চশমা যখন টেকসঙ্গী, কীভাবে কাজ করে এআই গ্লাস?

Meta AI Glasses: চশমা ব্যক্তিগত এআই সহকারী। চোখের ইশারা ও মৌখিক নির্দেশে কল, ছবি তোলা, ভিডিও রেকর্ডিং থেকে গুগল সার্চ—সবই যখন সম্ভব, তখন এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে? আর ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও এআই-নির্ভর এই চশমা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত রাখবে?

Shamim Haque Mondal
৪ মিনিট
চশমা যখন টেকসঙ্গী, কীভাবে কাজ করে এআই গ্লাস?

চশমা নিয়ে আমাদের শখের শেষ নেই; কেউ মোটা ফ্রেমের চশমা পরতে পছন্দ করেন, কেউ বা হালকা, কেউ তো আবার চশমার ভারের কারণে কনট্যাক্ট লেন্স পরেন। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিতে দিতে বেড়েছে চশমার ধরন। কিন্তু সেই চশমাই যে একদিন আমার আপনার টেকসঙ্গী হয়ে উঠবে তা কে জানত! হ্যাঁ ঠিক তাই-আপনার চোখের ইশারায় বা মৌখিক নির্দেশে সে কাউকে কল করা, বা ভিডিও রেকর্ডিং করা বা গুগল সার্চের মতো কাজ এক নিমেষেই করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংস্থা, মেটা এবং রে ব্যান (Ray-Ban)-এর মতো ফ্রেম প্রস্তুতকারক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ‘মেটা এ আই গ্লাস’ আলোক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। কী এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর চশমা? কীভাবে কাজ করে এটি?

আমরা সাধারণত দু'টি কারণে চশমা ব্যবহার করি—চোখের দৃষ্টিজনিত সমস্যা হলে, অথবা প্রখর রোদে বাইরে বেরোনোর সময়। প্রথম ক্ষেত্রে আলোর প্রতিসরণ জনিত ত্রুটি দূর করার চেষ্টা করা হয়, আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব আটকানোর চেষ্টা করা হয়। নতুন এই মেটা এআই গ্লাসের চশমা তৈরির সময় মাত্র ৪-৫ মিলিমিটার পুরু চশমার ফ্রেমে কম্পিউটিং ক্ষমতা, আলোক সেন্সর ও ব্যাটারি জুড়ে দেওয়া হয়। এতে উন্নত ‘মাইক্রো-ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমস’, ‘এমবেডেড কম্পিউটার ভিশন’-এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় ক্লাউড প্রসেসিংয়ের সুবিধা।

চশমার ফ্রেমের কোণায় বসানো রয়েছে, ১২ মেগাপিক্সেল ‘আল্ট্রা-ওয়াইড’ ক্যামেরা লেন্স; এটি আলোকরশ্মিকে তড়িৎ সিগন্যালে রূপান্তরিত করে ফলে হাতের সাহায্য ছাড়াই মুহূর্তে অত্যন্ত স্পষ্ট ছবি ওঠে। লেন্সটির ফিল্ড-অফ-ভিউ আমাদের স্বাভাবিক দৃষ্টিসীমার সমতুল্য হওয়ায়, এটি কোনোরকম ঝামেলা ছাড়াই চারপাশের জগৎকে ফ্রেমবন্দি করতে পারে। অত্যাধুনিক এই চশমার প্রাণ ভোমরা হচ্ছে এর প্রসেসর; এতে রয়েছে কোয়ালকমের ‘স্ন্যাপড্রাগন এআর১ জেন ১’ প্রসেসর। নিউরাল প্রসেসিং ইউনিটের সুবিধা থাকায় এটি অত্যন্ত কম শক্তি খরচ করে অতিদ্রুত অডিও-ভিজ্যুয়াল ডেটা ফিল্টার করে প্রসেসিং করতে পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কীভাবে গাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে AI ব্যবহার করল ইজরায়েল?

