'মুঘলদের তথ্যব্যবস্থা আজকের ডিজিটাল যুগকেও চ্যালেঞ্জ জানায়': বিশ্বেন্দু নন্দের সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য

Mughal Akhbarat and Modern Media: উপনিবেশের আগে সংবাদমাধ্যম কেমন ছিল? তখন কীভাবে মানুষের কাছে খবর পৌঁছত? আজকের 'গোদি মিডিয়া'র সময়ে মুঘল আমলের রোজনামচা 'আখবারাত'-কে নতুন গবেষণার আলোয় ফিরে দেখছেন গণঐতিহাসিক বিশ্বেন্দু নন্দ। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য।

Atri Bhattacharya
২০ মিনিট
'মুঘলদের তথ্যব্যবস্থা আজকের ডিজিটাল যুগকেও চ্যালেঞ্জ জানায়': বিশ্বেন্দু নন্দের সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য

সপ্তদশ শতকের মুঘল দরবারে প্রতিদিন ভোরবেলা একটি হাতে-লিখিত বুলেটিন পৌঁছত সম্রাটের কাছে। তাতে থাকত গুজরাটের বাজারে গমের দাম, বাংলার সুবাদারের নিয়োগ-বদলি, দাক্ষিণাত্যের যুদ্ধ অভিযানের অগ্রগতি, এমনকি কোনো শাহজাদার অসুস্থতার খবরও। এই বুলেটিনের নাম ছিল আখবারাত-ই-দরবার-ই-মুআল্লা—মহিমান্বিত দরবারি সংবাদ। আরবি 'আখবার' শব্দের বহুবচন এই আখবারাত ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনের চোখ ও কান, যা প্রায় চারশো বছর আগেই একটি অসাধারণ তথ্য ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছিল।

আমরা যখন আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যের সত্যতা, গতি, স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি, তখন মুঘল আমলের এই আখবারাত ব্যবস্থা আমাদের সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সম্প্রতি ঐতিহাসিক মুনিস ফারুকীর গবেষণা আখবারাতের সেই সুবিশাল আর্কাইভকে নতুন করে উন্মোচিত করেছে, যা প্রমাণ করে—তথ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে তার গণতান্ত্রিকতা বা উন্মুক্ততার উপর নয়, বরং তার নির্ভরযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও শাসন-কেন্দ্রিক উদ্দেশ্যের উপর।

আমাদের এই আলাপচারিতায় আমরা আখবারাতের কাঠামো, কার্যপদ্ধতি, এবং মুঘল রাজশক্তির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কিন্তু আখবারাত শুধু অতীতের ইতিহাস নয়—এর গবেষণা আজকের তথ্যবহুল বিশ্বে আমাদের তিনটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়:

প্রথমত, আখবারাতের মতো অগণতান্ত্রিক, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তথ্য ব্যবস্থা কী ভাবে গণতান্ত্রিক সমাজের তথ্য প্রবাহ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে? আমরা সাধারণত বিশ্বাস করি—উন্মুক্ত, স্বাধীন ও বৈচিত্র্যময় তথ্য প্রবাহ সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু আখবারাত প্রমাণ করে—বহুস্তরীয় যাচাইকরণ, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাও অত্যন্ত নির্ভুল, নিরপেক্ষ ও কার্যকর হতে পারে। আখবারাতের তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা আজকের স্বাধীন গণমাধ্যমের চেয়েও অনেক বেশি নির্ভুল ছিল, যদিও তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। এই চ্যালেঞ্জ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—তথ্য প্রবাহের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত সত্য, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা, যে ব্যবস্থায়ই এটি থাকুক না কেন। আধুনিক গণমাধ্যম স্বাধীনতার নামে প্রায়ই কর্পোরেট স্বার্থ বা জনপ্রিয়তার চাপে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে, অথচ আখবারাতের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করলেও তাঁদের তথ্য সংগ্রহ ছিল নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন। আজকের লাইভ সম্প্রচার ও সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুততা যেমন ভুয়া সংবাদ ও গুজব ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়িয়েছে, তেমনি আখবারাতের ধীর কিন্তু যাচাইকৃত তথ্য প্রমাণ করে—গতির চেয়ে নির্ভুলতা অনেক বেশি মূল্যবান।

