মসূচি থাকেনি। ২ অক্টোবর দিল্লিতে একাধিক সংগঠন ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী পৃথকভাবে রাস্তায় নামে। আয়সা, এসএফআই, ডিওয়াইএফআই, এনএসইউআই ইয়ুথ কংগ্রেস এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের কর্মীরা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আম আদমি পার্টির নেতারাও এই আন্দোলনে যোগ দেন। দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অতিশী, সৌরভ ভরদ্বাজ, সঞ্জয় সিং-সহ একাধিক আপ নেতা এবং নেহা বোরার মতো ছাত্রনেত্রী ও সমাজকর্মীরা আটক হন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, সেদিন দিল্লিতে ৫০০ থেকে ৭০০-র বেশি মানুষকে আটক করা হয়।
দিল্লির এই জমায়েতের পিছনে শুধু রাজনৈতিক দল ছিল না। ছাত্র-যুব সংগঠনগুলিও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এসএফআই এবং ডিওয়াইএফআই-এর কর্মীরা এসআইআর নিয়ে প্রশ্ন তুলে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি করেন। সিপিআই (এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং নেত্রী বৃন্দা কারাতও সেই দাবির সমর্থনে বক্তব্য দেন। ইয়ুথ কংগ্রেসের কর্মীরাও একই দিনে প্রতিবাদে অংশ নেন। অর্থাৎ একই দাবিকে সামনে রেখে বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠন, কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এবং আম আদমি পার্টির মতো আলাদা রাজনৈতিক পরিসরের মানুষ একই জায়গায় এসে দাঁড়ান।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gyanesh Kumar resignation: দিল্লিতে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার বিভিন্ন রাস্তা সকাল থেকেই ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলে পুলিশ। টলস্টয় মার্গ, জনপথ রোড এবং সংসদ মার্গে ছিল কড়া নজরদারি। নতুন দিল্লি জেলায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়। এর ফলে অনুমতি ছাড়া পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে দিল্লি মেট্রোতেও। রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, জনপথ, প্যাটেল চক এবং মাণ্ডি হাউস-সহ অন্তত ১২টি মেট্রো স্টেশনে পরিষেবা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা হয়।
২ অক্টোবরের কর্মসূচির আগে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরের সভার অনুমতি দেয়নি। কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড বসানো হয় এবং বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতির কারণে ১১টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বেরোনোর পথও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।
একই দিনে আন্দোলনের আর একটি বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে মুম্বই। এখানে আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল কক্রোচ জনতা পার্টি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আগেই ঘোষণা করেছিলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর মুম্বই থেকে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করা হবে। পুলিশ শিবাজি পার্কে কর্মসূচির অনুমতি না দিলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে বড় জমায়েত হয়।
মুম্বইয়ের প্রতিবাদ দিল্লির তুলনায় আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের পরিচিত মুখদেরও দেখা যায়। অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, সঙ্গীতশিল্পী বিশাল দাদলানি, পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী-সহ একাধিক পরিচিত ব্যক্তি এই কর্মসূচির সঙ্গে প্রকাশ্যে সংহতি জানান। অভিনেতা প্রকাশ রাজও আন্দোলনের সমর্থনে বক্তব্য দেন।
মুম্বই থেকে আন্দোলনটিকে দেশের অন্য শহরে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এসেছে। সিজেপি জানিয়েছে, মুম্বইয়ের পর গোয়া, বেঙ্গালুরু এবং কলকাতাতেও কর্মসূচি নেওয়া হবে। এরপর আন্দোলনকে দিল্লির যন্তর মন্তরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ এই মুহূর্তে গোয়া, বেঙ্গালুরু বা কলকাতায় কর্মসূচি ঘোষণার কথা সামনে এলেও ২ অক্টোবর পর্যন্ত মূলত দিল্লি ও মুম্বইয়েই বড় আকারের জমায়েতের খবর পাওয়া গিয়েছে।
মুম্বইয়ের ২ অক্টোবরের কর্মসূচির শেষে আন্দোলনকারীরা আরও একটি কর্মসূচির ঘোষণা করেছে। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে ফের জমায়েত করা হবে। তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষকে দিল্লিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। এই কর্মসূচিকে সংগঠনটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, ভোটারদের নাম বাদ পড়া, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং তিন সদস্যের কমিশনের ভিতরে মতপার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্দোলনকারীরা। এই বিতর্ক আরও তীব্র হয় দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনের পর। সেখানে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী প্রায় ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার এসআইআর-সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এই প্রতিবেদনের পরই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হয়।
অবশ্য নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকা থেকে মৃত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারের নাম শনাক্ত করা। ফলে এসআইআর নিয়ে যে রাজনৈতিক ও নাগরিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার একদিকে রয়েছে ভোটাধিকার এবং ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক ব্যাখ্যা।
তবে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত হবে, তা এখনও নির্ভর করছে পরবর্তী কর্মসূচির উপর। ১০ অক্টোবর দিল্লিতে সিজেপির-র ঘোষিত কর্মসূচি, তার আগে গোয়া, বেঙ্গালুরু ও কলকাতায় সম্ভাব্য কর্মসূচি এবং বিরোধী দলগুলির পৃথক আন্দোলন—এই সবকিছু মিলিয়ে আগামী দিনগুলিতে প্রতিবাদের পরিধি আরও বাড়তে পারে। এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বরের দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু হওয়া দৃশ্যমান প্রতিবাদ ২ অক্টোবর দিল্লি ও মুম্বইয়ে একসঙ্গে বড় আকার নিয়েছে। আর মুম্বইয়ের মঞ্চ থেকেই সেই আন্দোলনকে দেশের আরও কয়েকটি শহরে নিয়ে যাওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে।







