মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উষ্ণ থাকে সোনাম ওয়াংচুকের বাড়ি
Sonam Wangchuk House: সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।
সোনম ওয়াংচুক—নামটা শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে যন্তর মন্তরে তাঁর অনশনের ছবি। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এবং একাধিক প্রশ্নফাঁস বিতর্কের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এক বিশাল আন্দোলনে নামে সিজেপি। অনির্দিষ্টকালের অনশনের ঘোষণা করে সোনম ওয়াংচুক এই আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যান। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার দৃশ্যমান পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তিনি থামবেন না।
টানা ২৬ দিন অনাহারে থাকার পর অসুস্থ হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান ওয়াংচুক। হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, লাদাখে নিজের বাড়িতে ফেরার আগে তিনি রাজঘাটে যাবেন মহাত্মা গান্ধীকে শ্রদ্ধা জানাতে।
সোনম ওয়াংচুক মানেই পাহাড়ঘেরা লাদাখের ছবি, বরফে ঢাকা জীবন আর নতুন এক ভাবনার আলো। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ এবং উদ্ভাবক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি যেন রূপকথার সেই মানুষটি, যিনি পাহাড়ের রুক্ষ জীবনের কঠিন সমস্যাগুলিকে বিজ্ঞানের সহজ ছোঁয়ায় অত্যন্ত সহজ করে তুলেছেন।
লাদাখের বুকে মাটির তৈরি রূপকথার বাড়ি
প্রতিবাদের এই উত্তাল দিনগুলির বাইরে সোনম ওয়াংচুকের জীবনের আরেকটা বড় দিক হলো তাঁর অসাধারণ জীবনশৈলী। লাদাখের ফিয়াং গ্রামে ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অল্টারনেটিভস, লাদাখ’ ক্যাম্পাসের কাছেই রয়েছে তাঁর একটি বিশেষ বাড়ি। এই বাড়িটি কেবল তাঁর থাকার জায়গা নয়, এটি পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের এক জলজ্যান্ত পরীক্ষাগার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Plastic Recycling: বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ব্যাগ, ফ্যাশনেবল ওয়ালেট কিংবা ঘরের সুন্দর প্ল্যান্টার! প্রথম শুনলে হয়তো একটু খটকা লাগতে পারে—‘ফেলে দেওয়া জঞ্জাল দিয়ে আবার ফ্যাশন?’ কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কণিকা আহুজা। দিল্লির বর্জ্যের পাহাড়কে তিনি রূপ দিয়েছেন এক অনন্য সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে, যার নাম ‘লিফাফা’ (Lifaffa)।
হিমালয়ের কোলে ভেসে থাকা লাদাখ মানেই দিগন্তবিস্তৃত বরফের রাজ্য, রুক্ষ পাহাড় আর চোখধাঁধানো রূপ। তবে এই নৈস্বর্গিক রূপের সঙ্গে থাকে প্রকৃতির চরম প্রতিকূলতা। শীতকালে এখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বাইরে তখন পা ফেলার উপায় থাকে না, ঘর গরম রাখতে দিনরাত কাঠ পোড়াতে হয় কিংবা বুখারি জ্বেলে বসতে হয়। কিন্তু বিখ্যাত প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও উদ্ভাবক সোনম ওয়াংচুকের এই বাসভবন বাইরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যেও ভিতরের পরিবেশ চমৎকার আরামদায়ক ও গরম রাখে। আর তাও আবার কোনো আধুনিক হিটার, এসি কিংবা কাঠ না পুড়িয়েই!