AI in Gaza War: ইজরায়েলি বাহিনীকে 'টার্গেট' নির্ধারণ করতে গাজা জুড়ে অজস্র ফিলিস্তিনিদের মুখ স্ক্যান করতে গুগল ফটো ফেসিয়াল রিকগনিশন পরিষেবা ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে গুগল।

এরপর আসরে নামে এ আই; মেটার নিজস্ব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এবং 'কম্পিউটার ভিশন' অ্যালগরিদমের দৌলতে ব্যবহারকারী 'Hey Meta' বলার সঙ্গে সঙ্গেই চশমা সামনের ব্যক্তির ছবি তুলে পাঠায় ক্লাউড সার্ভারে। এই পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থাটিই চলছে একটা এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্ক সিস্টেমের মাধ্যমে; সেখানে রয়েছে অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক ফেসিয়াল ম্যাপিং এর সুবিধা। এর সাহায্যে মানুষের মুখমণ্ডলের বিভিন্ন নোডাল বিন্দু, অর্থাৎ দুই চোখের মাঝের দূরত্ব, নাকের হাড়ের থেকে দূরত্ব-সহ বিভিন্ন জ্যামিতিক ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা হয়, সামনের ব্যক্তিটির মুখবায়ব পরিচিত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে মিলছে কি না। আপনার পরিচিতদের তথ্য তো ইতোমধ্যে ক্লাউডে সংরক্ষিত আছে।

এর সবথেকে মজার বিষয় 'ওপেন-ইয়ার' স্পিকার-কানে কোনো হেডফোন না গুঁজেই গান শোনা বা কথা বলার সুবিধা রয়েছে। এখানে শব্দতরঙ্গ এমনভাবে উৎপন্ন হয় যা সরাসরি ব্যবহারকারীর কানে পৌঁছায়, কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কেউ তা শুনতে পান না। সে না হয় হলো, কিন্তু চারপাশের এত আওয়াজের মধ্যে ঠিক আপনার প্রয়োজনীয় কথাটি শুনবেন কীভাবে? সেই গুরু দায়িত্ব সামলায় এতে থাকা ৫-মাইক্রোফোনের ‘বিমফর্মিং’ অডিও ফিল্টার; এটি চারপাশের শব্দ দূর করে কেবল বক্তার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে। সোজা কথায়, একই অঙ্গে কত রূপ! এহেন গুণধর চশমার ব্যাটারি ও ঈর্ষণীয় দ্রুততার সঙ্গে রিচার্জ করা যায়।

কিন্ত এতসব বাহারি সুবিধার রং মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যাবে, যদি আমার আপনার গোপনীয়তা বজায় না থাকে। মানে এই ধরুন আপনি ব্যাঙ্কে কিছু লেনদেন করছেন, আপনার পিছনে থাকা ব্যক্তির চোখের এআই চশমায় ধরা পড়ল কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তিনি ব্ল্যাকমেল করতে পারেন ভবিষ্যতে। কী অবাক হচ্ছেন? এরকম ঘটনা আমাদের খাস কলকাতায়ই ঘটেছে; গত ১১ জুন রাতে শহর কলকাতার এক নামী কলেজের অধ্যাপিকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন; এক ব্যক্তি তাঁর পথ আটকে কথা বলার চেষ্টা করে। ভদ্রমহিলা বিশেষ পাত্তা দেননি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

পরদিন তিনি জানতে পারেন, পুরো ঘটনাটির ভিডিও এআই চশমায় ধারণ করে বিকৃতভাবে কাটছাঁট করে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হয়েছে। লোকটির হাতে কোনো ক্যামেরা না থাকায়, অধ্যাপিকা বুঝতে পারেননি যে তাঁর হাঁটার ভিডিও রেকর্ড করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে পথ আটকানো, গোপনে নজরদারি ও ‘স্টকিং’-এর ধারায় এফআইআর নথিভুক্ত করে এবং গ্রেফতার করে। পুলিশ মহলের অনুমান এটিই দেশের প্রথম এআই স্মার্ট গ্লাস অপরাধ সংক্রান্ত মামলা।

