কর্মদক্ষতা মাপল এআই, চাকরি হারালেন কর্মীরা? মেটার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা
Meta mass layoffs: কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেবে? মেটার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ, এআই-নির্ভর মূল্যায়নের কারণে মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীরা অন্যায্যভাবে চাকরি হারিয়েছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আজ কর্মক্ষেত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। নিয়োগ থেকে শুরু করে কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তিই যদি কর্মীদের চাকরি কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। ঠিক এমনই এক অভিযোগকে ঘিরে নতুন বিতর্কের মুখে পড়েছে মেটা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল সংস্থা মেটার বিরুদ্ধে ২৬ জন বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে মামলা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, সংস্থাটি গণছাঁটাইয়ের সময় এআই-ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসাজনিত ছুটি বা প্রতিবন্ধকতার কারণে ছুটিতে থাকা কর্মীদের অন্যায্যভাবে ছাঁটাইয়ের তালিকায ঠেলে দিয়েছে।
মামলাটি দায়ের হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল আদালতে। অভিযোগকারীদের দাবি, মেটা শুধুমাত্র মানব ম্যানেজারদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করেনি। কর্মীদের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই-নির্ভর একাধিক অভ্যন্তরীণ টুল ব্যবহার করা হয়েছে। এই টুলগুলির মধ্যে ছিল কর্মক্ষমতার স্কোর, অফিসের সফটওয়্যার ব্যবহারের তথ্য, এআই টুল ব্যবহারের পরিসংখ্যান এবং কর্মীদের ডিজিটাল কার্যকলাপের বিশ্লেষণ। মামলায় বলা হয়েছে, যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে বৈধ কারণে ছুটিতে ছিলেন, তাঁদের কাজের পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কম ছিল। কিন্তু এআই সেই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে তাঁদের কর্মদক্ষতাকে কম হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ফলে তাঁরা ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে পড়েছেন।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এআই কোনো কর্মীর অনুপস্থিতির কারণ বোঝার চেষ্টা করেনি। মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসাজনিত ছুটি কিংবা পরিবারের সদস্যের দেখাশোনার জন্য অনুমোদিত ছুটি—সব ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়াকে নেতিবাচক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রম আইন, বিশেষ করে পারিবারিক ও চিকিৎসাজনিত ছুটি সংক্রান্ত আইন, প্রতিবন্ধী কর্মীদের সুরক্ষার আইন এবং গর্ভাবস্থাজনিত বৈষম্যবিরোধী আইনের লঙ্ঘন হয়েছে।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে মেটা কর্মীদের কিবোর্ডে টাইপ করার গতি, মাউসের ব্যবহার, ই-মেল কার্যকলাপ, সফটওয়্যারে লগ-ইন করার সময় এবং অভ্যন্তরীণ এআই টুল ব্যবহারের মতো নানা তথ্য সংগ্রহ করত। এই তথ্যের ভিত্তিতেই কর্মীদের একটি র্যাঙ্কিং তৈরি করা হতো। অভিযোগকারীদের মতে, এই নজরদারি ব্যবস্থার কর্মীদের পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা বা সম্মতি ছিল না। পরে কর্মীদের প্রবল আপত্তির মুখে সংস্থা এই নজরদারি কর্মসূচি স্থগিত করে বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI misuses in India: শুধু ভুয়ো ভিডিও বা গলা নকল করার মাধ্যমে নানা রাজনৈতিক ফায়দা তোলার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর সীমাবদ্ধ থাকছে না। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আর্থিক জালিয়াতির নানা ঘটনা।
এই মামলার পেছনে রয়েছে মেটার সাম্প্রতিক বড় আকারের কর্মী ছাঁটাই। ২০২৬ সালে সংস্থাটি তাদের মোট কর্মীর প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মেটা জানিয়েছিল, সংস্থাকে আরও দক্ষ ও এআই-কেন্দ্রিক করে তুলতেই এই পুনর্গঠন প্রয়োজন। কিন্তু মামলাকারীদের দাবি, সেই পুনর্গঠনের আড়ালে এআই এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে।
অন্যদিকে মেটা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থার মুখপাত্রের বক্তব্য, কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত কোনো এআই নেয়নি। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই নিয়েছেন মানুষ। তাঁদের দাবি, মামলায় আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং আদালতেই তার জবাব দেওয়া হবে।
তবে এই মামলার গুরুত্ব শুধুমাত্র মেটাকে ঘিরে নয়। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের আইনি সীমারেখা নির্ধারণে এই মামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যেই বিশ্বের বহু সংস্থা কর্মীদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়নে অ্যালগরিদম ও এআই ব্যবহার করছে।
শ্রম আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করতেই পারে, কিন্তু সেই প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত আইনসঙ্গত কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানেরই। কোনো অ্যালগরিদম ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার দায় এআইয়ের নয়, বরং যে সংস্থা সেটি ব্যবহার করছে, তারই।
মামলাকারীরা আদালতের কাছে একাধিক দাবি জানিয়েছেন। প্রথমত, ২২ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখতে আদালতের নির্দেশ চেয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি তাঁরা চাকরিতে পুনর্বহাল, বকেয়া বেতন, ক্ষতিপূরণ এবং মেটার এআই-ভিত্তিক কর্মী মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বাধীন নিরীক্ষারও দাবি করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই ব্যবস্থা কতটা পক্ষপাতদুষ্ট, তা প্রকাশ্যে আসা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলা ভবিষ্যতে কর্পোরেট জগতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যদি আদালত মনে করে এআই-নির্ভর মূল্যায়ন বৈষম্যমূলক ছিল, তাহলে বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে তাদের কর্মী মূল্যায়ন পদ্ধতি নতুন করে সাজাতে হতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বচ্ছতা, মানবিক পর্যবেক্ষণ এবং আইনি জবাবদিহির
উপর জোর বাড়তে পারে।






