বাদ গেলেন না মহিলারাও, যাজক-উপাসকদের মারধর-হুমকি, গির্জায় হামলা ঘিরে চাঞ্চল্য বাসন্তীতে
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গির্জায় ঢুকেই হামলাকারীরা উপাসক ও অতিথিদের মারধর শুরু করে। বাদ যাননি মহিলারাও। তাঁদের শাঁখা খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গির্জা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। বিশপের সঙ্গে উপস্থিত যাজকদেরও শারীরিকভাবে হেনস্থা ও মারধর করা হয় বলে দাবি।
পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেই চলেছে, এবার অভিযোগ এল বাসন্তী থেকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী থানা এলাকার নারায়ণতলায় ৩১ অক্টোবর ৩০-৩৫ জন সদ্য নির্মিত গির্জার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে হামলা চালায় বলে খবর। হামলাকারীরা নিজেদের হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্য বলে দাবি করেন বলে জানিয়েছেন বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সম্পাদক। অভিযোগ, গির্জার ভিতরে ঢুকে উপস্থিত মানুষদের মারধর করা হয়। আক্রান্ত হন যাজকরাও। এমনকী মহিলাদের শাঁখা খুলে দিয়ে গির্জা থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
গির্জার সদস্য সুবীর গায়েন ও প্রদীপ মণ্ডলের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, শনিবার সকাল প্রায় ৮টা নাগাদ ঘটনাটি ঘটে। CNI-এর বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। সেই সময়ই ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে অভিযোগ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পার্বতীর অভিযোগ, সন্ধ্যায় যখন তাঁরা প্রার্থনা করতে বসেন, সেই সময় ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় জোর করে বাড়িতে ঢুকে তাঁদের মারধর করেন। তাঁর চুলের মুঠি ধরে মারধর করা হয়, স্বামীকে গালিগালাজ করা হয় এবং তাঁর ননদ অর্থাৎ মোহন সোরেনের মেয়ে রেণু সোরেনকেও আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গির্জায় ঢুকেই হামলাকারীরা উপাসক ও অতিথিদের মারধর শুরু করে। বাদ যাননি মহিলারাও। তাঁদের শাঁখা খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গির্জা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। বিশপের সঙ্গে উপস্থিত যাজকদেরও শারীরিকভাবে হেনস্থা ও মারধর করা হয় বলে দাবি। হামলার ছবি বা ভিডিও তোলার চেষ্টা করলে কয়েকজনের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শুধু মারধর নয়, গির্জায় ধর্মীয় উপাসনা বন্ধ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। হামলাকারীরা জানিয়ে দেয়, ওই জায়গায় কোনও গান, প্রার্থনা কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হবে না। কোনও পরিস্থিতিতেই সেখানে উপাসনা চলতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় বলে দাবি গির্জার সদস্যদের।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা-র রাজ্য সম্পাদক হেরোদ মল্লিক যাজক সুভাষিশ গায়েনের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পেরে গির্জার সদস্য সুবীর গায়েনের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতির খোঁজ নেন। এরপর বিসিপি-র লিগ্যাল সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবী স্থানীয় থানার আইসি-র সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। অভিযোগ, একাধিকবার ফোন করা হলেও আইসি ফোন কেটে দেন। পরে পুলিশ সুপারের কাছে ঘটনার কথা জানানো হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই স্থানীয় আইসি আইনজীবীকে জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ বাহিনী পাঠানো হয়েছে।
ইতোমধ্যে আক্রান্ত গির্জার সদস্যদের থানায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের এবং এফআইআর করার পরামর্শ দিয়েছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা (BCP) নেতৃত্ব। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সম্পাদক হেরোড মল্লিকের দাবি, বিশপের উপস্থিতিতে একাধিক যাজককে মারধরের ঘটনা নজিরবিহীন। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে সংগঠিত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলি ক্রমাগত সংখ্যালঘুদের নিশানা করছে। প্রশাসন ও সরকারের তরফে কার্যকর প্রতিরোধের অভাবেই এই ধরনের হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Howrah Christian family: হাওড়ার ভাটোরায় প্রায় আট বছর ধরে খ্রিস্টধর্ম পালন করা এক পরিবারের উপর হামলা, মারধর ও গ্রাম ছাড়ার হুমকির অভিযোগ উঠেছে। কেন ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠছে? স্থানীয়দের একাংশের আচরণের অভিযোগ কতটা সত্য?
হেরোদ মল্লিক আরও জানিয়েছেন, আক্রান্ত গির্জাটি চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার অধীন। ফলে বিষয়টি কোনও বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর হামলার ঘটনা নয়। গির্জা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ঘটনার সময় উপস্থিত বিশপেরও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এমন হামলার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে, উপাসনাস্থলে ঢুকে মারধর, মহিলাদের শাঁখা খুলতে বাধ্য করা এবং প্রার্থনা বন্ধের হুমকির অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভোটের ফলাফল বের হওয়ার দুই মাস পর (৫ জুলাই) শুভাষগ্রামে এক নির্মীয়মান গির্জায় হামলার খবর প্রকাশ্যে আসে। এরপর একের পর এক ঘটনা, ২৬ অগাস্ট পূর্ব মেদিনীপুরের একটি প্রার্থমাসভায় হামলার অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি পাঁশকুরা থানার অন্তর্গত অর্জুন্ডা গ্রামে দুই খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলার খবরও প্রকাশ করেছে ইনস্ক্রিপ্ট। ঘটনাস্থলে গিয়ে ইনস্ক্রিপ্ট দেখে এই দুই পরিবারকে একপ্রকার একঘরে করে দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টানদের উপর ঘটে চলা একের পর এক নির্যাতনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজ্যে পালাবদলের পর এমন ৬০-টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন জেলায়। বিজেপি সরকারের ৬ মাস এখনও পূর্ণ হয়নি, তার মধ্যেই সংখ্যালঘু নির্যাতনের এই সংখ্যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।






