ইজরায়েল নির্বাচন: আরব ইজরায়েলি কারা? কেন এত ভোট পেল আরব দলগুলি?
Israel elections: আরব ইজরায়েলি কারা? বৈষম্য ও অপরাধের প্রতিবাদে তাঁদের রেকর্ড ভোট আরব দলগুলোকে ইজরায়েলের নেসেটে সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে দিল?
ইজরায়েলের নির্বাচনে আরব নাগরিকদের বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে এগিয়ে আসা দেশটির রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে আরব নাগরিকদের একাংশের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে অনীহা, রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি অবিশ্বাস এবং নিজেদের ভোটে সরকার বা নীতির পরিবর্তন আনার ক্ষমতা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই ছবিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এর পিছনে রয়েছে অপরাধ ও হিংসা নিয়ে উদ্বেগ, সমান অধিকারের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
ইজরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের অধিকাংশই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে বহু ফিলিস্তিনি নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। তবে একটি অংশ ইজরায়েলের সীমানার মধ্যে থেকে যান এবং পরবর্তী সময়ে ইজরায়েলের নাগরিকত্ব লাভ করেন। নাগরিকত্ব থাকলেও তাঁদের জীবনে বৈষম্য, জমি ও বসবাসের অধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
এই নাগরিকদের কেউ নিজেদের ইজরায়েলের আরব নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন, কেউ ফিলিস্তিনি পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেন। আবার অনেকের কাছে দুই পরিচয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরব নাগরিকদের বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে যাওয়ার অন্যতম কারণ তাঁদের দৈনন্দিন নিরাপত্তার অভাব। ইজরায়েলের আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে সংগঠিত অপরাধ, গুলিচালনা এবং খুনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়। অনেকের অভিযোগ, এই সমস্যা মোকাবিলায় সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ করেনি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নীতি নিয়ে আরব নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। বাড়িঘর ভাঙার অভিযান এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগও এই ক্ষোভকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Arab Israeli: ইজরায়েলের জনসংখ্যার পাঁচভাগের এক ভাগ আরব। আইন অনুযায়ী, ইহুদি নাগরিকদের মতো তাদেরও সমান অধিকার পাওয়ার কথা।
ফলে এবারের নির্বাচন অনেক ভোটারের কাছে শুধু সরকার বেছে নেওয়ার বিষয় ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নিজেদের পরিবার, বসতি এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রশ্ন। যাঁরা আগে কখনও ভোট দেননি, তাঁদের একাংশও এবার ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া জরুরি।
আরব নাগরিকদের ভোটদানের হার বাড়লেও তার অর্থ এই নয় যে তাঁদের সকলের রাজনৈতিক মতামত এক। কেউ নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান, কেউ নিজেদের এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে প্রধান দাবি হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ চান, আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা সরাসরি সরকার পরিচালনার অংশ হোন। বিভিন্ন দাবি এক জায়গায় এসে মিলেছে—বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন।
ইজরায়েলের সংসদের নাম নেসেট। এই সংসদে মোট ১২০টি আসন রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে অন্য দলগুলির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি। বিরোধী জোট ৪৮টি। আরব দলগুলো ১৯টি।
রা'আমের নেতা মনসুর আব্বাসের রাজনৈতিক কৌশল, আরব নাগরিকদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারে অংশ নেওয়া। অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্টের নেতারা আরব নাগরিকদের অধিকার ও ফিলিস্তিনি জাতীয় প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁরা বিরোধী সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করার সম্ভাবনাও খোলা রেখেছেন। অর্থাৎ, নির্বাচনে আসন বাড়লেই যে আরব দলগুলি সরাসরি সরকারে যোগ দেবে, এমন নয়।
আরব নাগরিকদের বেশি সংখ্যায় ভোট দেওয়ার পিছনে রাজনৈতিক দলগুলির ঐক্যের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত মোশে দায়ান সেন্টারের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, চারটি আরব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে জোট গঠন করলে ভোটদানের হার ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে এই হার ৫৩ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ আরব দলের সরকারে যোগ দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছিলেন।
নেতানিয়াহুর সরকার আরব ভোটারদের বেশি অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নির্বাচনের দিন আরব ভোটারদের ভোট দিতে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তাঁর শিবিরের প্রচার নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। আরব রাজনৈতিক নেতারা এই প্রচারকে বর্ণবিদ্বেষমূলক বলে সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, দেশের নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক অধিকার। কোনো নাগরিকের পরিচয়কে রাজনৈতিক আতঙ্ক তৈরির উপায় হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।








