উস্কানি দেওয়া যাবে না! CJP আন্দোলন নিয়ে কী নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের?
শুনানিতে উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারপতি ভি মোহনা বলেন, আপনারা যদি সত্যিই জনকল্যাণে আগ্রহী হন, তা হলে আপনাদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার এবং অন্য কাউকে উস্কানি না দেওয়ার অঙ্গীকার করা উচিত।
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র আন্দোলন ঘিরে দিল্লিতে পুলিশি ধরপাকড়, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধের অভিযোগে রবিবার বিশেষ শুনানি হলো সুপ্রিম কোর্টে। শুনানিতে একদিকে আন্দোলনকারীদের বেআইনি আটক, আইনজীবীদের হেনস্থা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করার অভিযোগ তোলেন আবেদনকারীদের আইনজীবীরা। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের হয়ে সওয়াল করে আইনজীবী জানান, বিক্ষোভের সময় পুলিশকর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা দাবি করেন, মেট্রো পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি এবং আটক ব্যক্তিদের ইতিমধ্যেই মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে এই শুনানি হয়। শুনানিতে শুধু বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নয়, নাগরিকের চলাচলের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার এবং প্রশাসনের ক্ষমতার সীমা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।
শুনানির শুরুতেই আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল। তাঁর অভিযোগ, দিল্লিতে বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা মানুষদের ট্রেন থেকে নামিয়ে আটক করা হচ্ছিল। যন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে বিধিনিষেধ থাকলেও তার বাইরেও মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সিব্বল আরও বলেন, শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট মেট্রো ও ট্রেন পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ না রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। তা সত্ত্বেও শনিবার দিল্লির ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং ইন্টারনেট পরিষেবাও ব্যাহত হয় বলে তিনি আদালতের নজরে আনেন।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের উপর আস্থা হারানোর কথা সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন সিব্বল। তাঁর সেই মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, “আমরা এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মিস্টার সিব্বলের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখানে রয়েছি।” বিচারপতির বক্তব্যে উঠে আসে, ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে আদালতের উপর মানুষের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
শুনানিতে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন প্রবীণ আইনজীবী শাদান ফারাসাত। শনিবার যাঁদের আটক করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। ফারাসাতের অভিযোগ, তাঁকেও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে এবং তাঁকে একটি চলন্ত বাসে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আদালতে বলেন, বিষয়টি শুধু আইনজীবীদের অধিকারের নয়। আইনজীবীরা বৃহত্তর নাগরিক সমাজেরই অংশ, তাঁদের আলাদা কোনও বিশেষ অধিকার নেই। তাঁর বক্তব্য, দিল্লিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে একজন মানুষকে রাস্তায় দাঁড়াতেও দেওয়া হচ্ছিল না।
ফারাসাতের কথায়, “আমার মনে হয়েছিল, আমরা পুলিশি রাষ্ট্রের এক ধাপ দূরে ছিলাম।” তিনি আদালতের কাছে দেশের রাজধানীতে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Human rights violation in cockroach protests: ১০ অক্টোবর, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির ডাকে দিল্লির বিক্ষোভে, পুলিশি দমনপীড়নে ৭ হাজারের বেশি আটক হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ বন্দিদের ‘তাৎক্ষণিক নিঃশর্ত মুক্তি’ দাবি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক এই বিবৃতি, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ ও ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনার ভিডিও ফুটেজের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও পদক্ষেপ যুক্তিসঙ্গত ছিল কি না, তা বিচার করার আগে দেখতে হবে সেই পদক্ষেপ আদৌ প্রয়োজনীয় ছিল কি না।
শান্তিপূর্ণভাবে চলাফেরা করা নিরস্ত্র মানুষ, শিশু ও পড়ুয়াদের আটক করা এবং তাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর প্রয়োজন ছিল কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। অবিলম্বে সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক করা এবং সমস্ত ব্যারিকেড সরানোর আবেদন জানান শঙ্করনারায়ণ। পাশাপাশি, নামের ব্যাজ ছাড়া পুলিশকর্মীদের উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আশপাশে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করার আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন এই আইনজীবী।
দিল্লি পুলিশের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী জয় অনন্ত দেহাদরাই। তাঁর বক্তব্য, বিক্ষোভ চলাকালীন একাধিক পুলিশকর্মীও হেনস্থা ও হামলার শিকার হয়েছেন।
এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, কার উপর অন্যায় হয়েছে, তার ভিত্তিতে আদালত পক্ষ বেছে নেবে না। নাগরিক হোন বা পুলিশকর্মী, সকলের জীবন ও স্বাধীনতা রক্ষা করা আদালতের দায়িত্ব।
বিচারপতি বাগচীর বক্তব্য, “পুলিশ আধিকারিকদের রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের মতো করে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার কোনও ব্যক্তিগত অধিকার নেই।” একই সঙ্গে তিনি জানান, জীবন ও স্বাধীনতার প্রশ্নে প্রত্যেকের অধিকার সমান গুরুত্বপূর্ণ। আদালত সংশ্লিষ্ট সব আবেদন শুনবে এবং বিষয়গুলি নিয়ে একটি সমন্বিত নির্দেশ দেবে।
