মমতা ফিরে পাবেন তাঁর আঁকা জোড়াফুল?
Mamata Banerjee TMC Symbol: তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী জোড়াফুল প্রতীক কি শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে ফিরবে? জোড়াফুলের ভবিষ্যৎ কী? কী বলছে আইন?
জোড়াফুল চিহ্নটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের আঁকা—তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এমন কথাই বহুদিন ধরে প্রচলিত। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরির সময় থেকেই এই চিহ্ন দলের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ঘাসের উপর পাশাপাশি দু'টি ফুল। ২৮ বছর ধরে এই প্রতীকই তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিচয়। এখন সেই প্রতীকই সাময়িক ভাবে দলের দুই শিবিরের কারও হাতে নেই। নির্বাচন কমিশন ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারে আপাতত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি তাঁর তৈরি রাজনৈতিক দলের সেই পরিচয় আর কোনো দিন ফিরে পাবেন?
অনেক ভোটার প্রার্থীর নামের থেকেও প্রতীক দিয়ে দলকে চিনে নেন। ফলে একটি দল ভেঙে গেলে কে পুরনো দলের নাম ব্যবহার করবে, কে পুরনো প্রতীক ব্যবহার করবে—তা নিয়ে বিবাদ হওয়া নতুন কিছু নয়। ভারতের রাজনীতিতে এমন ঘটনা বারবার ঘটেছে। কংগ্রেস, শিবসেনা, এআইএডিএমকে-সহ একাধিক দলের ভাঙনে প্রতীক নিয়ে লড়াই হয়েছে। আইনেও তার ব্যবস্থা রয়েছে। কী বলছে আইন?
প্রতীক ব্যবহারে বিষয়টি এখন আর শুধু নির্বাচন কমিশনের হাতে নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন। ফলে শেষ কথা বলার জায়গা এখন দেশের শীর্ষ আদালত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ritabrata Banerjee: ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তৃণমূল নেতাদের উপর আড়ি পাতার কাজে তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছিল। কাদের কাছে সেই তথ্য পৌঁছে দিতেন তিনি? ২০২১-এর ভোট পর্যন্ত চলা সেই নজরদারির নেপথ্যে কারা ছিলেন?
১৯৬৮ সালের Election Symbols (Reservation and Allotment) Order-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের দুই বা তার বেশি গোষ্ঠী নিজেদের সেই দল বলে দাবি করলে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কমিশন দু'পক্ষকে শুনে এবং তাদের সাংগঠনিক ও আইনসভায় শক্তি-সহ বিভিন্ন তথ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই ক্ষমতার সাংবিধানিক বৈধতা ১৯৭১ সালের সাদিক আলি বনাম ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া মামলায় সুপ্রিম কোর্টও বহাল রেখেছিল।
সাদিক আলি মামলার পর থেকে একটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে—কোন গোষ্ঠীর সঙ্গে বিধায়ক, সাংসদ এবং দলের সাংগঠনিক কাঠামোর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ রয়েছে। পাশাপাশি দলের সংবিধান, দলের মূল উদ্দেশ্য ও নীতির সঙ্গে কোন গোষ্ঠীর অবস্থান বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই বিষয়গুলিও বিবেচনায় আসতে পারে। অর্থাৎ শুধু কে নিজেকে আসল দল বলছে, তা দিয়ে প্রতীক পাওয়া যায় না।
প্রসঙ্গত, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ক্ষমতা হারানোর পরে দলের ভিতরে বড় ধরনের ভাঙন তৈরি হয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির নিজেদের দলের প্রকৃত প্রতিনিধি বলে দাবি করেছে। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদ্রোহী বিধায়ক তাঁকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন করেছেন এবং স্পিকারও তাঁকে সেই পদে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
এর মধ্যেই সামনে চলে এসেছে রেজিনগর ও নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন। ৬ অক্টোবর এই দুই কেন্দ্রে ভোট। দুই শিবিরই প্রার্থী দিয়েছিল। অথচ যদি একই দলের দুই পক্ষ একই নাম এবং একই প্রতীক নিয়ে ভোটে নামে, তাহলে ভোটারদের বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মনোনয়ন নিয়েও আইনি সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। দুই পক্ষকে বিকল্প নাম এবং প্রতীক বেছে নিতে বলা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Ritabrata Banerjee: তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেই ১৪ জনকে নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়ার তালিকা তৈরি হয়েছিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি অনুযায়ী, সেই তালিকায় প্রথম নাম ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর কারা ছিলেন ওই তালিকায়? নির্দেশ এসেছিল কোথা থেকে?
তার পরের দিনই এল নতুন পরিচয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের নতুন নাম—‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’। প্রতীক ‘ফুটবল প্লেয়ার’। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের নাম—‘ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস’। প্রতীক ‘খাম’ বা ‘এনভেলপ’। এই বরাদ্দ আপাতত উপনির্বাচনের জন্য।
জোড়াফুল এখন কোনো পক্ষের কাছেই স্থায়ী ভাবে চলে যায়নি। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান ব্যবস্থা অন্তর্বর্তী। পুরনো নাম ও প্রতীকের বিষয়ে চূড়ান্ত লড়াই এখনও শেষ হয়নি। বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতোমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। ফলে জোড়াফুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জায়গা নেই। তবে রাজনীতিতে মাটিতে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে।
জোড়াফুল প্রতীক এখনও স্থায়ীভাবে কোনো পক্ষের হাতে যায়নি। নির্বাচন কমিশন আপাতত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাই জোড়াফুল শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে, এখনই তা বলা সম্ভব নয়। তবে এই প্রতীক নিয়ে টানাপোড়েনের প্রভাব ইতোমধ্যেই রাজনীতির ময়দানে দেখা যাচ্ছে।
নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। তার আগে তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২০০৭ সালের একটি পুরনো মামলায় মিলন প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটিতে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল; কংগ্রেস ও মমতা শিবির অবশ্য গ্রেফতারের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রেজিনগরেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মমতা শিবিরের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী ১২ সেপ্টেম্বর প্রথমে জানিয়েছিলেন, তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিদ্ধান্ত বদলে ফের নির্বাচনে থাকার কথা জানান।
উল্লেখ্য, একটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক তৈরি হতে সময় লাগে। কিন্তু মানুষের মাথায় সেই প্রতীককে বসাতে লাগে বহু বছর। ১৯৯৮ থেকে তৃণমূলের সঙ্গে জোড়াফুলের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সেই প্রতীকের সঙ্গে মমতার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাও জড়িয়ে রয়েছে। আজ সেই প্রতীক তাঁর হাতের বাইরে। রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিষ্ঠাতা হওয়া আর প্রতীকের আইনি দাবিদার হওয়া এক কথা নয়। দল ভেঙে গেলে প্রশ্ন ওঠে, কে দলের সাংগঠনিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে, কে আইনসভায় বেশি সমর্থন পাচ্ছে, দলের সংবিধান এবং সাংগঠনিক কাঠামো কার সঙ্গে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সেই তথ্যই বিচার করে। মমতা কি শেষ পর্যন্ত তাঁর আঁকা জোড়াফুল ফিরে পাবেন? উত্তর জানাবে সুপ্রিম কোর্টই।








