দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!
Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।
১৯৬৮ সালের সুপারহিট তামিল ছবি ‘পুধিয়া ভূমি’-তে একদম শুরুর দিকে 'নান থান ডি কাথি' গানের নাচের দৃশ্যটি মনে আছে? সেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা রেখা আঁকা একটি অদ্ভুত মাঠের মাঝে চমৎকার নাচের ভঙ্গিমায় দেখা গিয়েছিল তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং পরবর্তীতে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতাকে।
খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সেই সাদা ছক কাটা মাঠটি কিন্তু কোনো সাধারণ নাচের স্টেঞ্চিল বা নকশা ছিল না; ওটাই হলো ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলা ‘আত্য পাত্যা’ (Atya Patya)-র কোর্ট। মূলধারার ছবিতে এটিই সম্ভবত আত্য পাত্যার একমাত্র দৃশ্য।
জয়ললিতার সেই বিখ্যাত নাচের দৃশ্যের মতোই খেলার আসল ময়দানেও ওইরকম সাদা দাগ কাটা থাকে। মাঝের সাদা দাগগুলির একেকটিতে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিরক্ষাকারীরা, আর উল্টো দিকে থাকে একঝাঁক ক্ষিপ্র আক্রমণকারী। শরীর দোলে, চটজলদি বাঁক নেয়, হাত ছুঁয়ে দিতে যায় শূন্য হাওয়ায়—আর ঠিক শেষ মুহূর্তে এক নিখুঁত ফাঁকি দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে যায় প্লেয়ারটি! কোনো গ্যালারির আলো না থাকলেও, মাঠের ধুলো উড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ছিটকে দেওয়ার এই চতুর কৌশলগুলিই হাজার বছর ধরে এই খেলায় লড়াইয়ের আঁচ বাঁচিয়ে রেখেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।
কাবাডি কিংবা খো-খোর নাম তো আমরা সবাই শুনেছি, কিন্তু ঠিক সেই একই রকম রোমাঞ্চ আর চটপটে মেজাজ রয়েছে এই দেশীয় খেলাটিরও। মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে এর আঁতুড়ঘর। চলতি ভাষায় একে বলা হয় ‘গেম অফ ফেইন্টস’ বা ফাঁকি দেওয়ার খেলা। তবে খেলার নাম যা-ই হোক, একে একদম সহজ কথায় বলা যায় চলমান চতুরতার এক অবিশ্বাস্য উপস্থাপনা।
আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষকে তাড়া করা ও ফাঁকি দেওয়ার কৌশল হিসেবে এটি ছিল এক দারুণ সামরিক অনুশীলন।
আত্য পাত্যা-র ময়দানে খেলোয়াড়েরা
সপ্তদশ শতকে মহারাষ্ট্রের ভক্তি সাধক সন্ত তুকারামের রচিত অভঙ্গেও ‘আট্যাপাট্যা’ নামের উল্লেখ মেলে। গ্রামের মানুষ কাজ শেষে, বিশেষ করে ফসল কাটার মরশুমে বা মেলা-উৎসবের দিনে ফাঁকা মাঠে চাঁদের আলোয় মেতে উঠত এই খেলায়। তবে খেলাটির আধুনিক ও সুসংগঠিত রূপ আসতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। ১৯১৪ সালে পুনের ডেকান জিমখানা প্রথমবার এর নিয়মকানুন খাতায়-কলমে ছকে ফেলে। এরপর ১৯৩৫ সালে ‘অখিল মহারাষ্ট্র শারীরিক শিক্ষা মণ্ডল’ খেলাটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের উপযোগী রূপ দেয়। অবশেষে ১৯৮২ সালে নাগপুরে গঠিত হয় এর কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘আত্য পাত্যা ফেডারেশন অফ ইন্ডিিয়া’, এবং সেই বছরই আয়োজিত হয় প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। বর্তমানে ভারত সরকারের যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এটিকে পূর্ণ জাতীয় খেলা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Yubi Lakpi Manipur: ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য মণিপুরে গেলে ঠিক এমন এক রোমাঞ্চকর খেলার দেখা মিলবে। স্থানীয় মানুষ একে ভালোবেসে ডাকেন 'ইয়ুবি লাকপি'। মেইতেই ভাষায় ‘ইয়ুবি’ মানে নারকেল, আর ‘লাকপি’ শব্দের অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া। ফুটবল বা রাগবির আন্তর্জাতিক গ্ল্যামার হয়তো এর নেই, কিন্তু এর প্রতিটা মিনিটে যে আদিম উত্তেজনা লুকিয়ে আছে, তা যেকোনো আধুনিক খেলাকে টেক্কা দিতে পারে।
