প্রযুক্তির যুগেও কেন জরুরি বিজ্ঞানমনস্কতা, দাভোলকার যে প্রশ্ন তুলে দেয়
Narendra Dabholkar: নরেন্দ্র দাভোলকারের হত্যার ১৩ বছর পরেও কেন প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদ? কুসংস্কার, ভুয়ো তথ্য ও অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে কীভাবে গড়ে উঠবে মানবিক, যুক্তিনির্ভর সমাজ?
প্রতি বছর ২০ অগাস্ট ভারতে বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ এবং মৌলবাদ, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতার এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়; এই দিনটির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে মহারাষ্ট্রের চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ নরেন্দ্র দাভোলকারের নাম। ২০১৩ সালের ২০ অগাস্ট পুনেতে প্রাতঃভ্রমণের সময়ে পানসারে ও কালবুর্গির প্ররোচনায়ে সনাতন সংস্থার আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন। একজন মানুষকে হত্যা করা সম্ভব, কিন্তু মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার আকাঙ্ক্ষা, যুক্তির আলো এবং মুক্তমনা চিন্তার চেতনাকে হত্যা করা যায় না, দাভোলকারের জীবন ও মৃত্যু সেই সত্যেরই এক শক্তিশালী উদাহরণ যা প্রতিটি বিজ্ঞান কর্মীদের আজও অনুপ্রেরণা দেয়। বিজ্ঞানমনস্কতা আসলে কেবল বিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রযুক্তি ব্যবহারের করা নয়, বিজ্ঞানমনস্কতা হলো প্রমাণের ভিত্তিতে চিন্তা করা, কোনো প্রচলিত ধারণাকে শুধুমাত্র পুরনো বা জনপ্রিয় বলে সত্য হিসেবে গ্রহণ না করা, প্রশ্ন করার সাহস রাখা, যুক্তির সাহায্যে সত্য না মিথ্যা যাচাই করা এবং নতুন প্রমাণ সামনে এলে নিজের পুরনো ধারণাকে সংশোধন করার মানসিকতা অর্জন করা। এই কারণেই বিজ্ঞানমনস্কতা একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ।
যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে জ্ঞানের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়; যে সমাজে যুক্তির পরিবর্তে গুজব, ভয় ও অন্ধ আনুগত্য মানুষের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে, সেখানে গণতান্ত্রিক চেতনা দুর্বল হয়; আর যে সমাজে মানুষের দারিদ্র্য, অসহায়তা, অসুস্থতা ও ভয়কে ব্যবহার করে অলৌকিকতার ব্যবসা গড়ে ওঠে, সেখানে কুসংস্কার আর নিছক ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকে না তা হয়ে ওঠে সামাজিক শোষণের একটি হাতিয়ার। নরেন্দ্র দাভোলকার এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
পেশায় চিকিৎসক হলেও তিনি তাঁর কাজকে হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রের সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি; তিনি বুঝেছিলেন মানুষের শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি সমাজের মধ্যেও অজ্ঞতা, ভয়, প্রতারণা ও কুসংস্কারের নানা রোগ রয়েছে। ১৯৮৯ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি, যার মাধ্যমে তিনি অলৌকিক ক্ষমতার দাবি, ভণ্ডামি, কুসংস্কার, অমানবিক প্রথা এবং প্রতারণার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন জনসচেতনতা গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সংগ্রামের একটি বিশেষ দিক ছিল, তিনি সাধারণ মানুষকে অপমান করার পরিবর্তে প্রতারণার কাঠামোকে প্রশ্ন করতেন,কারণ একজন অজ্ঞ মানুষকে উপহাস করলে তার অজ্ঞতা দূর হয় না, বরং শিক্ষা, যুক্তি, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে তাকে নিজের বিচারবোধের উপর আস্থা রাখতে শেখাতে হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Einstein Bohr quantum debate: সম্প্রতি ১০০ বছর আগের আইনস্টাইনের সেই কাল্পনিক পরীক্ষাটি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়না (USTC)-এর বিখ্যাত কোয়ান্টামবিজ্ঞানী জিয়ান-উই প্যান (Jian-Wei Pan) এবং তাঁর সহকর্মীরা ল্যাবরেটরিতে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।