শুধু তাই নয়, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন হলো দুই তলা বিশিষ্ট এই বিশেষ বাড়িটি।
চিত্রঋণ: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলে এখন আধুনিক বাড়ি বানাতে কংক্রিট ও সিমেন্টের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু সোনম ওয়াংচুকের বাড়িতে কোথাও কোনো সিমেন্ট বা সিমেন্টের পিলার ব্যবহার করা হয়নি। পুরো বাড়িটি নিখাদ মাটির তৈরি। শত শত বছর ধরে তিব্বত, লাদাখ ও কিনৌর অঞ্চলে যে সনাতনী উপায়ে মাটির বাড়ি তৈরি হতো, তারই এক আধুনিক রূপ এটি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Eco Bloc RR Sivaram: আমরা সচরাচর যে সমস্ত কংক্রিটের ড্রেন দেখি, ইকো ব্লক কিন্তু তার চেয়ে একেবারে আলাদা। এটি তৈরি হয় মূলত ফেলে দেওয়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক দিয়ে। ফলে পরিবেশের প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যাও এতে কমে।
বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে 'র্যামড আর্থ' অর্থাৎ বিশেষভাবে কুটিয়ে শক্ত করা মাটি, স্থানীয় কাদামাটি, খড় ও কাঠের বিম। ঘরের মোটা মোটা মাটির দেওয়াল বাইরের আবহাওয়া থেকে ভিতরের তাপমাত্রাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখে। গরমকালে এই মাটির দেওয়াল ঘরকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখে, আর শীতকালে ভিতরের ওম ধরে রাখে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য নিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকেই সোনম ওয়াংচুক আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী মাটির এই মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
বাড়ির দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে প্রচুর প্লাস্টিকের বাতিল জলের বোতল সারি দিয়ে বসানো রয়েছে। লাদাখের আকাশ শীতকালে সাধারণত পরিষ্কার থাকে এবং কড়া রোদ ওঠে। সারাদিনের সেই রোদের উত্তাপ শুষে নেয় দেওয়ালের ভিতরের জলের বোতলগুলি। জল স্বাভাবিকভাবেই অনেকক্ষণ তাপ ধরে রাখতে পারে। ফলে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর যখন বাইরে তাপমাত্রা দ্রুত নামতে থাকে, তখন বোতলে জমা হওয়া সারাদিনের উত্তাপ ধীরে ধীরে ঘরের ভিতরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ফলস্বরূপ, বাইরে মাইনাস তাপমাত্রা থাকলেও ঘরের ভিতরে চমৎকার ১৯ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওম বজায় থাকে। এটিকে বলা হয় ‘প্যাসিভ সোলার হিটিং’। সোনম ওয়াংচুক নিজেই বলেন, দেওয়াল আর কাঁচ হয়তো আধুনিক, কিন্তু ভিতরের প্রযুক্তি কিন্তু একদম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী।
চিত্রঋণ: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
বাড়িটির স্থাপত্যের আরেকটি দৃশ্যমান আকর্ষণ হলো এর দক্ষিণমুখী সুবিশাল কাচের জানালা। একদিকের পুরো ফ্যাসাডটাই প্রায় কাঁচ ও কাঠের ফ্রেমে ঢাকা। ডাবল-গ্লেজড বা দ্বিগুণ কাচের এই জানালার ভিতর দিয়ে সারাদিন প্রাকৃতিক আলো আর সূর্যের উত্তাপ ঘরে প্রবেশ করে, কিন্তু ভিতরের গরম বাতাস বাইরে বের হতে পারে না। মেঘলা আবহাওয়া বা তুষারপাতের পরও ঘরের তাপমাত্রা একটা আরামদায়ক জায়গায় বজায় থাকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Rain: তিনি ডক্টর সুধাংশু কুমার ব্যানার্জি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর জেনারেল। তবে সহকর্মী আর শান্তিনিকেতনের প্রতিবেশীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন অন্য এক ভালবাসার নামে—‘মেঘ ব্যানার্জি’।
