শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!
Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।
ভোরের আবছা আলোয় কেরলের এক ঘন জঙ্গলের ভিতর গোপন গুহা। গুহার দেওয়ালে জ্বলছে মশাল, আর পাথুরে মেঝেতে শব্দহীন গতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কয়েকজন তরুণ। তাঁদের হাতে বিপজ্জনক, নমনীয় স্টিলের তলোয়ার ‘উরুমি’। বাইরে তখন ব্রিটিশ বাহিনীর কড়া পাহারা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ সরকার কালারিপায়াট্টু অনুশীলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল; আদেশ ছিল, এই সমরকলা শিখলেই চরম শাস্তি। কিন্তু ভারতের প্রাচীনতম যুদ্ধবিদ্যাকে বাঁচিয়ে রাখতে কেরলে গুরুরা রাতের অন্ধকারে এভাবেই শিষ্যদের তৈরি করতেন। ব্রিটিশদের আধুনিক বন্দুকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কেবল লাঠি, তলোয়ার আর খালি হাতের অদ্ভুত কৌশলে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন এই কালারি যোদ্ধারা।
ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।
পুরাণে দেখা যায়, এই যুদ্ধবিদ্যার আদি প্রবর্তক মহাদেব। শিবের প্রলয়ঙ্করী তাণ্ডব নৃত্যের ছন্দের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল আক্রমণ, প্রতিরক্ষা ও শত্রুকে পরাস্ত করার মূল বিজ্ঞান। শিব এই গোপন বিদ্যা ও শস্ত্রকৌশল দান করেন তাঁর পরম শিষ্য মহর্ষি পরশুরামকে।
ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে লিখিত আছে, একদা কার্তবীর্য অর্জুন বা সহস্রার্জুন কর্তৃক পিতা জমদগ্নির হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং অহংকারী অত্যাচারীদের শাসনের জন্য পরশুরাম একা একাই ২১ বার পৃথিবীকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাস্ত করেছিলেন। এই পরম শক্তি ও অপরাজেয় রণকৌশলের নেপথ্যে ছিল শিবের কাছ থেকে পাওয়া সেই বিশেষ জ্ঞান।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।
কথিত আছে, সমুদ্রের গ্রাস থেকে নতুন স্থলভাগ উদ্ধার করার জন্য পরশুরাম কন্যাকুমারীর দিকে তাঁর কুঠার নিক্ষেপ করেছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সমুদ্র পিছিয়ে যায় এবং জন্ম নেয় কেরল। এই নতুন ভূখণ্ড ও অধিবাসীদের সুরক্ষার জন্য তিনি ১০৮টি কালারি বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন। পরশুরাম তাঁর ২১ জন বিশ্বস্ত শিষ্যকে এই বিদ্যায় দীক্ষিত করেছিলেন। পরশুরামের হাত ধরেই কালারিপায়াট্টুর উত্তরী শৈলী বা ‘বদ্দক্কন’ কালারির জন্ম হয়, যা মূলত তলোয়ার, বর্শা ও উরুমির মতো বিপজ্জনক অস্ত্রের ব্যবহারের উপর জোর দেয়।
ঠিক একই পৌরাণিক সময়ে দক্ষিণ ভারতে আগমন ঘটে সপ্তর্ষির অন্যতম ঋষি অগস্ত্যের। অগস্ত্য মুনি এই বিদ্যাকে এক নতুন মাত্রা দেন। তিনি অস্ত্র ব্যবহারের চেয়ে শরীরের নমনীয়তা এবং খালি হাতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উপর বেশি জোর দেন, যা ‘তেক্কন’ বা দক্ষিণী শৈলী নামে পরিচিত।