কোনো অসুস্থ মানুষ যদি চিকিৎসার পরিবর্তে অলৌকিক চিকিৎসার উপর নির্ভর করে, তার জীবন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিপন্ন হয়; কোনো নারী যদি তথাকথিত ডাইনি অপবাদে নির্যাতিত হন, তা শুধু অন্ধবিশ্বাস নয় তা ক্ষমতা ও সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন; কোনো দরিদ্র পরিবার যদি অশুভের ভয়ে শিশুর চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়, তা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয় তা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়। ফলে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে কেবল কয়েকটি অলৌকিক প্রদর্শন খণ্ডনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; এর সঙ্গে শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
ভারতের সংবিধানের ৫১এ অনুচ্ছেদের (h) ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য হল বৈজ্ঞানিক মনন, মানবতাবাদ এবং অনুসন্ধিৎসা ও সংস্কারের চেতনা বিকাশ করা। অর্থাৎ বিজ্ঞানমনস্কতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নাগরিক মূল্যবোধ। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, কোনো বক্তব্য তার বক্তার পরিচয়ের কারণে সত্য হয়ে যায় না; প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং যুক্তিই সত্য যাচাইয়ের ভিত্তি। বিজ্ঞানীর কথাও প্রশ্ন করা যায়, শিক্ষকের কথাও প্রশ্ন করা যায়, রাষ্ট্রের বক্তব্যও প্রশ্ন করা যায়, সংবাদমাধ্যমের তথ্যও যাচাই করা যায়, এমনকি নিজের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসকেও নতুন প্রমাণের আলোকে পুনর্বিবেচনা করা যায় কারণ বিজ্ঞান নিজেই সংশোধন ও আত্মসমালোচনার উপর দাঁড়িয়ে আছে।
নিউটন থেকে আইনস্টাইন, ডারউইন থেকে আধুনিক বিজ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি মূলত প্রশ্ন, পরীক্ষা, ভুল সংশোধন এবং নতুন জ্ঞানের ধারাবাহিকতার ইতিহাস। তাই বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ সে নয় যে সবকিছুকে অস্বীকার করে; বরং সে এমন মানুষ যে প্রমাণ ছাড়া কোনো দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। দাভোলকারের হত্যাকাণ্ড আমাদের আরও একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করায় প্রশ্ন কখনও কখনও ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলে। যে মানুষ জিজ্ঞাসা করে, প্রমাণ কোথায়? সে প্রতারণার কাছে অস্বস্তিকর; যে প্রশ্ন করে, এই প্রথায় কার লাভ হচ্ছে? সে শোষণের কাছে অস্বস্তিকর; যে মানুষ বলে, মানুষের জীবন ও মর্যাদা কি কোনো অন্ধ প্রথার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ? সে বৈষম্য ও অমানবিকতার কাছে অস্বস্তিকর। তাই দাভোলকারের হত্যাকে শুধু একজন সমাজকর্মীর হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখলে তার গভীর সামাজিক তাৎপর্য সম্পূর্ণ বোঝা যায় না; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যুক্তিবাদী সমাজ গড়ার সংগ্রামের সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
natural sugar in space: ছায়াপথের কেন্দ্রের একটি আণবিক মেঘে প্রথমবারের মতো প্রকৃত মনোস্যাকারাইড ‘এরিথ্রুলোজ’-এর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার জানাচ্ছে, নক্ষত্র ও গ্রহ তৈরির আগেই মহাকাশে জটিল জৈব অণু তৈরি হতে পারে। ফলে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি এবং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে।
দাভোলকারের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানবতাবাদ, কারণ বিজ্ঞান যদি মানুষের জীবনকে উন্নত করার শক্তি হয়, তবে বিজ্ঞানমনস্কতার স্বাভাবিক পরিণতি হওয়া উচিত মানুষের মর্যাদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। জাত, লিঙ্গ, ধর্ম, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদার পার্থক্য তৈরি করা যুক্তিবাদী সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন মানুষের ক্ষুধা বাস্তব, একজন শিশুর অসুস্থতা বাস্তব, শ্রমজীবী মানুষের শ্রম বাস্তব, কৃষকের ঋণ বাস্তব, নারীর উপর সহিংসতা বাস্তব এই বাস্তব সমস্যাগুলির সমাধান বাস্তব জ্ঞান, সামাজিক সংগঠন, ন্যায়বিচার, শিক্ষা এবং মানবিকতার মাধ্যমে করতে হয়, অলৌকিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নয়।