প্রবীণ আইনজীবী শোয়েব আলম দাবি করেন, বিক্ষোভ থেকে প্রায় ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ মানুষকে আটক করা হয়েছিল। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক নেতাদের আটক করার বিরুদ্ধে আবেদন করা আইনজীবী এবং তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মেনকা গুরুস্বামী বলেন, বিষয়টি শুধু আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। তরুণদের কাছে যে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অন্যায্য বলে মনে হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করে প্রতিবাদ করার সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Delhi protests on Mahalaya: শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে দিল্লির ব্যস্ততম রাস্তাগুলিতে শুরু হয় চেকিং। পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা যন্তর মন্তর সংলগ্ন এলাকা, এমনকী বিমানবন্দরের আশেপাশেও গাড়ি দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করেন। এর আরও ঘণ্টাখানেক পর যন্তর মন্তর সংলগ্ন এবং মধ্য দিল্লির বড় অংশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। এয়ারপোর্টেও জারি করা হয় ট্রাভেল অ্যাডভাইসারি।
গুরুস্বামীর বক্তব্য, “আরও গুরুতর বিষয় ঝুঁকির মুখে, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা সাংবিধানিক অধিকার স্থগিত হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন।” তিনি অতীতে জরুরি অবস্থার সময় নাগরিক অধিকারের এমন প্রশ্ন আদালতের সামনে আসার প্রসঙ্গও তোলেন।
আবেদনকারীদের অভিযোগের জবাবে কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তাঁর বক্তব্য, আটক ব্যক্তিদের ইতিমধ্যেই মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মেট্রো পরিষেবার মোট পরিমাণও কমানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
মেহতা জানান, দিল্লি মেট্রোর মোট ৩০৩টি স্টেশনের মধ্যে ৪৫টি বন্ধ রাখা হয়েছিল, অর্থাৎ মোট স্টেশনের প্রায় ১৫ শতাংশ। তাঁর দাবি, ১০ অক্টোবর রাত ১০টার পর সব স্টেশনই খুলে দেওয়া হয়েছিল।
এই বক্তব্যের পর বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশনকে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলির অবস্থান মেট্রো মানচিত্রে স্পষ্ট করে দেখাতে বলেন, যাতে আদালত বুঝতে পারে কোন এলাকাগুলিতে পরিষেবা বন্ধ ছিল। ট্রেন পরিষেবা নিয়ে জারি করা বিজ্ঞপ্তিগুলিও দেখতে চায় বেঞ্চ।
কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, শহরে ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় চালু হয়েছে এবং মেট্রো ও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। আইনজীবী, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশাজীবীরা যাতে তাঁদের কাজ করতে গিয়ে বাধার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করার আশ্বাসও দেন সলিসিটর জেনারেল।
শুনানিতে আবেদনকারীদের আইনজীবীরা জানান, সুপ্রিম কোর্টের আশপাশেও ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারির নোটিস লাগানো হয়েছিল। এই ধারায় জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে জরুরি পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট জমায়েতের উপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা যায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, সুপ্রিম কোর্ট ও অন্যান্য আদালতে প্রবেশ এবং বেরোনোর ক্ষেত্রে যাতে কোনও আশঙ্কা বা বাধা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আদালত চত্বরের আশপাশে ১৬৩ ধারা জারির যে নোটিস বোর্ড লাগানো হয়েছিল, তা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়, যদি ইতিমধ্যে তা সরানো না হয়ে থাকে।
বেঞ্চের নির্দেশ, শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র জমায়েতের ক্ষেত্রে, বিশেষত যে এলাকায় ১৬৩ ধারা কার্যকর নয়, সেখানে আইনসম্মত পদ্ধতি ছাড়া কাউকে আটক করা যাবে না। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রয়োজন, দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখার উপর গুরুত্ব দেয় আদালত।
শুনানিতে উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারপতি ভি মোহনা বলেন, আপনারা যদি সত্যিই জনকল্যাণে আগ্রহী হন, তা হলে আপনাদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার এবং অন্য কাউকে উস্কানি না দেওয়ার অঙ্গীকার করা উচিত।
বেঞ্চ আরও জানায়, সংবিধানের ১৯(২) অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট কারণে জনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। তবে সেই বিধিনিষেধের অজুহাতে মানুষের অবাধ চলাচল বা শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার অযথা খর্ব করা যাবে না।
মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধের বিষয়টি বিবেচনা করে ব্যারিকেডের প্রয়োজনীয়তা অবিলম্বে পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেয় আদালত। ট্রাফিক বিধি মেনে দিল্লিতে মানুষের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং আইন অনুযায়ী ইন্টারনেট পরিষেবা অক্ষুণ্ণ রাখতেও বলা হয়। বিচারপতি ভি মোহনা স্পষ্ট করেন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশাসনিক ক্ষমতা আদালত খর্ব করছে না।
শুনানির শেষে সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হলফনামা এবং নির্দেশ পালনের রিপোর্ট জমা দিতে বলে। মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং আগের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে যাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন করা হয়েছে, তাঁদের কাছেও জবাব চাওয়া হয়।
বেঞ্চ জানায়, শনিবারের ঘটনা নিয়ে জমা পড়া অন্যান্য আবেদনগুলির প্রতিলিপি কেন্দ্রের আইনজীবীর দফতরে জমা দিতে হবে, যাতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ নিতে পারেন। আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনও বাধা যাতে না আসে, তা নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রকে সময়ও দেওয়া হয়।
এই মামলায় আদালতের নির্দেশের পর নজর রয়েছে দিল্লির প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবের দিকে। মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত, বিক্ষোভকারীদের আটক এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেওয়া হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের এই শুনানি থেকে স্পষ্ট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রশাসনের থাকলেও সেই যুক্তিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা খর্ব করা যায় না।






