সুপারমার্কেটের শাকে নয়, বুনোশাকেই রয়েছে বেশি পুষ্টিগুণ
Wild leafy greens: Scientific Reports (2024)-এর গবেষণা বলছে, বাণিজ্যিক উপায়ে চাষ করা সাধারণ সবজির চেয়ে এই বুনো শাকগুলিতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ ও সি এবং ফাইবার অনেক বেশি থাকে। এমনকী কর্ণাটকের সোলিগা উপজাতির মহিলারা গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতা দূর করতে বিশেষ কিছু বুনো শাক ব্যবহার করে আসছেন যুগের পর যুগ।
বর্ষার প্রথম একটানা বৃষ্টিটা নামলেই বাংলার প্রকৃতি এক সবুজ রূপ নেয়। আমরা যখন সুপারমার্কেটের র্যাক থেকে ব্রকলি, কেল বা কেমিক্যালে ধোয়া লেটুস কিনে নিজেদের অত্যন্ত স্বাস্থ্য সচেতন ভাবি, ঠিক তখনই আমাদের গ্রাম-বাংলার পুকুরপাড়, খালের ধার কিংবা ধানখেতের আলে গজিয়ে ওঠে আমাদের 'সুপারফুড'।
বর্ষায় সুপারমার্কেটের গ্রিন লিভসের চেয়ে মাঠের শাকে বেশি পুষ্টিগুণ থাকে
বর্ষার জল পেলেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় শাক কুড়ানোর দিন। সকালে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে পুকুরপাড় থেকে কুড়িয়ে আনা থানকুনি, অগভীর জলে ছড়িয়ে পড়া কলমি কিংবা ভিজে ঘাসজমিতে গজিয়ে ওঠা হেলেঞ্চা রান্নাঘরে পৌঁছে যায় অনায়াসে। এদের কোনো কৃত্রিম সার লাগে না, বিশেষ যত্ন বা পরিচর্যারও দরকার হয় না। সামান্য সরষের তেল, একটু রসুন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে হালকা সাঁতলানো এই শাকগুলি কেবল মুখের স্বাদই ফেরায় না, বর্ষার স্যাঁতসেঁতে দিনে পেট ঠান্ডা রাখতে আর শরীর চাঙ্গা রাখতে এদের জুড়ি মেলা ভার। সঙ্গে সুশনি, হিঞ্চে, নোটে শাক কিংবা নদীর ধারের বুনো কচুপাতা তো আছেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Jaundice Diet: ডা. ফিলিপসের কথায়, "জন্ডিস বা হেপাটাইটিসের চিকিৎসা মানেই শুধু সেদ্ধ খাবার, সবজি খেয়ে থাকা বা তেল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং ভালো করে খেতে হবে। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি—সবই প্রয়োজন। শরীর যত ভালো পুষ্টি পাবে, তত দ্রুত সুস্থ হবে।"
এই বুনো শাকগুলির সৌন্দর্য স্রেফ বাংলাতেই নেই। আমাদের কলমি বা হেলেঞ্চার মতোই সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে আছে এমনই সব অসাধারণ মরসুমি শাক। অঞ্চলভেদে মানুষ এদের চেনে নানা নামে—কোথাও ‘সাগ’, কোথাও ‘সোপ্পু’, ‘কিলই’ কিংবা ‘ভাজি’।
তবে চাষ করা পালং বা বাঁধাকপির মতো এরা সারা বছর বাজারে মেলে না। বৈশাখের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়, তখনো এদের বীজ মাটির নিচে থাকে। তারপর বর্ষায় যখন মাটি নরম হয় আর বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ে, তখন এরা গজিয়ে ওঠে। নদী-নালা, বনের স্যাঁতসেঁতে কোণ আর পলিমাটির পুষ্টিকে কাজে লাগিয়ে মাত্র ছয় থেকে দশ সপ্তাহের মধ্যে এরা নিজেদের পুরো জীবনচক্র শেষ করে ফেলে।
বাংলার মতোই ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলিতেও বর্ষার এই বুনোশাক আসে আলাদা আলাদা রূপে। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ বা কোরাপুট অঞ্চলের পাহাড়ি গ্রামে বর্ষার সকালে বাঁশের ঝুড়ি হাতে নারীরা বনে বের হন। তারা খুব সাবধানে গাছের শুধু কচি পাতাটুকু কেটে নেন, যাতে গাছটি আবার স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে। কোশলা, কলম, বন পালং কিংবা ফুটকালের মতো বহু ধরনের সাগ তারা সংগ্রহ করেন। ডাল, সরষে বা শুঁটকি মাছ দিয়ে রেঁধে ফেলা এই শাকগুলি একসময় অভাবের দিনে গ্রামের মানুষের শরীরে আয়রন ও ক্যালসিয়ামের জোগান দিত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rheumatoid Arthritis Treatment: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব না হলেও চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। DMARDs, বায়োলজিক ওষুধ, JAK inhibitor, স্টেরয়েড এবং ব্যথানাশক ওষুধের সাহায্যে অধিকাংশ রোগীর প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বুনোশাকগুলিই শরীরে আয়রন, ম্যালশিয়ামের জোগান দেয়
আবার মহারাষ্ট্রের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার গ্রামগুলিতে ভারী বৃষ্টির পরপরই রাস্তার ধারে বা চারণভূমিতে গজিয়ে ওঠে তাকলা ভাজি। কিছুটা তেতো স্বাদের এই পাতা প্রথমে সেদ্ধ করে কষ ফেলে দেওয়া হয়, তারপর ভাজা বাদাম, নারকেল আর বেসন দিয়ে তৈরি হয় লোভনীয় সব পদ।
অন্যদিকে কর্ণাটকে বর্ষা নামা মানেই বাজারে সোপ্পু-র মেলা। বাজরার খেতের পাশ থেকে তোলা অগসে সোপ্পু বা দান্তু সোপ্পুর মতো নানা শাক ডাল দিয়ে ঘন করে রেঁধে বানানো হয় ঐতিহ্যবাহী সোপ্পু সারু।
দক্ষিণের কেরলে নারকেল বাগান আর বাড়ির উঠোনে বৃষ্টির ছোঁয়ায় গজিয়ে ওঠে চেরা, মুথিল বা কোডিথুভার মতো ভেষজ। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে সেখানে প্রায় দশ ধরনের বুনো পাতা একসঙ্গে নারকেল দিয়ে রান্না করে ‘পাথিল থোরান’ বানানো হয়, যা বর্ষায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আর উত্তর-পূর্ব ভারতের অসম বা মেঘালয়ে পাহাড়ি ঝরনার ধার থেকে সংগৃহীত কচি ঢেঁকি শাক কিংবা বাঁশ করুল দিয়ে তৈরি পদ তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
Scientific Reports (2024)-এর গবেষণা বলছে, বাণিজ্যিক উপায়ে চাষ করা সাধারণ সবজির চেয়ে এই বুনো শাকগুলিতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ ও সি এবং ফাইবার অনেক বেশি থাকে। এমনকী কর্ণাটকের সোলিগা উপজাতির মহিলারা গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতা দূর করতে বিশেষ কিছু বুনো শাক ব্যবহার করে আসছেন যুগের পর যুগ। International Journal of Pharmacognosy and Phytochemical Research (2014) জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, সোলিগাদের ব্যবহৃত বুনো শাকের পাতায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং ক্ষত নিরাময়কারী গুণ রয়েছে। যেহেতু এরা প্রকৃতির নিজের নিয়মে বাড়ে, তাই এতে কোনো কীটনাশক বা রাসায়নিক সারের বিষ থাকে না। পরিবেশের উপর কোনো আঁচ না ফেলেই এরা আমাদের পাতে জোগায় সেরা পুষ্টি।
একসময় যেসব শাককে "গরিবের খাবার" বলে এড়িয়ে যাওয়া হতো, আজ বিশ্বজুড়ে পুষ্টিবিদরা সেগুলির আসল কদর বুঝতে পারছেন। কিন্তু আফসোসের কথা হলো, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, জলাভূমি ভরাট আর জঙ্গল কেটে ফেলার কারণে পরিবেশ থেকে এই অমূল্য উপাদানগুলি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে হারাচ্ছে ঐতিহ্যগত জ্ঞানও। যেখানে বয়স্ক মানুষেরা অনায়াসে চল্লিশ-পঞ্চাশ ধরনের ভোজ্য শাক চিনে নিতে পারেন, সেখানে নতুন প্রজন্ম হয়তো দশ-বারোটির বেশি চেনেই না। কোনটা খাওয়ার উপযোগী আর কোনটা নয়—এই সহজ পরিবেশবান্ধব বিদ্যাটুকু বাঁচিয়ে রাখাটা এখন বড্ড জরুরি। তবে, বেঙ্গালুরু, মুম্বই বা কলকাতার মতো ব্যস্ত শহরেও এখন ‘ফরেজিং ওয়াক’ বা বুনো শাক চেনার সচেতনতা অভিযান শুরু হয়েছে।