আজ আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ গবেষণা, জিনপ্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে বাস করছি, কিন্তু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিজে থেকেই বিজ্ঞানমনস্কতা সৃষ্টি করে না; একজন মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেও ভুয়ো খবর বিশ্বাস করতে পারেন, সামাজিক মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে মিথ্যা তথ্য লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে, Deepfake, misinformation, pseudoscience এবং algorithmic manipulation নতুন ধরনের বিভ্রান্তি ও অন্ধবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। তাই বর্তমান যুগে বিজ্ঞানমনস্কতার সঙ্গে তথ্য-সচেতনতা ও media literacy-ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে তথ্যের উৎস কী, প্রমাণ কী, তথ্যটি যাচাই করা হয়েছে কি না, কে এটি প্রচার করছে, এর মাধ্যমে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে এবং এর বিকল্প ব্যাখ্যা কী হতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া হয়, তাহলে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ তৈরি করা কঠিন। শিক্ষার্থীদের শুধু সূত্র মুখস্থ করানো নয়, তাদের শেখাতে হবে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, hypothesis তৈরি করতে হয়, evidence সংগ্রহ করতে হয়, experiment করতে হয়, তথ্য যাচাই করতে হয়, ভুল স্বীকার করতে হয় এবং নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে নিজের ধারণা সংশোধন করতে হয়। বিজ্ঞান শিক্ষা তখনই প্রকৃত অর্থে সফল, যখন তা পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানকে জীবনের চিন্তাপদ্ধতিতে রূপান্তরিত করে। একইভাবে বিজ্ঞানীর সামাজিক দায়িত্বও কেবল গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; গবেষণার ফলাফল সমাজে কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, প্রযুক্তি কার হাতে যাচ্ছে, নতুন প্রযুক্তি মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে এসব প্রশ্ন নিয়েও বিজ্ঞানীদের সমাজের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
নরেন্দ্র দাভোলকারকে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় একটি শিশুকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা, একজন অসুস্থ মানুষকে সঠিক চিকিৎসার পথে নিয়ে যাওয়া, কুসংস্কারের নামে নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ভুয়ো তথ্যের বিরুদ্ধে প্রমাণ হাজির করা, অলৌকিকতার দাবিকে পরীক্ষার মুখোমুখি করা এবং অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকা। তাঁর উত্তরাধিকার কোনো ব্যক্তিপূজার মধ্যে নয়, বরং প্রশ্ন করার সংস্কৃতির মধ্যে।
অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো জ্বালাতে একটি প্রদীপ যথেষ্ট হতে পারে, কিন্তু সেই আলোকে সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন ধারাবাহিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক জাগরণ, সামাজিক সংহতি এবং মানুষের মুক্ত চিন্তার প্রতি অবিচল আস্থা। নরেন্দ্র দাভোলকার সেই পথের এক সাহসী পথিক ছিলেন; তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তাঁর অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রশ্ন করা, প্রমাণ চাওয়া, যুক্তি দিয়ে বিচার করা, কুসংস্কার ও প্রতারণার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং এমন একটি সমাজ নির্মাণের জন্য কাজ করা যেখানে মানুষ ভয় নয়, জ্ঞান দিয়ে; অন্ধ আনুগত্য নয়, যুক্তি দিয়ে; বিভাজন নয়, মানবিক সংহতির ভিত্তিতে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।







