সুর চড়ল অভিষেকের, কোন রক্ষাকবচে ভরসা?
Abhishek Banerjee: সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থান দেখা যাচ্ছে। ইডি-সিবিআই থেকে দিল্লি সফর—অভিষেকের এই আত্মবিশ্বাসের নেপথ্যে নিছক প্রতিরোধ নাকি কোনো গোপন রাজনৈতিক সমীকরণ?
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ছয় মাসও কাটেনি। এর মধ্যেই রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হতে শুরু করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থান দেখা যাচ্ছে। শুধু বিজেপি নেতৃত্ব নয়, সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য প্রশাসনকেও নিশানা করছেন তিনি। এমনকি পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন। তাঁর এই অবস্থান ঘিরেই রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এত দিন তুলনামূলকভাবে সংযত থাকা অভিষেক হঠাৎ এতটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন কেন? তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে কি কোনো রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে, নাকি তিনি সম্ভাব্য প্রশাসনিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
সম্প্রতি বিজেপির সমালোচনা করতে গিয়ে অভিষেক প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে কথা বলার পরেও তিনি কীভাবে মুক্তভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছেন। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ বিশেষভাবে রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে। পুলিশ, সিআইডি, ইডি এবং সিবিআইয়ের মতো তদন্তকারী সংস্থাগুলির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সব সংস্থাই তো সরকারের হাতে রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার থাকলে সরকার যেন তা করে দেখায়।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, অভিষেক নিজেই কি সম্ভাব্য কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়ে রাখছেন? তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই অভিযোগগুলিকে কেন্দ্র করে নতুন করে তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে অভিষেক কি আগাম রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করছেন, সেই প্রশ্নও উঠছে।
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক সভায় শুভেন্দু বারবার আগের সরকারের কাজকর্মের সমালোচনা করছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তিনি। কখনও সরাসরি সমালোচনা, কখনও বিদ্রুপের মাধ্যমে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন মঞ্চে মমতার বক্তব্য ও ভঙ্গি অনুকরণ করেও কটাক্ষ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সক্রিয়তা বেড়েছে। এত দিন রাজ্যের রাজনৈতিক সংঘাতের প্রধান মুখ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই সামনে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অভিষেক নিজেই বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছেন। তাঁর বক্তব্যে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতাই নয়, প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জের সুরও রয়েছে। ফলে রাজ্যের বিরোধী রাজনীতিতে তিনি আবারও সামনের সারিতে উঠে এসেছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Abhishek Banerjee: ১৮৮এ, হরিশ মুখার্জি রোডের ‘শান্তিনিকেতন’ ঘিরে এত রহস্য কেন? বারবার সংস্থার নাম বদল, শেল কোম্পানির অভিযোগ, পুরসভার নোটিস এবং সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। সত্যিই কি সব কিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে, নাকি আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে আরও বড় কোনো রহস্য?
অনেকের মতে আবার, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অভিষেককে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ ও তদন্তের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি যদি সরকারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেন, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাঁর লক্ষ্য শুধু নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করা নয়, দলের নিচুতলার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। বার্তা দেওয়া হচ্ছে, শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, মামলা ও রাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও যদি অভিষেক বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব থাকতে পারেন, তাহলে সাধারণ কর্মীদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই। দলের কর্মীদের কাছে এই অবস্থানকে সাহস ও প্রতিরোধের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা থাকতে পারে।
অভিষেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা কম নয়। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থীও বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে অভিযোগ দায়েরের পরেও দৃশ্যমান কোনো বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ না হওয়ায় বিজেপি শিবিরের একাংশের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তাঁদের একাংশের ধারণা, একের পর এক অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলির পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক দিল্লি সফর এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পর রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই সফর ও বৈঠককে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। বিশেষত অভিষেকের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন তথ্য সামনে আসেনি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই দলীয় অনিশ্চয়তার মধ্যেই অভিষেকের সক্রিয়তা বাড়ানোর পিছনে সংগঠনগত কারণও রয়েছে। শুধু বিজেপি সরকারের বিরোধিতা নয়, দলের কর্মী ও নেতাদের কাছে নিজের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে নিচুতলার কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করা এই কৌশলের অংশ হতে পারে।
সম্প্রতি দিল্লির রামলীলা ময়দানে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির সমাবেশেও অভিষেককে সামনের সারিতে দেখা গিয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে কংগ্রেস এই সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। সেখানে বিজেপি-বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। অভিষেকের উপস্থিতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে স্পষ্ট, জাতীয় স্তরেও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিজের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান করতে চাইছেন তিনি।
তবে এই সমস্ত রাজনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন ঘুরছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে। বিধায়কদের স্বাক্ষর জালিয়াতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অভিযোগে অভিষেকের নাম জড়িয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই অভিযোগগুলির তদন্ত কোন পথে এগোবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর এই প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ কি কেবল রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ, নাকি এর পিছনে অন্য কোনো সমীকরণ কাজ করছে?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের অনুমান, অভিষেকের আত্মবিশ্বাসের উৎস নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে রাজ্যের ক্ষমতার নতুন সমীকরণও জড়িয়ে থাকতে পারে। শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে সংঘাত যতই বাড়ুক, রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চলছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। তবে এ ধরনের কোনো সমঝোতা বা গোপন রাজনৈতিক বোঝাপড়ার নির্দিষ্ট প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
বিজেপি সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভিষেক আপাতত বুঝিয়ে দিচ্ছেন, রাজনৈতিক লড়াই থেকে তিনি সরে দাঁড়াতে রাজি নন। কিন্তু তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে নিছক রাজনৈতিক কৌশল, নাকি রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণে অন্য কোনো হিসাব রয়েছে, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের ঘটনাপ্রবাহেই।