আত্য পাত্যা খেলতে গেলে কোনো ব্যাট, বল, নেট বা কোনো আধুনিক দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। কেবল একটি বড় মাঠ থাকলেই খেলা জমিয়ে দেওয়া সম্ভব। মাঠের মধ্যে খেলার জায়গাটি একটি নির্দিষ্ট আয়তাকার পরিমাপে আঁকা হয়। মাঠের লম্বালম্বি মাঝখান দিয়ে থাকে ৮৯ ফুট ১ ইঞ্চির একটি প্রধান চ্যানেল, যাকে বলা হয় ‘সুর-পাটি’। এর দু’পাশে আড়াআড়ি টানা থাকে ৯টি ছোট ছোট পরিখা বা পাটি। খেলায় দুই দলে ৯ জন করে মোট ১৮ জন খেলোয়াড় অংশ নেন। একদল থাকে পাহারাদার বা প্রতিরক্ষাকারী, যারা পরিখার বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে পথ আটকে থাকে। আর অন্য দল হলো সেই চতুর আক্রমণকারী, যাদের মূল কাজ হলো প্রতিরক্ষাকারীদের স্পর্শ বা ট্যাগ এড়িয়ে একটার পর একটা দাগ পার হয়ে শেষ দাগ পর্যন্ত পৌঁছনো।
আক্রমণকারীরা চারজনের ব্যাচে পরিখা পার হওয়া শুরু করে। যদি কোনো আক্রমণকারী পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে সবকটি পরিখা পার হয়ে একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারে, তবে সে অমনি উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলে ‘টন্ড’! এই শব্দটির সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ম অনুযায়ী প্রতিরক্ষাকারীদের অন্য মুখে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। এরপর সেই একই আক্রমণকারী যদি উল্টো পথে আবার সব পরিখা পার হয়ে সফলভাবে শুরুর জায়গায় ফিরে আসতে পারে, তবে তাকে বলে ‘লোনা’। এই লোনা দলের ঝুলিতে একবারে ১৮ পয়েন্ট এনে দেয়! একটি ম্যাচে সাধারণত ৭ মিনিটের ৪টি ইনিংস খেলা হয় এবং তিন গেমের লড়াইয়ে যে দল দুটি গেমে জেতে, তারাই জয়ী হয়।
পশ্চিমবঙ্গের আত্য পাত্যা
তামিলনাড়ুতে সমুদ্রের ধারে লবণক্ষেতে যেসব নারী কাজ করতেন, তাঁরা কাজের ফাঁকে নুন দিয়েই মাঠে রেখা টেনে এই খেলা খেলতেন। নুনের দাগ দিয়ে খেলা হতো বলে সেখানে এর নামই হয়ে যায় ‘উপ্পুকোডু’ বা লবণের রেখা।
আবার আধ্যাত্মিক দিক থেকেও এর এক গভীর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন গুরু মেহের বাবা। তিনি বলেছিলেন, খেলার ৯টি পরিখা বা বাধা আসলে মানুষের ভিতরের ৯টি নেতিবাচক আবেগ—রাগ, লোভ, হিংসা, অহংকারের প্রতীক, আর চতুরতা ও ধৈর্যের সঙ্গে সেগুলিকে টপকে জয়ী হওয়াই জীবনের মূল শিক্ষা।
ভারতেই নয়, সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এর অস্তিত্ব দেখা যায়। যেমন ইন্দোনেশিয়ায় একে বলে ‘গোবাক সোডোর’, মালয়েশিয়ায় ‘গালাহ পাঞ্জাং’, ফিলিপাইনে ‘পাতিন্তেরো’, আর আমাদের বাংলায় প্রায় একই নিয়মে খেলে আসা হয় ‘দরিয়া বান্ধা’। আজ ক্রিকেটের গ্ল্যামার আর ডিজিটাল বিনোদনের ভিড়েও আত্য পাত্যা তার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। ২০১৩ সালে ভুটান এবং ২০২৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান আত্য পাত্যা চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত পুরুষ ও মহিলা—উভয় বিভাগেই সোনা জিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে এখন প্রায় হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত খেলোয়াড় নিয়মিত অনুশীলন করছেন এবং রাজ্য সরকারের তরফ থেকে স্পোর্টস কোটায় সরকারি চাকরির সুযোগও তৈরি হয়েছে। কোনো রকম আর্থিক খরচ ছাড়া শরীর ও মনের নিখুঁত চর্চা করার জন্য এই খেলাটি এক অসাধারণ মাধ্যম, যা হাজার বছরের পুরনো মাটির সুরভি নিয়ে আজও ভারতের খেলাধুলার ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে।