দ্বিতীয়ত, ফারুকী যখন বলেন,

আমি যখন তথ্যের ইকোসিস্টেমের কথা ভাবি যা এত সমৃদ্ধ জ্ঞান সংগ্রহ ও স্থানান্তর তৈরি করেছিল, তখন আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই

এই উক্তিটি আজকের ডেটা অর্থনীতির সঙ্গে আখবারাতের গভীর মিল ও পার্থক্য উন্মোচিত করে। আখবারাত যেমন প্রতিদিন দরবার, যুদ্ধ, প্রশাসন, এমনকি আবহাওয়ার খবর পর্যন্ত সংগ্রহ করত, তেমনই আজকের ডেটা ইকোনমি প্রতিটি ক্লিক, লাইক, শেয়ার ও অনুসন্ধানকে ডেটায় রূপান্তরিত করে। মুঘল আমলের চারটি স্তরের সংগ্রহব্যবস্থা—ওয়াকিয়া-নবিস, সওয়ানিহ-নিগার, খুফিয়া-নিগার ও হারকারা—আজকের সোশ্যাল মিডিয়া, সার্চ ইঞ্জিন, ফিনটেক ও গভর্নমেন্ট ডেটাবেসের মতো একাধিক স্তরে তথ্য সংগ্রহ করে। তখন দাফতর-ই-ওয়াকিয়া যেমন কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ করত, আজকের ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই মডেলগুলিও একই কাজ করে। কিন্তু পার্থক্যটি মৌলিক—আখবারাতের লক্ষ্য ছিল শাসন ও সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা, অন্যদিকে আজকের ডেটা অর্থনীতির লক্ষ্য মুনাফা, মনিটরিং ও ভোক্তা আচরণ নিয়ন্ত্রণ। আখবারাতের মালিক ছিল—রাষ্ট্র; আজকের ডেটার মালিকানা কর্পোরেট—গুগল, মেটা, অ্যামাজন ও ডেটাব্রোকাররা। আখবারাত অভিজাত-সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু আজকের ডেটা সর্বজনীন মনে হলেও বাস্তবে তা অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত এবং ব্যবহারকারীরা নিজের ডেটার মালিক নন। আখবারাত স্তম্ভিত করার কারণ হলো—প্রযুক্তি ছাড়াই এই বিশদ তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রক্রিয়াকরণ করত, অথচ আজকের ব্যবস্থা প্রযুক্তির চূড়ায় দাঁড়িয়েও তথ্যের সত্যতা, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আখবারাতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সততা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা আজকের ডেটা ইকোনমিতে অনুপস্থিত—যেখানে তথ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে, অধিকার নয়।

তৃতীয়ত, আখবারাত গবেষণা আজকের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সেন্সরশিপ ও তথ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় কী শিক্ষা প্রদান করে? আমরা সাধারণত মনে করি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা মানেই সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্তি। কিন্তু আখবারাত দেখায়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তথ্য প্রবাহ নির্ভরযোগ্য, নিরপেক্ষ ও পেশাদার হতে পারে—অন্যদিকে আধুনিক গণমাধ্যমে স্বাধীনতা থাকলেও তা কর্পোরেট স্বার্থ, বিজ্ঞাপনদাতার চাপ ও জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় আত্ম-সেন্সরশিপে পরিণত হয়। আখবারাতের বহুস্তরীয় যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সেন্সরশিপের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ছিল, এবং তা নিশ্চিত করত কোনো তথ্য অযাচাই না থাকে। আধুনিক ডিজিটাল যুগে সেন্সরশিপের পরিবর্তে ফ্যাক্ট-চেকিং, ক্রস-ভেরিফিকেশন ও স্বাধীন যাচাইকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি—এটাই আখবারাতের মূল শিক্ষা। তথ্য নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ, কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তা নয়। তথ্য নিয়ন্ত্রণ যদি জনস্বার্থে, নিরপেক্ষভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়, তবে তা সেন্সরশিপ নয়, বরং তথ্যের গুণগত মান রক্ষার উপায় হতে পারে। আখবারাতের নিরপেক্ষতা ব্যক্তিগত সাংবাদিকতার উপর নির্ভর করত না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, নৈতিক কোড, তথ্য যাচাইয়ের বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া—এর উপর নির্ভর করত। আজকের সংবাদমাধ্যমে নিরপেক্ষতা প্রায়ই ব্যক্তির উপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যা পক্ষপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। আখবারাত তথ্যকে পণ্য হিসেবে দেখত না, বরং শাসনের হাতিয়ার হিসেবে দেখত; অথচ আধুনিক সংবাদমাধ্যম তথ্যকে পণ্য হিসেবে দেখে, যা মুনাফার উদ্দেশ্যে তৈরি ও বিক্রি হয়। আখবারাতের শিক্ষা হলো—তথ্য জনসেবা ও গণতন্ত্রের ভিত্তি, পণ্য নয়।

