মেষ নয়, হায়াডিস? ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ নিয়ে কী বলছে নতুন গবেষণা?
The Starry Night mystery: এর আগে দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে ভ্যান গগের আঁকা ছবিটির উপরের অংশটি মেষ রাশির কোনো তারামণ্ডল। তবে, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত 'দ্য অ্যাকচুয়াল স্কাই অফ ভ্যান গগস স্টারি নাইট: এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিঅকনস্ট্রাকশন' নামক গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ভ্যান গগের ছবির কেন্দ্রীয় পাঁচ তারার বিন্যাস মেষ রাশির সঙ্গে নয়, বরং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে।
ভিনসেন্ট ভ্যান গগের বিখ্যাত মাস্টারপিস ‘দ্য স্টারি নাইট’ (The Starry Night) নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। নীল রাতের আকাশে ঘূর্ণায়মান তারাগুলি যুগ যুগ ধরে শিল্পপ্রেমী ও বিজ্ঞানীদের সমানভাবে আকর্ষণ করে আসছে। সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণার দাবি অনুযায়ী, ছবিটির কেন্দ্রীয় পাঁচটি তারার বিন্যাস বৃষ রাশির হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে মিলে যায় এবং সম্ভবত ১৮৮৯ সালের ২২ জুলাই ভোরের আকাশই ছিল ছবিটির অনুপ্রেরণা।
এর আগে দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে ভ্যান গগের আঁকা ছবিটির উপরের অংশটি মেষ রাশির কোনো তারামণ্ডল। সায়েন্টিফিক আমেরিকান এবং সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের শিল্প-ইতিহাসবিদ অ্যালবার্ট বোয়েম ছবিটিকে প্রথম একটি ‘জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দলিল’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। বোয়েম এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী চার্লস হুইটনি ছবিটির জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন যে সাঁ-রেমি-দে-প্রোভঁসের সেসময়ের আকাশ পুনর্গঠন করলে ১৮৮৯ সালের ১৯ জুন ভোরের আকাশে শুক্র গ্রহের কাছাকাছি মেষ রাশির কিছু তারা দৃশ্যমান ছিল। এছাড়া ভ্যান গগ ১৮৮৯ সালের ১৮ জুনের একটি চিঠিতে ভোরের আকাশ ও তারার কথা লিখেছিলেন, যার উপর ভিত্তি করে বোয়েম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ছবির উপরের তারাবিন্যাসটি আসলে মেষ রাশির।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Vincent Van Gogh's Painting: চুরি যাওয়া ভ্যান গগের ছবি কে ফিরিয়ে গেলেন? কেমন করে উদ্ধার করলেন গোয়েন্দারা
তবে সিএনএন ও সায়েন্টিফিক নিউজ-এর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার কিউং হি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এলিয়া জিওং-হিয়ুন কিমের নেতৃত্বে একদল গবেষক সম্প্রতি সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত 'দ্য অ্যাকচুয়াল স্কাই অফ ভ্যান গগস স্টারি নাইট: এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিঅকনস্ট্রাকশন' (The Actual Sky of Van Gogh's Starry Night: A Multidisciplinary Reconstruction) নামক গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ভ্যান গগের ছবির কেন্দ্রীয় পাঁচ তারার বিন্যাস মেষ রাশির সঙ্গে নয়, বরং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষকেরা তারার আপেক্ষিক দূরত্ব, কোণ ও বিন্যাস তুলনা করার জন্য প্রোক্রুস্টিস শেপ অ্যানালাইসিস নামের পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এতে তারার আকার বা ছবির সাধারণ ঘূর্ণন-পার্থক্য বাদ দিয়ে শুধু জ্যামিতিক আকৃতি মেলানো হয়েছে, যা থেকে দেখা যায় ছবির পাঁচটি প্রধান তারা মিলে যে ‘V’ আকৃতি তৈরি করেছে তা হায়াডিসের কাঠামোর সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মেলে। সায়েন্টিফিক নিউজ জানাচ্ছে, কিমের দল সাঁ-রেমির ঐতিহাসিক আবহাওয়া ও তাপমাত্রার রেকর্ডও ব্যবহার করেছেন, যেখানে ১৯ জুনের চাঁদ প্রায় গোল গিব্বাস কিন্ত ২২ জুলাই ভোরের আকাশে ক্ষয়িষ্ণু সরু অর্ধচন্দ্র, শুক্র গ্রহ এবং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জ একসঙ্গে কাছাকাছি অবস্থান করছিল, যা ছবির দৃশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Vincent Van Gogh: জীবদ্দশায় আর্লের মানুষ ভিনসেন্টকে ভালোবাসেনি। বিচ্ছু ছেলের দল ওঁকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ছে।
এখানে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নটি আসে যে ভ্যান গগ কীভাবে হায়াডিস সম্পর্কে জানলেন? গবেষক কিম ও তাঁর দল দাবি করছেন না যে ভ্যান গগ ‘হায়াডিস’ নামটি জানতেন বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনো কঠিন বই পড়েছিলেন। সিএনএন ও পপসায়েন্স জানাচ্ছে, ১৮৮৯ সালের ২২ জুলাই ভোরে সাঁ-রেমির মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রের জানালা দিয়ে তাকালে পূর্ব আকাশে শুক্র, সরু চাঁদ এবং হায়াডিসের স্পষ্ট ‘V’ আকৃতি খালি চোখেই দেখা যেত। ভ্যান গগ হয়তো নক্ষত্রপুঞ্জটির বৈজ্ঞানিক নাম জানতেন না, কিন্তু তিনি আকাশের সেই সুনির্দিষ্ট বিন্যাসটি নিজের চোখেই দেখেছিলেন। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভ্যান গগ হুবহু ফটোগ্রাফের মতো আকাশের ছবি আঁকেননি, বরং তিনি বাস্তব আকাশ দেখে নিজের আবেগ, তুলির টান এবং রঙের খেলায় সেই দৃশ্যকে বিবর্ধিত ও রূপান্তর করে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
অবশ্য স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ও নাসার হাবল ফেলো জেমস বিয়াটির তথ্য অনুযায়ী, এই গবেষণাটিকেই একেবারে চূড়ান্ত বা নিশ্চিত সত্য বলে ধরে নেওয়ার উপায় নেই। যেমন—সায়েন্টিফিক নিউজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গবেষণার বাইরে থাকা পদার্থবিজ্ঞানী হোসে লুইস আরাগন নতুন এই দাবিকে ‘চমৎকার একটি অনুমান’ বললেও জুনের চাঁদের আকৃতি ছবির সঙ্গে না মেলার বিষয়টিকে একটি বড় ‘বাস্তব সমস্যা’ বা অমিল হিসেবে দেখছেন।
পাশাপাশি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও শিল্পকলার গবেষক ডন ওলসনও নতুন এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, ছবিতে শুক্র গ্রহ এবং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের যে পারস্পরিক দূরত্ব বা অবস্থান দেখানো হয়েছে, তার সঙ্গে গণনার পুরোপুরি মিল পাওয়া যায় না। এছাড়া ভ্যান গগের ১৮ জুনের চিঠির তথ্যও তাঁর কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক গবেষণা এবং সিএনএন ও সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর বিশ্লেষণে এটিই স্পষ্ট হয় যে, ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ নিছক কল্পনার জগতের কোনো সৃষ্টি নয়; বরং এটি শিল্পী মনের গভীর কল্পনা এবং বাস্তব আকাশের নিখুঁত পর্যবেক্ষণের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।