বাড়ির ভিতর পা রাখলেই বোঝা যায়, সোনম ওয়াংচুক শুধু প্রকৌশল নিয়ে ভাবেননি, ভেবেছেন মানুষের জীবনযাত্রা ও সামাজিক সম্পর্ক নিয়েও। ঘরের ইন্টেরিয়রে লাদাখী ঐতিহ্যের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। বসার ঘরে আধুনিক আরামদায়ক সোফার পাশাপাশি রয়েছে ঐতিহ্যবাহী নিচু বসার ব্যবস্থা (low seating), ভিনটেজ কাঠের আসবাব এবং একটি ভিনটেজ পিয়ানো। বেডরুমগুলিতে সুন্দর কাঠের ছাদ, বইয়ের খোলা তাক আর খোদাই করা কাঠের কাজ এক শান্ত পরিবেশ তৈরি করে।
রান্নাঘরের নকশাটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বা 'ওপেন কিচেন' স্টাইলে করা হয়েছে, যার একেবারেই সঙ্গে জোড়া রয়েছে ডাইনিং টেবিল। এই নকশার পিছনে সোনম ওয়াংচুকের একটাই উদ্দেশ্য ছিল—যিনি রান্না করছেন, তিনি যেন নিজেকে পরিবারের বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন না ভাবেন। রান্না করতে করতেই যাতে পরিবারের মানুষ ও অতিথিদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা জমিয়ে তোলা যায়, সেই পারিবারিক সংহতির কথাই ভেবেছেন তিনি।
সোনম ওয়াংচুকের এই মাটির বাড়ির প্রতিটা কোণেই লুকিয়ে রয়েছে বিশেষ কোনো ভাবনা। পাহাড়ি অঞ্চলে বাথরুমে ফ্লাশ চালানো মানেই লিটার লিটার জল নষ্ট করা। তার উপর শীতকালে জল জমে বাথরুমের পাইপ ফেটে যাওয়া লাদাখের এক নিত্যদিনের সমস্যা। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সোনম ওয়াংচুক বাথরুমে গড়ে তুলেছেন ‘বিনা জলের শৌচব্যবস্থা’ বা কম্পোস্টিং টয়লেট।
এই বাথরুমে ফ্লাশের জন্য এক ফোঁটা জলেরও দরকার হয় না। ফ্লাশের বদলে ব্যবহার করা হয় শুকনো কাঠের গুঁড়ো বা শুকনো মাটি। মানুষের বর্জ্যকে আলাদা করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে জমা করা হয় এবং কয়েক মাসের মধ্যে তা পচে প্রাকৃতিক সারে পরিণত হয়। সোনম ওয়াংচুক অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে এই ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন, কারণ এটি একদিকে যেমন জল বাঁচায়, অন্যদিকে চাষবাসেরও কাজে লাগে।
এছাড়া লাদাখ যেহেতু ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, তাই বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে সে কথা মাথায় রেখেই। ভূমিকম্পের ধাক্কায় কংক্রিটের শক্ত কাঠামো খুব দ্রুত ফাটল ধরে ভেঙে পড়তে পারে, কিন্তু মাটি ও কাঠের নমনীয়তার জন্য এই ঘর শক্তিকে নিজের মধ্যে শুষে নিতে পারে। হালকা কাঠের ছাদ ও নমনীয় কাঠামো ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়িটিকে অনেক বেশি নিরাপদ রাখে।
শুধু নিজের থাকার ঘর নয়, সমগ্র পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে ওয়াংচুক একাধিক যুগান্তকারী কাজ করেছেন। লাদাখ একটি ঠান্ডা মরুভূমি। এখানে বসন্তের শুরুতে যখন খেতের ফসলে জলের ভীষণ প্রয়োজন হয়, তখন প্রাকৃতিক হিমবাহগুলি গলে না। ওয়াংচুক শীতে বয়ে চলা উদ্বৃত্ত জলকে পাইপের সাহায্যে উঁচুতে ছড়িয়ে বরফের স্তূপ বা ‘আর্টিফিশিয়াল গ্লেসিয়ার’ বানিয়ে ফেলেন। দেখতে বুদ্ধ মন্দিরের স্তূপের মতো এই বরফের পাহাড়গুলি বসন্তের রোদে আস্তে আস্তে গলতে শুরু করে এবং চাষীদের জন্য জলের নিরবচ্ছিন্ন জোগান দেয়।
নিজের উদ্ভাবনগুলিকে তিনি কোনো পেটেন্টের ফ্রেমে আটকে রাখেননি, বরং উন্মুক্ত করে দিয়েছেন যাতে বিশ্বের যেকোনো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের জীবনযাত্রা আরও একটু সহনীয় করে তুলতে পারে।






