কুকি-নাগা সংঘর্ষে ৯ জনের মৃত্যু, মণিপুরে কেন শান্তি ফেরানো যাচ্ছে না?
Manipur Violence: সংঘর্ষের সূত্রপাত কামজং জেলার চাসাদ গ্রামে। শুক্রবার রাতে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীদের গুলিতে ২২ বছরের এক মহিলার মৃত্যু হয়। ওই মহিলা পাঁচ সন্তানের মা ছিলেন।
মণিপুরে ফের নতুন করে হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজ্যের পাহাড়ি জেলাগুলিতে কুকি ও নাগা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবারের মধ্যে কামজং, উখরুল এবং কাংপোকপি জেলায় একের পর এক হিংসার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি এখনও উত্তপ্ত। নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়া আটকাতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং সব সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে শান্তি ও সংযম বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাধারণ নাগরিকদের হত্যা এবং হিংসার ঘটনায় তিনি নিন্দা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, শান্তি ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তাঁর আবেদন, কোনো সম্প্রদায় যেন উত্তেজনায় পা না দেয়। আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মিটিয়ে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত কামজং জেলার চাসাদ গ্রামে। শুক্রবার রাতে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীদের গুলিতে ২২ বছরের এক মহিলার মৃত্যু হয়। ওই মহিলা পাঁচ সন্তানের মা ছিলেন। চাসাদ গ্রামটি কুকি অধ্যুষিত এলাকা হলেও এটি নাগা-প্রধান কামজং জেলার অন্তর্গত। মহিলার মৃত্যুর পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কুকি ও নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির মধ্যে গুলির লড়াই শুরু হয়, যা শনিবার সকাল পর্যন্ত চলে।
এই সংঘর্ষে ৪২ বছরের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লেখা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তত ১০টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় চাসাদ এলাকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নতুন করে যাতে হিংসা না ছড়ায়, সেই উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ।
কামজং ও কাংপোকপি জেলায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, সংঘর্ষ থামিয়ে আক্রান্ত এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় পাহাড়ি অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manipur Violence 2023: ইনার লাইন পারমিট সিস্টেম চালু হলে যারা মণিপুরের বাসিন্দা নন তাদের মণিপুরে আসতে গেলে এক অতিরিক্ত অনুমতিপত্র করাতে হবে।
চাসাদের ঘটনার পর কাংপোকপি জেলার তাপোন ও মাকুই গ্রামেও হামলার খবর সামনে এসেছে। শনিবার সন্দেহভাজন জঙ্গিদের হামলায় দুই নাগা গ্রামরক্ষী, এম দামাই ও আর গাংমেই এবং রিংকাংমাই নামে আরও এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে খবর সামনে এসেছে।
এদিকে নাগা নাগরিক সংগঠন ওয়ার্কিং কমিটি জেটিসি মণিপুরের অভিযোগ, ৫২ বছরের অজিনবৌ আর নামে এক গ্রামবাসীকে হত্যা করে তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়েছে। সংগঠনটি মৃতের দেহের বিচ্ছিন্ন অংশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে, যাতে মর্যাদার সঙ্গে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা যায়। তবে এই ঘটনার সমস্ত বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কামজং জেলার নিংচৌ গ্রামেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভারত-মায়ানমার সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই গ্রামে টাংখুল নাগা জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। শনিবার সন্দেহভাজন সশস্ত্র হামলাকারীরা গ্রামে ঢুকে গুলি চালায়। তাতে ৩৫ বছরের নাগাচানসো নিংশেন এবং ৪৮ বছরের লেইশিশান লেইশাডাংয়ের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে পৌঁছয়। স্থানীয়দের দাবি, হামলাকারীরা গুলি চালিয়ে মায়ানমারের দিকে পালিয়ে যায়।
উখরুল জেলাতেও গুলির ঘটনায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। শনিবার চেপু ইয়াওলেন গ্রামের কাছে একটি গাড়ি লক্ষ্য করে সন্দেহভাজন সশস্ত্র ব্যক্তিরা গুলি চালায়। গাড়ির চালক, ৪০ বছরের সন্দীপ রাই, ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে কাংপোকপি জেলার মাকুই আশাং ও তাপোন এলাকাতেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির মধ্যে গুলির লড়াইয়ের খবর পাওয়া গিয়েছে।
মণিপুরে কুকি ও নাগা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ নতুন নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে হিংসার ঘটনায় ৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে। বহু বাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এর আগে ২০২৩ সালে মণিপুরে মেইতেই ও কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক জাতিগত হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল। ইম্ফল উপত্যকায় বসবাসকারী মেইতেই এবং পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলের কুকিদের মধ্যে সংঘর্ষে ৩০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। নিখোঁজ হন বহু মানুষ এবং হাজার হাজার বাসিন্দাকে ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়। সেই হিংসার ক্ষত এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে কুকি ও নাগাদের মধ্যে সংঘর্ষ রাজ্যের নিরাপত্তা ও শান্তি ফেরানোর প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আক্রান্ত গ্রামগুলিতে হিংসা বন্ধ করা এবং দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
মুখ্যমন্ত্রী শান্তি ও সংযমের আবেদন জানালেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কতটা সময় লাগবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। নতুন করে যাতে প্রাণহানি না ঘটে এবং সাধারণ মানুষ যাতে নিরাপদে নিজেদের গ্রামে ফিরতে পারেন, তার জন্য প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি।






