জ্ঞানেশ বিতর্ক: সিআইএ থেকে জর্জ সোরোস, বিজেপির ন্যারেটিভ কাজ করছে না?

The Narrative structure of BJP Breaks: ২০২৬-এর অক্টোবরে, জ্ঞানেশ কুমার-বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ভারত। ১৩ কোটি জনতার ভোটাধিকার হরণের অভিযোগে সরব বিরোধীরা। জবাবে বিজেপির পাল্টা ন্যারেটিভে কখনও উঠে আসছেন দুবাইয়ের পাইলট, ইলন মাস্কের USAID দাবি, জর্জ সোরোস, অথবা ‘বিদেশি ফান্ডিং’ এর পুরনো গল্প। কিন্তু, একথা প্রমানিত সত্য, USAID-র ২১ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে গিয়েছিল, আর এবার ভোটাধিকারের প্রশ্নে বিজেপির ন্যারেটিভ কন্ট্রোল কাজ করছে না।

inscript
৫ মিনিট
জ্ঞানেশ বিতর্ক: সিআইএ থেকে জর্জ সোরোস, বিজেপির ন্যারেটিভ কাজ করছে না?

২০২৬-এর অক্টোবরে ভারতের রাজনীতি যখন ‘জ্ঞানেশ কুমার, ইটস ডান ব্রো’ স্লোগানে উত্তাল, তখনই প্রথমবারের জন্য স্পষ্ট হলো, মোদী সরকারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ‘ন্যারেটিভ কন্ট্রোল’ এবার আর কাজ করছে না। নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এসআইআর ইস্যুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধীরা সরাসরি ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলছে। জবাবে বিজেপি পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, কখনও দুবাইয়ের পাইলট, ইলন মাস্ক, জর্জ সোরোস, ‘বিদেশি ফান্ডিং’ এসবের ধুয়ো তুলে, কিন্তু সব মিলিয়ে এবার আর জনমত তাঁদের কথায় পরিচালিত হচ্ছে না।

ফ্লাইদুবাইয়ের পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের বীরত্বের ঘটনাকে কেন্দ্র করে, বিজেপি রাহুল গান্ধীর ‘নীরবতা’ নিয়ে সরব হয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বন্দি সঞ্জয় কুমার বলেছেন,

রাহুলের কাছে সব কিছুর জন্য সময় আছে, কিন্তু ভারতীয় নায়কের সাহসকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় নেই?

বিজেপির অভিযোগ, ‘তোষণের রাজনীতি’ ও ‘ভোট ব্যাংক’ রাজনীতির কারণেই কংগ্রেস এই ঘটনার প্রশংসা করছে না। কংগ্রেস পাল্টা অভিযোগ করেছে, বিজেপি এই ঘটনাকে ‘ইভেন্ট’ বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাইছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিশ্বমঞ্চ যেভাবে দেখছে ভারতের নির্বাচন কমিশনারকে

Global Spotlight on Gyanesh Kumar: ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে, জেন-জি আন্দোলন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে কভার হয়েছে। বিবিসি, রয়টার্স, গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, ডিডাব্লিউ, এপি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, আরএফআই, ফ্রান্স ২৪, ডন, সবাই জানিয়েছে, এসআইআরে ১৩ কোটি নাম বাদের কথা, ভারতের মুসলিম নাগরিকদের এসআইআরের মাধ্যমে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর কথা, রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী সাংসদরা বারবার আটকের কথা।

কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ যদিও বলেছেন,

ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের সাহস, চিন্তাভাবনা এবং দৃঢ় পদক্ষেপ চিরকাল প্রেরণাদায়ী হয়ে থাকবে। গোটা দেশ তাঁর কাজে বিস্মিত।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন DOGE দাবি করে, USAID ভারতের ‘ভোটার টার্নআউট’-এর জন্য ২১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছিল। বিজেপি এই দাবিকে হাতিয়ার করে বিরোধীদের ‘বিদেশি চক্রান্তের’ সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পরে মার্কিন দূতাবাস স্পষ্ট করে দেয়, এই অর্থ ভারতকে দেওয়া হয়নি; বরং তা বাংলাদেশে গিয়েছিল।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তে দেখা যায়, ২১ মিলিয়ন ডলারের অনুদানটি ২০২২ সালে বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত হয়েছিল। ফলে বিজেপির সেই ন্যারেটিভটিও, ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। এমনকি, ককরোচ জনতা পার্টির প্রথম দফার আন্দোলনে বিদেশী অর্থের আগমনের দাবিকে নস্যাৎ করেছে, খোদ ভারত সরকারের বিদেশমন্ত্রক।

বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে জর্জ সোরোসকে ‘ভারতবিরোধী’ চক্রান্তের কেন্দ্রে রেখেছে। সোরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনকে বিরোধী দল, এনজিও, এমনকি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ তুলেছে। কংগ্রেস পাল্টা অভিযোগ করে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. শমিকা রবি ২০০৮ সালে সোরসের অনুদান পেয়েছিলেন। সরাসরি কোনো প্রমাণ ছাড়াই এই ধরনের অভিযোগ শুধুমাত্র রাজনৈতিক বয়ান হয়ে থেকে গিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই সমস্ত ন্যারেটিভ সত্ত্বেও কেন বিজেপি আন্দোলনের ঢেউ থামাতে পারছে না? প্রথমত, ২০২৬-এর আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ভোটাধিকার’—যা ভারতের সংবিধানের মূল স্তম্ভ। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দুই সহকর্মীর আপত্তি সত্ত্বেও এসআইআর চালিয়ে ১৩ কোটি মানুষের ভোটাধিকার হরণের পথ তৈরি করছেন। দ্বিতীয়ত, এবারের আন্দোলন কোনো দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র মতো তরুণ সংগঠন, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, অভিনেতা প্রকাশ রাজ সবাই রাস্তায় নেমেছেন। তৃতীয়ত, বিজেপির ‘দুবাই পাইলট’ বা ‘সোরোস’ ন্যারেটিভ এখন আর, আন্দোলনের মূল ইস্যুকে ঢেকে রাখতে পারছে না।

বিজেপি নেতারাও স্বীকার করছেন যে ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’-এ দল পিছিয়ে পড়ছে। দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১২ বছর ধরে জনমত নিয়ন্ত্রণ করে আসা বিজেপির ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ এখন আলগা হয়ে পড়ছে। দ্য ওয়্যার-এর মতে, ‘ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণে আসক্ত’ এই সরকারের জন্য, শেষ চার সপ্তাহ ‘বিপর্যয়কর’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মোদী আমলে আন্দোলন মানেই ছিল একটি পাল্টা ন্যারেটিভ, ‘বিদেশি ফান্ডিং’, ‘দেশ টুকরো করার চক্রান্ত’, ‘দেশবিরোধী’ তকমা। কিন্তু ২০২৬ সালের, এই জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী আন্দোলনের সামনে সেই অস্ত্রগুলো আর তীক্ষ্ণ নয়। যত নিন্দাই হোক না কেন, যেভাবেই অপসারণ করা হোক না কেন, মানতে হবে ন্যারেটিভ ছড়ানোর খেলায় অতি দক্ষ ছিলেন বিজেপির আইটি সেলের প্রাক্তন বা সাবেক প্রধান অমিত মালব্য। তাঁর সরে যাওয়াটা বিজেপির জন্য যে ড্যামেজ তৈরি করেছে, তা বোঝা যাচ্ছে এই যন্তর মন্তর বিক্ষোভে বিজেপির রাশ আলগা হওয়ায়। কারণ, এবারের লড়াইকে কোনোভাবেই ‘ভোটাধিকার’ হরণের নাগরিক আশঙ্কা থেকে ‘বিদেশি চক্রান্ত’-র গল্পে সরানো যাচ্ছে না। মানুষের মনে এখন প্রশ্ন একটাই, ‘আমার ভোট দেওয়ার অধিকার কি আদৌ থাকবে?’ সেই প্রশ্নের উত্তর বিজেপির হাতে নেই। তাই তাঁদের নির্মিত ন্যারেটিভের পরিধি যত বড়ই হোক, তাতে জনমতের চিড়ে এবার আর ভিজবে কিনা তা সময়ই বলে দেবে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অর্ণব গোস্বামী, সুধীরদের প্রত্যাখ্যান মানুষের, অজুহাত অ্যালগরিদম?