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণুপুরাণেও এই যুদ্ধরীতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে। দ্বাপর যুগে মল্লযুদ্ধ এবং রণকৌশলে পরম পারদর্শী ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম। ভাগবত পুরাণে কংসের আয়োজিত মল্লযুদ্ধের এক রোমাঞ্চকর বিবরণ রয়েছে। কংস কৃষ্ণ ও বলরামকে হত্যা করার জন্য চাণূর ও মুষ্টিক নামের দুই অজেয়, অতিকায় মল্লযোদ্ধা এবং কুবলয়াপীড় নামের এক উন্মত্ত হাতিকে প্রস্তুত রেখেছিল। কিন্তু বালকমূর্তি কৃষ্ণ ও বলরাম কোনো অস্ত্র ছাড়াই কেবল শরীরের গতি, নমনীয়তা এবং শক্তিবিন্দু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেই বিশাল হাতি ও মল্লযোদ্ধাদের ধূলিসাৎ করে দেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রজভূমির বনে কৃষ্ণ যে যুদ্ধকৌশল চর্চা করেছিলেন, তার উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে গড়ে উঠেছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে মারাত্মক ও পরাক্রমশালী ‘নারায়ণী সেনা’।
এই প্রাচীন মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত কঠোর ও সুশৃঙ্খল। একজন শিক্ষার্থীকে গুরুর আশ্রমে বছরের পর বছর সাধনা করে একাধিক ধাপে এগিয়ে যেতে হয়। শুরুতেই আসে শরীরের নমনীয়তা ও গতি বৃদ্ধির জন্য কঠিন সব ব্যায়াম। এরপর শেখানো হয় কাঠের তৈরি বিভিন্ন লাঠির ব্যবহার। শরীর যখন পরিপক্ব হয়, তখন হাতে তুলে দেওয়া হয় ধাতব ও বিপজ্জনক সব অস্ত্র। আর সবশেষে আসে কোনো অস্ত্র ছাড়া শুধু খালি হাতে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার শিল্প।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।
মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলে কালারিপায়াট্টু
কালারিপায়াট্টুর সবচেয়ে বিপজ্জনক ও রোমাঞ্চকর অস্ত্র হলো 'উরুমি'। এটি এক ধরনের অতি নমনীয়, ফিতার মতো স্টিলের তলোয়ার, যা অলক্ষ্যে কোমরবন্ধের মতো পেঁচিয়ে রাখা যায়। উরুমি ঘোরানোর সময় সামান্যতম ভুল হলেও যোদ্ধা নিজের শরীরের চরম ক্ষতি করে ফেলতে পারেন। বহু বছরের তপস্যা ও গুরুর চরম কৃপা ছাড়া এই অস্ত্র ছোঁয়ার অনুমতি পর্যন্ত মেলে না। এর পাশাপাশি বর্শা, ডাগার ও ভারী গদার ব্যবহারও হয় এই শিল্পে।
কালারিপায়াট্টুর সবচেয়ে রহস্যময় ও বৈজ্ঞানিক দিক হলো ‘মর্মবিদ্যা’। আয়ুর্বেদ ও প্রাচীন ধনুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী মানুষের শরীরে ১০৭টি অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থান বা ‘মর্ম’ রয়েছে। পুরাণ মতে, একজন দক্ষ কালারি যোদ্ধা চিকিৎসকের মতোই মানবশরীরের গঠন জানেন। তিনি জানেন, শরীরের কোন গোপন বিন্দুতে সামান্য স্পর্শ বা আঘাত করলে প্রতিপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে অসাড়, পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা অচেতন হয়ে পড়বে। প্রশিক্ষণের সময় আঘাত লাগলে বা পেশী ছিঁড়ে গেলে গুরুরা বিশেষ আয়ুর্বেদিক তেল ও জড়িবুটি দিয়ে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করে শিষ্যদের সুস্থ করে তোলেন। এমনকী প্রাণীদের বিভিন্ন ভঙ্গি অনুকরণ করে যে আসনগুলি করা হয়, তা মানুষের শরীরের বাত, পিত্ত ও কফের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই কালারিপায়াট্টু কেবল রক্তপাতের বিদ্যা নয়, এটি জীবনের রক্ষা ও আরোগ্যেরও এক পরম সাধনা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Yubi Lakpi Manipur: ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য মণিপুরে গেলে ঠিক এমন এক রোমাঞ্চকর খেলার দেখা মিলবে। স্থানীয় মানুষ একে ভালোবেসে ডাকেন 'ইয়ুবি লাকপি'। মেইতেই ভাষায় ‘ইয়ুবি’ মানে নারকেল, আর ‘লাকপি’ শব্দের অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া। ফুটবল বা রাগবির আন্তর্জাতিক গ্ল্যামার হয়তো এর নেই, কিন্তু এর প্রতিটা মিনিটে যে আদিম উত্তেজনা লুকিয়ে আছে, তা যেকোনো আধুনিক খেলাকে টেক্কা দিতে পারে।
কেরলের লোকসংগীত বা ‘ভাদাক্কান পাত্তুকাল’-এ উণ্ণিয়ার্চা নামের এক কিংবদন্তি নারী যোদ্ধার উল্লেখ পাওয়া যায়। একবার একদল সশস্ত্র ডাকাত গ্রাম আক্রমণ করলে উণ্ণিয়ার্চা একাই তাঁর শাড়ির আঁচলকে বিশেষ কৌশলে পেঁচিয়ে এবং হাতে থাকা ছোট অস্ত্র দিয়ে পুরো ডাকাত দলকে পরাস্ত করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে, কালারিপায়াট্টু শুধু পুরুষদের যুদ্ধ কৌশল ছিল না; প্রাচীন কাল থেকেই নারীদের আত্মরক্ষা ও বীরত্বের প্রতীক ছিল এই কলা।
নারীদের আত্মরক্ষা ও বীরত্বের প্রতীক ছিল কালারিপায়াট্টু
কথিত আছে, পরবর্তীকালে কেরল থেকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বোধিধর্মন যখন চিনে পাড়ি দেন, তখন তিনি কালারিপায়াট্টুর এই শারীরিক ব্যায়াম, ধ্যান ও আত্মরক্ষার কৌশলগুলি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রাচীন শাওলিন মঠের সন্ন্যাসীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে তিনি এই প্রশিক্ষণ দেন, যা পরবর্তীতে বিকাশ লাভ করে বিখ্যাত ‘কুংফু’ নামে। তাই বহু গবেষক কালারিপায়াট্টুকে সব ধরনের মার্শাল আর্টের জননী বলে মনে করেন।
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতে ইংরেজ শাসন কায়েম হলে কালারিপায়াট্টুর উপর বিপদ নেমে আসে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ করতে পারে, এই ভয়ে ব্রিটিশ সরকার কালারিপায়াট্টু সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলি ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়, গুরুদের উপর চলে অকথ্য নির্যাতন। কিন্তু বিশ্বস্ত গুরুরা হাল ছাড়েননি। গভীর জঙ্গল ও গোপন গুহায় মশাল জ্বালিয়ে রাতের অন্ধকারে তাঁরা শিষ্যদের এই বিদ্যা শিখিয়ে গিয়েছেন, রক্ষা করেছেন হাজার বছরের ঐতিহ্যকে।
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশপ্রেমিকদের হাত ধরে কালারিপায়াট্টু আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। আজ এটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
এখন কালারিপায়াট্টু কেবল যুদ্ধকৌশলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ফিটনেস, মানসিক একাগ্রতা ও আত্মরক্ষার এক অনন্য পথ হয়ে উঠেছে। রুপোলি পর্দায় দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা থেকে শুরু করে বলিউডের বড় বাজেটের ছবিতে এই প্রাচীন বিদ্যার দুর্দান্ত সব কৌশল চোখ জুড়িয়ে দেয়। প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে অজস্র মানুষ ছুটে আসেন কেরলে, কালারিপায়াট্টু নিয়ে জানতে, কালারিপায়াট্টু শিখতে।