মুঘল আমলের এই আখবারাত ব্যবস্থা ছিল সুলহ-ই-কুল—বহুত্ববাদী দর্শনের প্রতিফলন, যা ধর্ম-জাতি-ভাষার ঊর্ধ্বে সমাজের ঐক্য সাধন করত। আখবারাতের তথ্য সমাজ বিভাজনের হাতিয়ার ছিল না—ছিল শাসনের সহায়ক, সমাজের আয়না। পশ্চিমা আউসবার্গ (১৫৫৫) ও ওয়েস্টফালিয়া (১৬৪৮) চুক্তি যেমন 'আমরা ও ওরা' বিভাজন তৈরি করেছিল, তেমনি আখবারাত সব সম্প্রদায়ের খবর সমানভাবে রেকর্ড করে ঐক্য বজায় রাখত। আজকের প্ল্যাটফর্ম পুঁজিপতিরা তথ্য দিয়ে জনগণকে দমন-নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহার করছে, অথচ আখবারাতের তথ্য-দর্শন এই বিভাজন প্রত্যাখ্যান করে—এবং আজকের তথ্যযুদ্ধে আমাদের একমাত্র পথনির্দেশক হতে পারে।

এই আলাপচারিতায় আমরা আখবারাতের কাঠামো, কার্যপদ্ধতি, ওয়াকিলদের ভূমিকা, ডাকচৌকি নেটওয়ার্ক, গোপন তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা এবং শাহজাদাদের নজরদারিতে আখবারাতের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। মুনিস ফারুকীর সাম্প্রতিক গবেষণা আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতি, মন্দির ধ্বংস, শিখ-মুঘল সম্পর্ক এবং জিনাত-উন-নিসার মতো হারেমের নারীদের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আমরা দেখেছি, কী ভাবে যদুনাথ সরকারের গবেষণা থেকে ফারুকী ভিন্ন পথে হেঁটেছেন—যদুনাথ যেমন আওরঙ্গজেবের গোঁড়ামিকে পতনের কারণ হিসেবে দেখেছেন, ফারুকী তাঁকে বাস্তববাদী সম্রাট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যিনি ইসলামি নীতিকে শাসন ও সাম্রাজ্য পরিচালনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। আরও দেখেছি— জয়পুরের আখবারাত সংগ্রহে জেমস টডের ভূমিকা, বারকত আলি নথি সংগ্রহ হারানোর প্রেক্ষাপট এবং কী ভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণের ব্যর্থতা আমাদের মূল্যবান ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করছে।

আখবারাত ছিল একটি জীবন্ত তথ্য ইকোসিস্টেম—যার প্রতিটি স্তর, প্রতিটি কর্মকর্তা, প্রতিটি ডাকচৌকি, প্রতিটি রানার মিলে গড়ে তুলেছিল এক অসাধারণ তথ্য জাল। এই জাল নিশ্চিত করত—কাবুল থেকে বাংলা, কাশ্মীর থেকে দাক্ষিণ—১৫ কোটি মানুষের বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতি কোণার খবর সম্রাটের কাছে পৌঁছয়। আওরঙ্গজেব বারবার পুত্রদের সতর্ক করেছেন, তথ্য সংগ্রহের শিথিলতা মুঘল শাসনকে বিপন্ন করবে। ১৬৯৯ সালে আওরঙ্গজেবের আখবারাত নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে—মুঘল সাম্রাজ্য তার নিজস্ব তথ্য ব্যবস্থার উপর এতটাই নির্ভরশীল ছিল যে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সাম্রাজ্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ত। এই কাঠামোর দুর্বল হয়ে পড়াই ছিল সাম্রাজ্যের পতনের দিকে এক পা এগোনো—পরের অযোগ্য শাসকদের জন্য বিপদের সংকেত।

আজকের তথ্যবহুল বিশ্বে—যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম ও ফিল্টার বাবল মানুষকে নির্ধারিত তথ্য দেয়, যেখানে ডিপফেক ও ভুয়ো সংবাদ সত্যকে গ্রাস করে, যেখানে ডেটা পণ্যে পরিণত হয়েছে—আখবারাত আমাদের সেই কালের কথা মনে করিয়ে দেয় যখন তথ্য ছিল শাসনের ভিত্তি, জনস্বার্থের হাতিয়ার এবং সমাজের আয়না। ফারুকী যেমন বলেছেন, আখবারাত পড়ার অভিজ্ঞতা বারবার 'ইউরেকা' বলে ওঠার মতো—সে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে, ক্রনিকলের মতো নির্দিষ্ট এজেন্ডা পুশ করে না।

গণঐতিহাসিক বিশ্বেন্দু নন্দের সঙ্গে অত্রি ভট্টাচার্যের এই আলোচনার মূল বক্তব্য হলো—কোনো তথ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু উন্নত প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে না। বরং তার উদ্দেশ্য কী, কতটা স্বচ্ছভাবে কাজ করে এবং মানুষের কাছে কতটা জবাবদিহি করে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মুঘল আমলের 'আখবারাত' দেখায়, একটি তথ্যব্যবস্থা যেমন শাসনকে শক্তিশালী করতে পারে, তেমনই সঠিকভাবে পরিচালিত হলে গণতন্ত্রকেও আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। আখবারাতের এই শিক্ষা আজকের ডেটা ইকোনমি, সংবাদমাধ্যম ও তথ্য নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রণেতাদের জন্য অমূল্য পাথেয়। মুঘল আমলের সেই হাতে-লিখিত বুলেটিন হয়তো আজ আর নেই, কিন্তু তার উত্তরাধিকার—তথ্যের প্রতি শ্রদ্ধা, সত্যের প্রতি অনুরাগ, এবং নিরপেক্ষতার প্রতি অঙ্গীকার—আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে।

আমরা যখন আখবারাতের মতো বিস্ময়কর তথ্য ব্যবস্থার কথা ভাবি, ফারুকীর সেই কথাই বারবার মনে পড়ে,

এত সমৃদ্ধ জ্ঞান সংগ্রহ ও তথ্য ইকোসিস্টেমের কথা ভাবলেই স্তম্ভিত হয়ে যাই।

সত্যিই, প্রায় চারশো বছর আগের এই ব্যবস্থা আজকের ডিজিটাল যুগকেও চ্যালেঞ্জ জানায়। আর এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করেই আমরা আমাদের বর্তমান তথ্য সংকটের সমাধানের পথ খুঁজে পেতে পারি—আখবারাতের কালজয়ী শিক্ষা আমাদের সেই পথে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

অত্রি ভট্টাচার্য: আখবারাত কী? কেন আখবারাত মুঘল শাসন ব্যবস্থায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে?

বিশ্বেন্দু নন্দ: আখবারাত (আরবি- اخبارات, অর্থ—সংবাদসমূহ) আখবারাত-ই-দরবার-ই-মুআল্লা—দরবারি সংবাদ। ফারসি ভাষায় মুঘল সাম্রাজ্যের দরবারি দৈনিক সংবাদ বুলেটিন। এতে সম্রাটের দৈনন্দিন কাজকর্ম, রাজকীয় আদেশ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সামরিক অভিযান, রাজস্ব আদায়, বাজারের দাম, এমনকি শাহজাদা, খানজাদা, আমলাদের ব্যক্তিগত কার্যকলাপ পর্যন্ত নথিবদ্ধ করা হতো। ওয়াকিয়া-নবিস, সওয়ানিহ-নিগার, হরকরাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে ডাক চৌকি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কেন্দ্রিয় দরবারে পাঠানো হতো। এটিই ছিল মুঘল শাসনের চোখ ও কান, যা সাম্রাজ্যের বহুত্ববাদী কাঠামোকে সুসংহত রাখত।

ফারসিতে আখবারাত এর অর্থ—সংবাদ, দরবার—রাজসভা আর মুয়াল্লা অর্থে মহিমান্বিত/ উচ্চ/ সম্মানিত। সার্বিকভাবে মহিমান্বিত দরবারি সংবাদ। গণজনের ভাষায় আখবারাত। আখবার শব্দের অর্থ সংবাদ, আখবারাত বহুবচন। আখবারাত মুঘল সাম্রাজ্যের অত্যন্ত উন্নত, জটিল ব্যবস্থাপনা সমৃদ্ধ হাতে-লেখা দৈনিক সংবাদ বুলেটিন ব্যবস্থা। মুঘল আমলের সরকারি তথ্য ভাণ্ডার। দরবারের ঘটমান বর্তমান—সম্রাটের আদেশ, কর্মকর্তাদের নিয়োগ-বদলি, যুদ্ধের খবর, রাজপরিবারের কার্যকলাপ, এমনকি বাজারের দাম—সব কিছু রেকর্ড হতো। আখবারাত ব্যবস্থায় সম্রাট বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতি কোণার খবর রাখতেন, আমলা-শাহজাদা এবং আরও অনেকের কার্যকলাপে নজর রাখতেন। আখবারাত শুধু খবরের কাগজ নয়, শাসনের চোখ আর কানও। আখবারাতের বড় অংশ কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি ছাড়াও লন্ডনের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি এবং রাজস্থান স্টেট আর্কাইভস-এ আছে। এসবের অনেকগুলির ডিজিটাল কপিও পাওয়া যায়।

রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনায় নিযুক্ত নানান নাটবল্টুর মধ্যে আখবারাত অন্যতম প্রধান। আওরঙ্গজেব বারবার পুত্রদের সতর্ক করেছেন তথ্য সংগ্রহে শিথিলতা মুঘল শাসনকে বিপন্ন করবে। মুঘল আমল প্রথম যুগের সেই শাসন কাঠামো, যারা শাসন পরিচালনায় আনফিল্টার্ড তথ্যের গুরুত্ব বুঝেছে। তাঁর আমলে মুঘল সাম্রাজ্য বিশ্বের সব থেকে বড় সাম্রাজ্য (কাবুল থেকে বাংলা, কাশ্মীর থেকে দাক্ষিণ), সব থেকে বড় অর্থনীতি হয়ে ওঠায় আওরঙ্গজেবকে সেই কাঠামো জোরদার করতে হয়েছিল। ১৫ কোটি মানুষের বিশাল সাম্রাজ্য আর অর্থনীতির প্রতি কোণার খবর সম্রাটের কাছে পৌঁছানোর বড় মাধ্যম ছিল আখবারাত। আখবারাতকে দূরবীন বানিয়ে রাষ্ট্র নিযুক্ত আমলা-কর্মচারীর কাজকর্ম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন—বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের বীজ সমূলে উচ্ছেদ করতেন।

অ: মুনিস ফারুকী সদ্য প্রকাশিত আওরঙ্গজেব বইতে কেন বলেছেন আখবারাত লেখার সময় কোনো তথ্যই তুচ্ছ জ্ঞান করা হতো না, (ফলে সাম্রাজ্যের কেন্দ্র বা প্রদেশ প্রশাসনে–সুবায়) ঘটমান বর্তমান প্রত্যেকটি সংবাদ বুলেটিনে লেখা হতো?