Delhi CJP protest: অ্যালগরিই দর্শকদের প্রচলিত সংবাদমাধ্যম থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

‘মনমরা’ থেকে ‘ফুরফুরে’: প্রিজন ভ্যানে ‘হাম হোঙ্গে কামিয়াব’ আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের দিন

Political return of mamata banerjee: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ‘দিল্লি চলো’ কর্মসূচিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেনসহ দেড় হাজারেরও বেশি বিরোধী নেতা আটক হলেন। প্রিজন ভ্যান থেকে ফেসবুক লাইভে খোশমেজাজে বিদ্রোহী মমতা গাইলেন, ‘হাম হোঙ্গে কামিয়াব’ ও ‘জাগো দুর্গা’র মতো গান। বিগত কয়েক মাসের পরাজয়, ভাঙনের মধ্যেও ‘ফ্রি বার্ড’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যাবর্তন ঘটল যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের হাত ধরে।

২০১৪–২০২৬: যে যে গণআন্দোলন মোদী সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে

Street fighting years of Modi-Raj: ২০১৯-এর সিএএ-বিরোধী আন্দোলন শাহিন বাগে ১০১ দিন স্থায়ী হয়, যার জেরে সরকার এনআরসি থেকে সরে আসে। ২০২০-২১-এর কৃষক আন্দোলন ৩৮০ দিন চলে, ৭৫০ জন কৃষকের মৃত্যু হয়, তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৬-এর সিজেপি আন্দোলন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আদায় করে এখন এসআইআর ও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে যন্তর মন্তর ২.০ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

প্রেস কার্ড গলায়, তবু আটক! দিল্লিতে SIR-বিরোধী আন্দোলন কভার করতে গিয়ে পুলিশের জালে সাংবাদিকরা

Journalists detained in Delhi: নিউজলন্ড্রির বিবৃতি অনুযায়ী, তাঁদের তিন রিপোর্টার অনমোল প্রীতম, অশ্বিনী কুমার সিং এবং আস্থা সব্যসাচী ও তাঁদের এক ইন্টার্নের অফিসিয়াল ফোনগুলি পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়। সাংবাদিকরা যখন নিজেদের গণমাধ্যমের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন, তখন পুলিশ সরাসরি বলে ওঠে— “এখানে কোনো মিডিয়া নেই!” (কোই মিডিয়া নেহি হ্যায়)

সিজেপি আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ সোনম ওয়াংচুক কোথায়?

Sonam Wangchuk: সিজেপি আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ সোনম ওয়াংচুক কোথায়? দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে তাঁকে দেখা গেল না কেন?

বিশ্বমঞ্চ যেভাবে দেখছে ভারতের নির্বাচন কমিশনারকে

Global Spotlight on Gyanesh Kumar: ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে, জেন-জি আন্দোলন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে কভার হয়েছে। বিবিসি, রয়টার্স, গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, ডিডাব্লিউ, এপি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, আরএফআই, ফ্রান্স ২৪, ডন, সবাই জানিয়েছে, এসআইআরে ১৩ কোটি নাম বাদের কথা, ভারতের মুসলিম নাগরিকদের এসআইআরের মাধ্যমে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর কথা, রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী সাংসদরা বারবার আটকের কথা।

সিইসি-র পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ, রাজধানীতে বিক্ষোভ শুরুর আগেই ৫০০ আটক, ৪০,০০০-এরও বেশি নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন

Delhi’s October 10 protest: যন্তর মন্তর ও কনট প্লেসের আশপাশ থেকে আন্দোলনকারীদের আটক করা হয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আটক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫০০। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও।