দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?
Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত প্রায় দশ মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার সুরবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের আপত্তির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ভোটার তালিকার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডারে কার কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেই প্রশ্ন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে নির্বাচন কমিশনের ডিরেক্টর জেনারেল (আইটি) সীমা খান্নার নেতৃত্বাধীন তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং ইসিআইনেট (ECINet) নামে নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন ইসিআইনেট চালু করে। ভোটার সংক্রান্ত ৪০টিরও বেশি অ্যাপ ও পোর্টালকে একটি প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার উদ্দেশ্য ছিল এই ব্যবস্থার। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সেই সময় জানিয়েছিলেন, আইন মেনেই এই ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। সীমা খান্নাও বলেছিলেন, এই প্রযুক্তি ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনআস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই এই ব্যবস্থাকে ঘিরে কমিশনের অন্দরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। দুই নির্বাচন কমিশনারের অভিযোগ, ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে যাঁদের আইনি দায়িত্ব রয়েছে, সেই রাজ্য ও স্থানীয় স্তরের আধিকারিকদের ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও প্রবেশাধিকার সবসময় থাকছে না। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়ভাবে দিল্লির আইটি বিভাগের হাতে চলে যাচ্ছে।
এই বিষয়টি বুঝতে গেলে প্রথমে জানা দরকার, ভোটার তালিকা তৈরি করেন কারা। কোনও বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরির দায়িত্ব সাধারণত Electoral Registration Officer বা ERO-র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মহকুমাশাসক এই দায়িত্বে থাকেন। কোনো ভোটারের নাম যোগ করা, বাদ দেওয়া বা সংশোধনের মতো বিষয়ে দাবি ও আপত্তি শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি ক্ষমতা তাঁদেরই রয়েছে।
এই ব্যবস্থারই ডিজিটাল অংশ ছিল ERONet। পরে ECINet চালু হওয়ার পর ERONet-সহ একাধিক ব্যবস্থা তার আওতায় আসে। নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের আপত্তি মূলত এখানেই। তাঁদের বক্তব্য, আধিকারিকরা যদি আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন, তা হলে প্রযুক্তি কার্যত আইনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।
২০২৫ সালের নভেম্বর থেকেই এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কমিশনের ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমার সেই সময় সীমা খান্নাকে লেখা এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন, ERO, DEO এবং CEO-দের আইনি দায়িত্ব যেন আইটি ব্যবস্থা কোনোভাবেই সীমিত না করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও একই ধরনের সতর্কতা জানানো হয়। এরপরই ECINet চালু হয়।
এরপর মে মাসে নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশী ‘ভোটার তালিকার ডেটাবেসের ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়করণ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, একটি স্বাধীন অডিটের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হোক যে সংশ্লিষ্ট আইনি আধিকারিক ছাড়া অন্য কারও ভোটার ডেটাবেসে পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই। তিনি আইআইটি-র মতো প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে এই ধরনের অডিটের কথাও বলেছিলেন।
অন্য নির্বাচন কমিশনার সুরবীর সিং সান্ধুও পরে এই উদ্বেগের সঙ্গে একমত হন। তাঁর নথিভুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্য স্তরের আধিকারিকরা ERONet-এ যথাযথ ও সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছিলেন। এমনকি তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ডিরেক্টর জেনারেল (আইটি)-এর আদৌ আইনি ক্ষমতা আছে কি না সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের আইনসম্মত কাজের স্বাধীনতা সীমিত করার।
এই বিতর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পশ্চিমবঙ্গের SIR বা Special Intensive Revision। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর ‘logical discrepancy’ বা তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগে চিহ্নিত ভোটারদের ক্ষেত্রে শুনানি ও নথি যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, SIR-এর সময় পশ্চিমবঙ্গে ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষেরও বেশি ভোটার নিজেদের নাম ফের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৮.৩১ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২২.২১ লক্ষ আবেদন করেছেন বাদ পড়া ভোটাররা এবং ১৬.১০ লক্ষ আবেদন এসেছে অন্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR Appeals: এসআইআর-এর পর পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে জমা পড়া আপিলের মধ্যে পাঁচ মাসে মাত্র ১.২৬ লক্ষ আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমান গতিতে কাজ চললে বাকি ৩৭ লক্ষেরও বেশি আপিল নিষ্পত্তি করতে প্রায় ১২ বছর সময় লাগতে পারে।
এই ১৬.১০ লক্ষ আবেদনের বিষয়টিও কমিশনের অন্দরকার আপত্তির অংশ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনার সুরবীর সিং সান্ধু প্রশ্ন তুলেছিলেন, যেসব ভোটারের নাম পুনরায় তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আপিল করার অনুমতি কে দিয়েছিল। সেই আপিলগুলি কে করেছিলেন, সেই প্রশ্নও তিনি তুলেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি, বিবেক যোশী কিংবা পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক—কেউই যথেষ্ট তথ্য পাননি।
তবে সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ সামনে এসেছে গোয়ায়। সেখানে ২০২৬ সালের SIR-এ ‘logical discrepancy’-র কারণে কিছু ভোটারের নাম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁদের নথি জমা দেওয়ার এবং নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়। গোয়ার ERO ও AERO-রা শুনানি করে ৯৭ জন ভোটারকে আবার যোগ্য বলে মনে করেন। অর্থাৎ তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় ফের যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সমস্যা তৈরি হয় সফটওয়্যারে। আগের সিদ্ধান্তটি বদলে দেওয়ার জন্য ECINet-এ প্রয়োজনীয় ‘rollback’ বা ‘revert’ করার ব্যবস্থা তখন সক্রিয় ছিল না। গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর ১১ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে একাধিকবার দিল্লিতে বিষয়টি জানায়। আটটি ই-মেল পাঠানো হয়। সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল, কারণ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় এগিয়ে আসছিল।
১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারও সীমা খান্নাকে লিখে জানান, ERO এবং AERO-দের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগের পথে আইটি ব্যবস্থা বাধা হতে পারে না এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় ওই ৯৭ জনের নাম তাতে ছিল না।
এই ঘটনাই বিতর্কটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ এখানে প্রশ্ন শুধু সফটওয়্যারের প্রযুক্তিগত ত্রুটি নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, কোনো নির্বাচনী আধিকারিক নথি দেখে একজন নাগরিককে ভোটার তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর করার ক্ষমতা তাঁর হাতে থাকবে কি না।
সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার থাকেন। ২০২৩ সালের আইনে কমিশনের কাজ যতটা সম্ভব সর্বসম্মতভাবে করার কথা বলা হয়েছে। মতবিরোধ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে। দুই নির্বাচন কমিশনার তাঁদের লিখিত আপত্তিতে এই বিধানগুলির কথাও উল্লেখ করেছেন।
এই বিতর্ক প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং ডিরেক্টর জেনারেল (আইটি) সীমা খান্নার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটারদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এগুলি রাজনৈতিক অভিযোগ; নির্বাচন কমিশন SIR-এর সিদ্ধান্তগুলি নিয়ে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে এবং কমিশনের কাজ সর্বসম্মতভাবে হয়েছে বলে জানিয়েছে।
প্রশ্ন থেকেই যায়, নির্বাচনী প্রযুক্তি কে নিয়ন্ত্রণ করবেন, সেই নিয়ন্ত্রণের আইনি ভিত্তি কী এবং কোনো সফটওয়্যার কি কখনও একজন আইনসম্মত নির্বাচনী আধিকারিকের সিদ্ধান্তের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই আগামী দিনে এসআইআর এবং ইসিআইনেট নিয়ে চলা বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।





