গাজার মানুষ থাকবে গাজাতেই, স্বাধীন প্যালেস্টাইনের পক্ষে দিল্লি ঘোষণাপত্র
BRICS Delhi Declaration: দিল্লিতে শেষ হওয়া ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাধীন, সার্বভৌম ও কার্যকর প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছে। সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১৯৬৭ সালের সীমারেখা। গাজা ও পশ্চিম তীরকে সেই ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে ধরে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করার কথাও বলা হয়েছে।
গাজা নিয়ে যুদ্ধ গত প্রায় দু’বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে রয়েছে। বোমাবর্ষণ, মৃত্যু, ক্ষুধা, ধ্বংসের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে আরও একটি বিষয় নিয়ে—এই যুদ্ধের শেষে গাজার ভবিষ্যৎ কী হবে? প্যালেস্টাইনিরা নিজেদের ভূখণ্ডে থাকতে পারবেন? গাজার ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলে দেওয়া হবে? প্যালেস্টাইন কি শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে?
দিল্লিতে শেষ হওয়া ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাপত্রে এই প্রশ্নগুলির বেশ কিছু স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়। ঘোষণাপত্রে স্বাধীন, সার্বভৌম ও কার্যকর প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছে। সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১৯৬৭ সালের সীমারেখা। গাজা ও পশ্চিম তীরকে সেই ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে ধরে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্যালেস্টাইন প্রশ্নে ব্রিকসের বক্তব্য শুধু যুদ্ধবিরতির মধ্যে আটকে নেই। যুদ্ধের পর যে রাজনৈতিক সমাধানের কথা এত দিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলে বলা হয়েছে, সেই দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকেই আবার সামনে আনা হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, কোনো অজুহাতেই প্যালেস্টাইনিদের তাদের ভূখণ্ড থেকে জোর করে সরানো যাবে না। সেই সরিয়ে দেওয়া সাময়িক হোক বা স্থায়ী—দু'ক্ষেত্রেই আপত্তি জানিয়েছে ব্রিকস। একই সঙ্গে গাজার ভৌগোলিক বা জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলে দেওয়ার যে কোনো চেষ্টাকেও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব বোঝার জন্য গাজার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকানো প্রয়োজন। যুদ্ধের মধ্যে শুধু মানুষ মারা যাচ্ছেন না, বিপুল সংখ্যক মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল এবং নাগরিক পরিকাঠামো। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও মানুষ কোথায় ফিরবেন, তাঁদের নিজেদের এলাকায় ফেরার অধিকার থাকবে কি না এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক কাঠামো কী হবে—এসব প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BRICS Summit 2026: ২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলন থেকে ভারত ঠিক কী পেল? কূটনীতি, বাণিজ্য, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবাদ ও গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ভারতের কতটা লাভ হলো? চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতার মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে ভারত নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারল, আর কোন প্রত্যাশাগুলি পূরণ হলো না?
ব্রিকসের ঘোষণাপত্র সেই জায়গাতেই ‘ফিরে যাওয়ার অধিকার’ এবং ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’-এর কথা বলেছে। ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাতের ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধান সামরিক পথে নয়, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সম্ভব।
এখানেই ‘টু-স্টেট সলিউশন’ বা দ্বিরাষ্ট্র সমাধান সামনে আসে। এর মূল ধারণা, ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন দুটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে পাশাপাশি থাকবে এবং উভয়েরই নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় অধিকার থাকবে। বহু বছর ধরে রাষ্ট্রসংঘ-সহ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই সমাধানকে প্যালেস্টাইন সমস্যার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক পথ হিসেবে দেখা হয়েছে। দিল্লি ঘোষণাপত্রও সেই অবস্থান থেকে সরে যায়নি। বরং প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রসংঘের পূর্ণ সদস্য করার পক্ষে সমর্থনের কথাও বলা হয়েছে।
প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষেত্রে ঘোষণাপত্রের ভাষাটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে শুধু ‘প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র’ বলা হয়নি। বলা হয়েছে, সেটি হবে ‘সার্বভৌম, স্বাধীন এবং কার্যকর’ রাষ্ট্র। তার ভূখণ্ডের ভিত্তি হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১৯৬৭ সালের সীমারেখা, যার মধ্যে গাজা ও পশ্চিম তীর রয়েছে। পূর্ব জেরুজালেম হবে তার রাজধানী। অর্থাৎ প্যালেস্টাইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আন্তর্জাতিক কাঠামো বহু বছর ধরে আলোচিত, দিল্লির ঘোষণাপত্র মূলত সেটিকেই পুনরায় সমর্থন করেছে।
জেরুজালেমের প্রসঙ্গটিও আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। ঘোষণাপত্রে অধিকৃত জেরুজালেমের আইনি ও ঐতিহাসিক অবস্থান একতরফাভাবে বদলে দেওয়ার বিরোধিতা করা হয়েছে। শহরের ধর্মীয় স্থানগুলির পবিত্রতা এবং সেখানে মানুষের ধর্মীয় অধিকার ও প্রবেশাধিকারের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ জেরুজালেমকে কোনো এক পক্ষের একতরফা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার বিরোধিতা করেছে ব্রিকস।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
The Forgotten Speech of Atal Bihari Vajpayee: ১৯৭৭ সালের ২৪ মার্চ রামলীলা ময়দানে অটল বিহারী বাজপেয়ী ঘোষণা করেছিলেন, ইজরায়েলকে আরবদের দখল করা ভূমি খালি করতেই হবে। ফিলিস্তিনিদের বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। ছেচল্লিশ বছর পর সেই ভাষণের ভিডিও ভাইরাল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা 'ফ্রি ফিলিস্তিন' পোস্টারের পক্ষে বাজপেয়ীর বক্তব্য ব্যবহার করছেন। কিন্তু যে বাজপেয়ী ২০০৩ সালে এরিয়েল শ্যারনকে আতিথ্য দিয়েছিলেন, তিনি কি আজও ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলতেন?