যদিও ইতোপূর্বে দিল্লিতে এমন ঘটনা লক্ষ্য করা গিয়েছে; এই বছর মার্চ মাসে রাজধানীতে ‘ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অফ রাইটস) অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’-এর বিরুদ্ধে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালীন ২৯ বছর বয়সি এক তরুণের ভিডিও, তাঁর অজান্তে এআই চশমার মাধ্যমে তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি, সম্প্রতি দিল্লির যন্তরমন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র আন্দোলন চলাকালীন দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিতকরণের উদ্দেশ্যে এই স্মার্ট চশমা ব্যবহার করার অভিযোগ সামনে আসে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় আমাদের জীবনযাত্রায় গতি এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেজন্যে যদি গোপন নজরদারির কবলে পড়তে হয় আমজনতাকে, অথবা ক্রমাগত সাইবার বুলিং ও মানসিকভাবে বিপর্যয়ের শিকার হতে হয়, তা দুর্ভাগ্যজনক। যে চশমা আবাল, বৃদ্ধ মানুষজনের পথ চলার অবলম্বন, তাকে যদি ব্যবহার করা হয় ব্ল্যাকমেলের উপকরণ হিসেবে, তবে তা রীতিমত চিন্তার বিষয়। তাই প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপযুক্ত আইনি কাঠামো এবং ডেটা সুরক্ষার কঠোর নিয়মকানুন প্রণয়ন না করতে পারলে আমাদের বিড়ম্বনা বাড়বে বৈ কমবে না।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বাম বসন্ত ফিরবে বার্লিনে? শতাব্দীর সংগ্রাম শেষে আবার নতুন ভোর

Left-Wing Resurgence in Hitler’s Berlin: হিটলারের বার্লিনে ফিরছে বামপন্থা। তরুণরা সংক্রমিত। ইতিহাসের এই বিদ্রূপ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন দুঃস্বপ্নের নগরীতে।

টাকার বিনিময়ে বিজেপি-র প্রচার করেছেন সায়ক! আর আইনি জালে জড়ালেন অলিপাবের নিরীহ কর্মী

Sayak Chakraborty Olypub controversy: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের মোট খরচ ছিল ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা। সেই প্রচারের একটি অংশ ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

SRFTI: কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে?

SRFTI Clash: SRFTI-তে ডানপন্থী সংগঠনের অনুষ্ঠান ঘিরে কেন আপত্তি জানালেন পড়ুয়ারা? বক্তৃতায় কী বলা হয়েছিল, যা নিয়ে তৈরি হয় উত্তেজনা? কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে? পড়ুয়া ও আয়োজকদের পাল্টা অভিযোগের মধ্যে আসল ঘটনা কী?

যে নির্বাচন কমিশনার ভোট চুরি আটকেছিলেন

Election reforms of T. N. Seshan: ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন কমিশনারের চেয়ারে বসেছিলেন যে ব্যক্তি, সেই টি. এন. শেষন বলেছিলেন, 'আমাকে এই পদে বসাবেন না, আমি আপনাদের অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াব।'

ছদ্ম-বিরোধী তৈরিই কি তবে ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন কৌশল?

Indian opposition politics: বিরোধীদের সরাসরি নিষিদ্ধ না করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার চাপ, আইনি ফাঁকফোকর এবং সুপরিকল্পিত দল ভাঙার মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে অনুগত ‘ছদ্ম-বিরোধী’।

EXCLUSIVE: কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে ভোট না-করানো তৃণমূলের বড় ভুল, নিজেদের ভুল নিয়েও আলোচনার দরকার ছিল: কুণাল

Kunal Ghosh on Mamata Banerjee: ইনস্ক্রিপ্টে ‘অনিন্দ্য এবং’ পডকাস্টে তিনি একদিকে যেমন দাবি করেছেন মমতাকে ভয় পেয়েই তাঁকে বারবার নিশানা করা হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে দলের ভুলত্রুটি স্বীকার করে আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

EXCLUSIVE: শেষদিকে দল পরিচালনায় গ্যাপ ছিল, অভিষেকের অফিসও ঠিকঠাক ম্যানেজ করা হয়নি: কুণাল

Kunal Ghosh on Abhishek Banerjee: ইন্সক্রিপ্টের ‘অনিন্দ্য এবং’ পডকাস্টে অভিষেক প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কুণাল জানিয়েছেন, শেষ পর্যায়ের দল পরিচালনায় আরও ‘সতর্কতা’ প্রয়োজন ছিল। তাঁর দাবি, অভিষেকের অফিসও সব সময় ঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি।