উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম, তবু ফল প্রকাশের দিন হোটেলে কাজে ব্যস্ত সাগর

Sagar Mondal: উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম। মোট ৪৮৮ নম্বর। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন বাড়িতে নয়, গুজরাটের আমেদাবাদের একটি হোটেলে কাজে ব্যস্ত ছিল পূর্ব বর্ধমানের সাগর মণ্ডল। পরিযায়ী শ্রমিকের ছেলে সাগরের স্বপ্ন আইএএস হওয়ার।

inscript
৩ মিনিট
উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম,  তবু ফল প্রকাশের দিন হোটেলে কাজে ব্যস্ত সাগর

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সাধারণত অনেক বাড়িতেই উৎসবের আবহ থাকে। পরপর টেলিফোন আসে, আত্মীয়-পরিজনের শুভেচ্ছায় ভরে যায় বাড়ি, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে পরিবার। কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের কালনার ছাত্র সাগর মণ্ডলের জীবনে সেই দিনটি ছিল একেবারেই অন্যরকম। সাগরের জীবনেও নেই আর্থিক স্বচ্ছলতা, নেই ব্যয়বহুল কোচিং, নেই বিশেষ সুবিধা। আছে শুধু অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং দৃঢ় সংকল্প।

২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সাগর রাজ্যে নবম স্থান অধিকার করেছে। তার প্রাপ্ত নম্বর ৪৮৮। ইংরেজি ও অর্থনীতিতে সে পেয়েছে ৯৯ করে নম্বর। এমন সাফল্য যে কোনো ছাত্রের জন্যই গর্বের। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন সাগর নিজের বাড়িতে ছিল না। সে ছিল প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার দূরে গুজরাটের আমেদাবাদে। হাতে বই ছিল না, ছিল কাজের দায়িত্ব। কারণ অভাবের সংসার তাকে অনেক আগেই শিখিয়ে দিয়েছে, স্বপ্ন দেখতে হলে আগে লড়াই করতে হয়।

সাগরের বাড়ি পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমায়। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় তার আগ্রহ ছিল প্রবল। সবসময় মন দিয়ে পড়ত এবং ক্লাসে নিয়মিত ভালো ফল করত। মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও সে ৬৪৬ নম্বর পেয়েছিল। সেই ফলই জানিয়ে দিয়েছিল, সুযোগ পেলে সে আরও বড় কিছু করতে পারে।

কিন্তু ভালো ফল করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। সাগরের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তার বাবা ও মা বহু বছর ধরে গুজরাটে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। আমেদাবাদে তাঁরা সাফাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত। সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে ছেলের উচ্চশিক্ষার জন্য আলাদা করে টাকা জোগাড় করা সহজ নয়।

সাগর জানে, শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট করলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছনো যায় না। পড়াশোনার পাশাপাশি অর্থের ব্যবস্থাও করতে হয়। তাই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর সে বাড়িতে বসে থাকেনি। বাবা-মায়ের কাছে গুজরাটে চলে যায় এবং কাজ শুরু করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শিশুসাহিত্যের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতির পাঠ আছে উপেন্দ্রকিশোরের লেখায়

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন বাংলা শিশুসাহিত্য মূলত বর্ণপরিচয় বা নীতিশিক্ষার কঠোর আবহে বন্দি ছিল, তখন উপেন্দ্রকিশোর সেখানে নিয়ে এলেন একরাশ মুক্ত বাতাস। তাঁর ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ বা পৌরাণিক কাহিনিগুলি কেবল নিছক গল্প নয়; বরং সেগুলি সমকালীন সমাজ-রাজনীতি এবং মানব মনের জটিল ক্রিয়াকলাপের এক শৈল্পিক প্রতিফলন।

আমেদাবাদের একটি হোটেলে সে কাজ শুরু করে। সেখানে সাফাইয়ের কাজ থেকে শুরু করে অন্যান্য ছোটখাটো দায়িত্ব সামলাত। প্রথম মাসে তার বেতন ছিল প্রায় ১৩ হাজার টাকা। পরে সেই বেতন আরও বাড়ার কথা ছিল।

সাগরের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। সে ভবিষ্যতে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দিতে চায়। তার স্বপ্ন একজন আইএএস অফিসার হওয়ার। এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে দীর্ঘ প্রস্তুতি দরকার, দরকার উচ্চশিক্ষা এবং কোচিংয়ের সুযোগ। সেই খরচের কথা ভেবেই এত অল্প বয়সে সে কাজের পথে নেমেছে।

ফল প্রকাশের দিন যখন সে জানতে পারে যে রাজ্যের মেধাতালিকায় তার নাম রয়েছে, তখন সে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। কর্মস্থলে থেকেই সে খবরটি পায়। যে ছেলেটি কয়েকদিন আগেও হোটেলের কাজ করছিল, সেই ছেলেটিই হঠাৎ গোটা পশ্চিমবঙ্গের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।

তার এই সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বহু মানুষ তাকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেন। শিক্ষক, সহপাঠী, প্রতিবেশী—সকলেই গর্ব অনুভব করেন। কিন্তু সাগরের গল্প শুধু তার ভালো ফলের জন্য নয়, জীবনের কঠিন লড়াইয়ের জন্যও মানুষের মন ছুঁয়ে গিয়েছে।

যত বাধাই আসুক, নিজের লক্ষ্য থেকে একটুও সরে যায়নি সাগর। অর্থাভাব, পরিবারের দূরে থাকা, কাজের চাপ—কিছুই তার পড়াশোনার ইচ্ছেকে দুর্বল করতে পারেনি। প্রতিটি বাধা তাকে আরও শক্ত করেছে।

সংবাদ মাধ্যমকে সাগর জানিয়েছে, সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। প্রয়োজনে ওপেন ইউনিভার্সিটির মাধ্যমেও সে পড়াশোনা করবে। কাজ এবং পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সে প্রস্তুত। কারণ তার বিশ্বাস, শিক্ষা এমন এক শক্তি যা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

বাংলার বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রীই আজও আর্থিক অভাবের কারণে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। অনেকেই উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সংসারের দায় কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়। কেউ অন্য রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করে, কেউ দোকানে, কেউ কারখানায়। সাগরের সাফল্য সেই সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা প্রতিদিন সংগ্রামের মধ্যেও স্বপ্ন দেখতে ভোলে না।

একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারে, সাগর তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তার কৃতিত্ব প্রমাণ করে, সুযোগ সীমিত হলেও ইচ্ছাশক্তি থাকলে পথ তৈরি করা যায়।

রাজ্যের মেধাতালিকায় নবম স্থান অর্জন নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু তার থেকেও বড় সাফল্য, সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যকে অটুট রাখা। সাগর সেই কাজটিই করেছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘মহাকাব্য যদি কোথাও জন্মে থাকে, তবে তা ফুটপাতে’—কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্তের সঙ্গে 'আড্ডা'য় অত্রি ভট্টাচার্য

The Other Kolkata of krishnapriya Dasgupta: কলকাতার সেই অচেনা ফুটপাতের মানুষরা কীভাবে বেঁচে থাকেন? সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আজকালের প্রাক্তন সাংবাদিক কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত কী দেখেছেন? আর আজকের সংবাদমাধ্যম কেন বদলে গেল তাঁদের দেখার চোখে? তাঁর স্মৃতি, সাংবাদিকতা ও আজকের বদলে যাওয়া শহর নিয়েই তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য।

১৯৭১ থেকে ২০১১: কলকাতার ফুটপাথে থাকা মানুষদের রোজনামচা কেমন ছিল?

Kolkata pavement dwellers survey: ১৯৭১ থেকে ২০১১—এই চার দশকে কলকাতার ফুটপাথবাসীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। ফুটপাথবাসীদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। কেউ থাকেন উড়ালপুলের নীচে, কেউ রেললাইনের পাশে, আবার কেউ পরিত্যক্ত পাইপের ভিতরে। শহরের অসংগঠিত অর্থনীতিতে ফুটপাথবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের জীবনযাপন, কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়ে অতীতে বেশ কিছু গবেষণা ও সমীক্ষাও হয়েছে।

শুধু আমেরিকা বা আফ্রিকাতেই নয়, বাংলাতেও ছিল দাসপ্রথা

International Day for the Remembrance of the Slave Trade and its Abolition: ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক দাসব্যবসা স্মরণ দিবস। হাইতির দাসবিদ্রোহের পাশাপাশি স্মরণ করতে হবে, বাংলার মাটি থেকে লক্ষাধিক মানুষকে বলপূর্বক নির্বাসিত করার ইতিহাস। চট্টগ্রাম, হুগলি, সুন্দরবন হয়ে আরব, আফ্রিকা, মরিশাসে পৌঁছেছেন বাংলার দাসেরা। শুধু ইতিহাসে নয়, আজও বাঙালির আন্তর্জাতিকতা চর্চায় দাসেদের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক।

ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ওপারে, বাংলাদেশে যেভাবে বেঁচে আছেন সাইদা ফকির

Saida Fakir Deportation: বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগের পর কী ভাবে দিন কাটছে সাইদা ফকিরের? বাংলাদেশের কোথায় আছেন? কারা আশ্রয় দিল তাঁকে?

সোনালি সুইটির পর এবার সাইদা, 'ঘাড়ধাক্কা'র তালিকায় নতুন নাম যে প্রশ্ন তুলছে

Saida Fakir Case: সাইদা ফকিরকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবির ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি। কাউকে দেশছাড়া করার আগে যথাযথ তদন্ত ও সাংবিধানিক সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই বিতর্ক ফের উঠে এসেছে।

ফিরে দেখা: সোনালি-সুইটিদের নরক যাত্রা

Sonali Khatun, Sweety Bibi: দু'দশক দিল্লিতে থাকার পরও কেন সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবিদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হলো? নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও কেন জেল, পুশব্যাক ও অপমানের শিকার হতে হলো তাঁদের? সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিল?