প্রেস কার্ড গলায়, তবু আটক! দিল্লিতে SIR-বিরোধী আন্দোলন কভার করতে গিয়ে পুলিশের জালে সাংবাদিকরা
Journalists detained in Delhi: নিউজলন্ড্রির বিবৃতি অনুযায়ী, তাঁদের তিন রিপোর্টার অনমোল প্রীতম, অশ্বিনী কুমার সিং এবং আস্থা সব্যসাচী ও তাঁদের এক ইন্টার্নের অফিসিয়াল ফোনগুলি পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়। সাংবাদিকরা যখন নিজেদের গণমাধ্যমের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন, তখন পুলিশ সরাসরি বলে ওঠে— “এখানে কোনো মিডিয়া নেই!” (কোই মিডিয়া নেহি হ্যায়)
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিতর্কিত 'স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন' (SIR) বাতিলের দাবিতে রাজধানী দিল্লিতে ডাকা গণ-প্রতিবাদ দমাতে নেমেছে দিল্লি পুলিশ। আর এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১০ অক্টোবর যে নজিরবিহীন দমনপীড়ন চালানো হয়েছে, তার শিকার হয়েছে সংবাদমাধ্যমও। হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসংখ্য স্বাধীন সাংবাদিক ও মূলধারার গণমাধ্যমের রিপোর্টারদেরও নির্বিচারে আটক করা হয়েছে।
পুলিশের তরফ থেকে আগে থেকেই নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল, মাঠে থাকা সাংবাদিকদের তাঁদের প্রেস কার্ড স্পষ্টভাবে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই কার্ডই যেন সাংবাদিকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।
দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক সাংবাদিককে আটকের খবর সামনে আসতে থাকে। দ্য ওয়্যার-এর সাংবাদিক জাহ্নবী সেন, শ্রাবন্তী দাশগুপ্ত এবং অন্তরা বড়ুয়া জানিয়েছেন, পুলিশ কোনো নিয়ম বা প্রেস কার্ডের তোয়াক্কা না করেই লোকজনকে জোর করে বাসে তুলছিল। 'দ্য কুইন্ট'-এর সাংবাদিক সার্থক জয়সওয়াল প্রেস কার্ড দেখানোর পরেও তাঁকে ডিটেনশন বাসে তুলে নেওয়া হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Delhi’s October 10 protest: যন্তর মন্তর ও কনট প্লেসের আশপাশ থেকে আন্দোলনকারীদের আটক করা হয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আটক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫০০। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিজ্ঞতা হয়েছে নিউজলন্ড্রি (Newslaundry)-র তিন রিপোর্টার অনমোল প্রীতম, অশ্বিনী কুমার সিং এবং আস্থা সব্যসাচী ও তাঁদের এক ইন্টার্নের। সংবাদমাধ্যমটির বিবৃতি অনুযায়ী, তাঁদের অফিসিয়াল ফোনগুলি পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়। সাংবাদিকরা যখন নিজেদের গণমাধ্যমের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন, তখন পুলিশ সরাসরি বলে ওঠে— “এখানে কোনো মিডিয়া নেই!” (কোই মিডিয়া নেহি হ্যায়)
আস্থা সব্যসাচী টুইট করে জানান যে, তাঁদের শুধু আটকই করা হয়নি, বরং ফোন কেড়ে নেওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ধস্তাধস্তিও করা হয়েছে। একইভাবে স্ক্রোল-এর রিপোর্টার আয়ুষ তিওয়ারি এবং রাজনৈতিক সম্পাদক শোয়েব দানিয়াল, নবভারত টাইমস-এর ঋত্বিক জোশী ও রাহুল চরস, এবং রয়টার্সের সাংবাদিক সৌরভ শর্মাকেও আটক করা হয়। অনেক সাংবাদিককে আবার পুলিশের বাস থেকে আটক সহকর্মীদের রেকর্ড বা কভার করার সময়ও গ্রেফতার করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Sonam Wangchuk: সিজেপি আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ সোনম ওয়াংচুক কোথায়? দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে তাঁকে দেখা গেল না কেন?
প্রতিবাদের ঠিক কয়েক দিন আগেই দিল্লি পুলিশ সাংবাদিকদের জন্য একটি বিতর্কিত নির্দেশিকা জারি করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল— সাংবাদিকদের প্রেস কার্ড স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান রাখতে হবে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত ডিসিপি মনজিৎ শিওরান মন্তব্য করেছিলেন, সাংবাদিকরা তাঁদের ভূমিকা পালন করবেন ঠিকই, তবে যেন প্রতিবাদে জড়িয়ে না পড়েন।
কিন্তু ১০ অক্টোবরের বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। গলায় ঝুলন্ত প্রেস কার্ড এবং বারবার পরিচয় দেওয়ার পরেও পুলিশ সাংবাদিকদের বাসে তুলেছে, ডিটেনশন সেন্টারে (যেমন ছত্রশাল স্টেডিয়াম) নিয়ে গিয়েছে এবং তাঁদের সরঞ্জাম কেড়ে নিয়েছে। এমনকী কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ বাসে আগুন লেগে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় সাংবাদিকরা রক্ষা পান— এমন রোমহর্ষক তথ্যও উঠে এসেছে।
এই বিশাল আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP) এবং বিভিন্ন বামপন্থী, ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন। তাঁদের মূল দাবি ছিল— প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-এর পদত্যাগ এবং 'স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন' (SIR) বাতিল।
অভিযোগ উঠেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটির মতো খসড়া নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে বৈধ ভোটাররা (বিশেষ করে তরুণ সমাজ ও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়) ভোটাধিকার হারাচ্ছেন এবং শাসক দল সুবিধা পাচ্ছে। এমনকী অন্য নির্বাচন কমিশনারদের আপত্তি সত্ত্বেও এই প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে বলে গণমাধ্যমের তদন্তে উঠে এসেছে।
এই বিক্ষোভ দমাতে দিল্লি পুলিশ রাজধানীতে কার্যত অঘোষিত কড়াকড়ি জারি করেছিল। ৪৫টির মতো মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়, ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করা হয় এবং রাতারাতি ও দিনের আলোয় অভিযান চালিয়ে ১,০০০ থেকে ৪,,৮০০ পর্যন্ত মানুষকে আটক করা হয়। অরবিন্দ কেজরিওয়াল একে "জরুরি অবস্থার চেয়েও খারাপ" এবং রাহুল গান্ধী "একনায়কতন্ত্র" বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন।
সাংবাদিকদের উপর এই হামলা ও আটকের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অধিকার রক্ষা সংস্থা 'কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস' (CPJ) এবং ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্মগুলির যৌথ সংগঠন 'ডিজিপাব' (Digipub)।
CPJ স্পষ্ট ভাষায় দাবি জানিয়েছে, সব আটক সাংবাদিককে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। কেড়ে নেওয়া সমস্ত গ্যাজেট ও সরঞ্জাম ফেরত দিতে হবে। এবং সাংবাদিকদের উপর শারীরিক নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।