গাজার বর্তমান পরিস্থিতিও ঘোষণাপত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিকস সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে এবং গাজায় যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার কথা বলেছে। একই সঙ্গে মানবিক সাহায্য যেন পূর্ণাঙ্গ এবং বাধাহীনভাবে গাজায় পৌঁছতে পারে, সেই দাবিও জানানো হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে গাজায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বেসামরিক মানুষ এবং বেসামরিক পরিকাঠামোর উপর হামলা, হাসপাতাল ও অন্যান্য নাগরিক স্থাপনায় আক্রমণ এবং মানবিক সাহায্যের পথে বাধা দেওয়ার মতো বিষয়গুলির নিন্দা করা হয়েছে। এমনকি যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার করার বিরুদ্ধেও ব্রিকসের অবস্থান স্পষ্ট। রাষ্ট্রসংঘের প্যালেস্টাইন শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা UNRWA-র ভূমিকাকেও সমর্থন করা হয়েছে।
এখানে আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যে মামলা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা ICJ-তে করেছে, ঘোষণাপত্রে সেই মামলার অন্তর্বর্তী নির্দেশগুলির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছনোর ক্ষেত্রে ইজরায়েলের আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
তবে এই ঘোষণাপত্রকে শুধুমাত্র ‘ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ব্রিকসের অবস্থান’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির নিজেদের মধ্যেই পশ্চিম এশিয়া নিয়ে একাধিক মতপার্থক্য রয়েছে। সম্প্রসারণের পর গোষ্ঠীতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশও রয়েছে। ফলে ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন প্রশ্নে এমন একটি যৌথ ভাষা তৈরি করা, যার মধ্যে প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রীয় অধিকার, যুদ্ধবিরতি, মানবিক সাহায্য এবং আন্তর্জাতিক আইন—সবকিছুই রয়েছে, সেটিকে সদস্য দেশগুলির মধ্যে তৈরি হওয়া একটি কূটনৈতিক ঐকমত্য হিসেবেই দেখা যায়।
আর এখানেই ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আসে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই প্যালেস্টাইনের স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষে এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করে আসছে। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনেক গভীর হয়েছে। ফলে দিল্লির কূটনীতিতে দুটি বাস্তবতাই পাশাপাশি রয়েছে। একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, অন্যদিকে প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রতি ঐতিহাসিক সমর্থন।
দিল্লি ঘোষণাপত্রে ইজরায়েলকে সরাসরি আক্রমণ করার ভাষার বদলে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব এবং প্যালেস্টিনি জনগণের অধিকারকে সামনে রাখা হয়েছে। ফলে এটিকে ভারতের বিদেশনীতির আমূল পরিবর্তন বলা কঠিন। বরং ভারতের দীর্ঘদিনের ‘টু-স্টেট সলিউশন’-এর অবস্থানই ব্রিকসের যৌথ মঞ্চে নতুন করে উচ্চারিত হয়েছে।
তবে সময়ের কারণে এই অবস্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব আলাদা। গাজায় যুদ্ধ, সংকট এবং প্যালেস্টিনিয়দের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক স্তরে বিতর্ক চলছে, তখন ব্রিকসের মতো একটি বৃহৎ গোষ্ঠী যদি স্পষ্ট করে বলে, গাজা থেকে প্যালেস্টিনিয়দের জোর করে সরানো যাবে না এবং গাজার ভৌগোলিক বা জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলানো যাবে না, তখন সেটি নিছক কূটনৈতিক বাক্য থাকে না। এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানও তৈরি করে।








