এসআইআর: ৫ মাসে নিষ্পত্তি ১.২৬ লক্ষ, বাকি মামলা মিটাবে ১২ বছরে?
SIR Appeals: এসআইআর-এর পর পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নিয়ে জমা পড়া আপিলের মধ্যে পাঁচ মাসে মাত্র ১.২৬ লক্ষ আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমান গতিতে কাজ চললে বাকি ৩৭ লক্ষেরও বেশি আপিল নিষ্পত্তি করতে প্রায় ১২ বছর সময় লাগতে পারে।
ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে একজন নাগরিকের ভোটাধিকার নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর-কে ঘিরে সেই অনিশ্চয়তাই এখন আরও বড় প্রশ্নের মুখে। কারণ, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বা তালিকায় অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যে বিপুল সংখ্যক আপিল জমা পড়েছে, তার নিষ্পত্তির গতি বর্তমান হারে চললে সব মামলা শেষ হতে সময় লাগতে পারে ১২ বছরেরও বেশি।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় এই তথ্য জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালগুলিতে ৩৭ লক্ষেরও বেশি মামলা পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, গত পাঁচ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ১ লক্ষ ২৬ হাজার ১৯৪টি আবেদন। এই গতিতে কাজ চললে বাকি মামলাগুলি শেষ করতে প্রায় ১৪৬ মাস সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ, ১২ বছরেরও বেশি।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়ে শুরু থেকেই একাধিক স্তরে যাচাই হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতির কারণে যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়েছিল। তাঁদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে প্রায় ৭০০ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে কাজে লাগানো হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে।
এরপর সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ তৈরি করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। প্রথম দিকে ১৯টি ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করেছিল। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক হলফনামায় অবশ্য মোট ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৪ করার কথা বলা হয়েছে এবং আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, বর্তমান সংখ্যক ট্রাইব্যুনাল দিয়ে এত বিপুল সংখ্যক মামলা দ্রুত শেষ করা কঠিন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal SIR Tribunal: এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৩৪ লক্ষ আবেদন ট্রাইব্যুনালে ঝুলে থাকায় পরিচয় ও ভোটাধিকার নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ রেশন, সরকারি প্রকল্প বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। আর কী কী সমস্যায় পড়তে হচ্ছে এসআইআর-এর ডিভোটারদের?
পাঁচ মাসে যদি প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়, অথচ এখনও ৩৭ লক্ষের বেশি মামলা অপেক্ষায় থাকে, তাহলে বর্তমান গতিতে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। নির্বাচন কমিশন নিজেই সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা ২৪ থেকে বাড়িয়ে ৪২ করার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। কমিশনের যুক্তি, রাজ্যের ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হলে কাজ দ্রুত এগোতে পারে।
শুধু ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোই নয়, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের বাড়ি থেকে শুনানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ করার অনুমতি দেওয়ার কথাও বলেছে কমিশন। তাদের বক্তব্য, যাতায়াতে যে সময় নষ্ট হচ্ছে তা কমানো গেলে মামলার নিষ্পত্তির গতি বাড়তে পারে। অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশন নিজেও স্বীকার করছে যে বর্তমান ব্যবস্থা ৩৭ লক্ষের বেশি আবেদনের চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত যে প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৯৪৩ জনের নাম ফের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৮,৬৪৯টি আবেদন খারিজ হয়েছে। অর্থাৎ, নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলির মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই ভোটারদের নাম পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই ৯৩ শতাংশ এখনও পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া মামলার হিসাব। অর্থাৎ, যত আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে, তার মধ্যে কতগুলি ক্ষেত্রে নাম পুনর্বহাল হয়েছে—এই হিসাব। সমস্ত বাদ পড়া ভোটারের মধ্যে ৯৩ শতাংশকে ভুলভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল, এমন কোনো সিদ্ধান্ত এই পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া যায় না। একইভাবে, এখনও ৩৭ লক্ষের বেশি মামলা বিচারাধীন থাকায় এই সংখ্যাগুলির চূড়ান্ত চিত্রও সামনে আসেনি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭.১৬ লক্ষ বাদ পড়া ভোটারের মধ্যে ২২ লক্ষেরও বেশি ভোটার নিজেদের নাম ফেরানোর জন্য আপিল করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে ট্রাইব্যুনাল মাত্র ১,৬০৭ জন ভোটারের নাম পুনর্বহাল করতে পেরেছিল। ফলে যাঁদের মামলা তখনও নিষ্পত্তি হয়নি, তাঁরা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি।
অগাস্টে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছিল, ট্রাইব্যুনালে জমে থাকা মামলাগুলি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং আরও কতগুলি ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন। আদালত সময়বদ্ধভাবে আপিলের নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছিল। এমনকি জরুরি ভিত্তিতে শুনানির প্রয়োজন রয়েছে এমন ভোটারদের আবেদন অগ্রাধিকার দিয়ে শুনতে ট্রাইব্যুনালগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, যাচাইয়ের মাধ্যমে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত বা একাধিক জায়গায় থাকা ভোটারদের নাম চিহ্নিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নামও যাতে বাদ না যায়, সেই নিশ্চয়তা নিয়েই রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন পক্ষ প্রশ্ন তুলেছে। এই বিতর্কের চূড়ান্ত বিচার আদালত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই হবে। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হলে, বিচারপ্রক্রিয়ার পদ্ধতি বদলালে বা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অন্য ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই সময় অনেকটাই কমতে পারে।








