উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম, তবু ফল প্রকাশের দিন হোটেলে কাজে ব্যস্ত সাগর
Sagar Mondal: উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম। মোট ৪৮৮ নম্বর। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন বাড়িতে নয়, গুজরাটের আমেদাবাদের একটি হোটেলে কাজে ব্যস্ত ছিল পূর্ব বর্ধমানের সাগর মণ্ডল। পরিযায়ী শ্রমিকের ছেলে সাগরের স্বপ্ন আইএএস হওয়ার।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সাধারণত অনেক বাড়িতেই উৎসবের আবহ থাকে। পরপর টেলিফোন আসে, আত্মীয়-পরিজনের শুভেচ্ছায় ভরে যায় বাড়ি, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে পরিবার। কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের কালনার ছাত্র সাগর মণ্ডলের জীবনে সেই দিনটি ছিল একেবারেই অন্যরকম। সাগরের জীবনেও নেই আর্থিক স্বচ্ছলতা, নেই ব্যয়বহুল কোচিং, নেই বিশেষ সুবিধা। আছে শুধু অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং দৃঢ় সংকল্প।
২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সাগর রাজ্যে নবম স্থান অধিকার করেছে। তার প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৮। ইংরেজি ও অর্থনীতিতে সে পেয়েছে ৯৯ করে নম্বর। এমন সাফল্য যে কোনো ছাত্রের জন্যই গর্বের। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন সাগর নিজের বাড়িতে ছিল না। সে ছিল প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার দূরে গুজরাটের আমেদাবাদে। হাতে বই ছিল না, ছিল কাজের দায়িত্ব। কারণ অভাবের সংসার তাকে অনেক আগেই শিখিয়ে দিয়েছে, স্বপ্ন দেখতে হলে আগে লড়াই করতে হয়।
সাগরের বাড়ি পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমায়। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় তার আগ্রহ ছিল প্রবল। সবসময় মন দিয়ে পড়ত এবং ক্লাসে নিয়মিত ভালো ফল করত। মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও সে ৬৪৬ নম্বর পেয়েছিল। সেই ফলই জানিয়ে দিয়েছিল, সুযোগ পেলে সে আরও বড় কিছু করতে পারে।
কিন্তু ভালো ফল করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। সাগরের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তার বাবা ও মা বহু বছর ধরে গুজরাটে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। আমেদাবাদে তাঁরা সাফাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত। সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে ছেলের উচ্চশিক্ষার জন্য আলাদা করে টাকা জোগাড় করা সহজ নয়।
সাগর জানে, শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট করলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছনো যায় না। পড়াশোনার পাশাপাশি অর্থের ব্যবস্থাও করতে হয়। তাই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সে বাড়িতে বসে থাকেনি। বাবা-মায়ের কাছে গুজরাটে চলে যায় এবং কাজ শুরু করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন বাংলা শিশুসাহিত্য মূলত বর্ণপরিচয় বা নীতিশিক্ষার কঠোর আবহে বন্দি ছিল, তখন উপেন্দ্রকিশোর সেখানে নিয়ে এলেন একরাশ মুক্ত বাতাস। তাঁর ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ বা পৌরাণিক কাহিনিগুলি কেবল নিছক গল্প নয়; বরং সেগুলি সমকালীন সমাজ-রাজনীতি এবং মানব মনের জটিল ক্রিয়াকলাপের এক শৈল্পিক প্রতিফলন।
আমেদাবাদের একটি হোটেলে সে কাজ শুরু করে। সেখানে সাফাইয়ের কাজ থেকে শুরু করে অন্যান্য ছোটখাটো দায়িত্ব সামলাত। প্রথম মাসে তার বেতন ছিল প্রায় ১৩ হাজার টাকা। পরে সেই বেতন আরও বাড়ার কথা ছিল।
সাগরের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। সে ভবিষ্যতে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দিতে চায়। তার স্বপ্ন একজন আইএএস অফিসার হওয়ার। এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে দীর্ঘ প্রস্তুতি দরকার, দরকার উচ্চশিক্ষা এবং কোচিংয়ের সুযোগ। সেই খরচের কথা ভেবেই এত অল্প বয়সে সে কাজের পথে নেমেছে।
ফল প্রকাশের দিন যখন সে জানতে পারে যে রাজ্যের মেধাতালিকায় তার নাম রয়েছে, তখন সে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। কর্মস্থলে থেকেই সে খবরটি পায়। যে ছেলেটি কয়েকদিন আগেও হোটেলের কাজ করছিল, সেই ছেলেটিই হঠাৎ গোটা পশ্চিমবঙ্গের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
তার এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বহু মানুষ তাকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেন। শিক্ষক, সহপাঠী, প্রতিবেশী—সকলেই গর্ব অনুভব করেন। কিন্তু সাগরের গল্প শুধু তার ভালো ফলের জন্য নয়, জীবনের কঠিন লড়াইয়ের জন্যও মানুষের মন ছুঁয়ে গিয়েছে।
যত বাধাই আসুক, নিজের লক্ষ্য থেকে একটুও সরে যায়নি সাগর। অর্থাভাব, পরিবারের দূরে থাকা, কাজের চাপ—কিছুই তার পড়াশোনার ইচ্ছেকে দুর্বল করতে পারেনি। প্রতিটি বাধা তাকে আরও শক্ত করেছে।
সংবাদ মাধ্যমকে সাগর জানিয়েছে, সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। প্রয়োজনে ওপেন ইউনিভার্সিটির মাধ্যমেও সে পড়াশোনা করবে। কাজ এবং পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সে প্রস্তুত। কারণ তার বিশ্বাস, শিক্ষা এমন এক শক্তি যা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
বাংলার বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রীই আজও আর্থিক অভাবের কারণে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। অনেকেই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সংসারের দায় কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়। কেউ অন্য রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করে, কেউ দোকানে, কেউ কারখানায়। সাগরের সাফল্য সেই সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা প্রতিদিন সংগ্রামের মধ্যেও স্বপ্ন দেখতে ভোলে না।
একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারে, সাগর তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার কৃতিত্ব প্রমাণ করে, সুযোগ সীমিত হলেও ইচ্ছাশক্তি থাকলে পথ তৈরি করা যায়।
রাজ্যের মেধাতালিকায় নবম স্থান অর্জন নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু তার থেকেও বড় সাফল্য, সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যকে অটুট রাখা। সাগর সেই কাজটিই করেছে।