বি: মুঘল প্রশাসন বিশ্বাস করত কোনো ঘটনাই সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য অপ্রাসঙ্গিক নয়।

আখয়াবারাতে থাকত—মূলত সম্রাটের দৈনন্দিন রুটিন, আদেশ, কর্মকর্তাদের নিয়োগ-বদলি, রাজস্ব আদায়, বিচার-কাঠামোর নেওয়া সিদ্ধান্ত—সবকিছুর বিবরণ। সামরিক তথ্য—যুদ্ধ অভিযানের অগ্রগতি, অবরোধ, সেনাপতিদের কার্যকলাপ, শত্রুপক্ষের গতিবিধি। অর্থনৈতিক তথ্য যেমন বাজারের দাম, বাণিজ্যের অবস্থা, মুদ্রার মান, বিভিন্ন কর সংক্রান্ত তথ্য। সামাজিক ঘটনা—গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ, রাজকীয় অনুষ্ঠান, এমনকি সাধারণ মানুষের অভিযোগ। এমন কি অপ্রত্যাশিত ঘটনাও লেখা হতো।

আখবারাত ছিল দৈনিক সংবাদ বুলেটিন, মুঘল দরবারের প্রতিদিনের কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত বিবরণী। বুলেটিনে সাধারণত ২০টির বেশি সংবাদ আইটেম থাকত না; মূলত এক বা দুই পৃষ্ঠার প্রতিবেদন থাকত। ফারুকী বলছেন তুচ্ছ ঘটনাও রেকর্ড হতো। তার কারণ—মুঘল প্রশাসন মানত, সাম্রাজ্যের প্রতিটি স্তরের অসম্পাদিত খবর রাখাই শাসনের ভিত্তি তৈরি করে। এই বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহজাল নিশ্চিত করত সম্রাট কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটমান-বর্তমান সম্পর্কে অজ্ঞাত না থাকেন। আখবারাতের এই বহুমাত্রিক তথ্যই মুঘল শাসনকে কার্যকর ও স্থিতিশীল রাখত। যেমন গুজরাটের এক আমলা নিরীহ ভিক্ষুদের শিরশ্ছেদ করে দাবি করেন মারাঠা সেনার মাথা কেটেছেন অথবা কচ্ছে পাগলা সিংহ মানুষ আর পশু হত্যা করছে—এসব সংবাদও প্রবাহিত হতো দরবারে।

অ: আখবারাতের কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি কী ছিল?

বি: দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যে ইতিহাস বলতে বোঝায়—'ইতি-হ-আস', অর্থাৎ 'এভাবেই ঘটেছিল'। পরে সুলতানি, মুঘল ও নবাবি আমলে এই ধারাকেই কিছুটা অনুসরণ করে সমসাময়িক ঘটনাগুলিও নিয়মিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হতো। মুঘল সাম্রাজ্যে পরিকল্পিতভাবে সংবাদ সংগ্রহের জাল প্রথম তৈরি করেন সম্রাট আকবর। সম্রাটকে আবুলফজল বলেছিলেন, সব শহর-নগরের ঘটনার দৈনিক জার্নাল সংগ্রহ করা দরকার। সাম্রাজ্য পরিচালনার আমলাতন্ত্রে বারো সুবায়, সুবাদার, দেওয়ান, বখশি, বিচারকের সঙ্গে ওয়াকিয়া-নিগার নিয়োগ করা হয়। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আখবারাত নেটওয়ার্ককে আরও জোরদার করলেন সম্রাটেরা যাতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি প্রান্তের চার-স্তরের তথ্য সংবাদ সংগ্রহ-প্রক্রিয়াকরণ করে দরবারে পৌঁছয়। আখবারাত ব্যবস্থার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল, কেন্দ্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ।

এই থাকবন্দীর মাথায় থাকতেন তিন আমলা—ওয়াকিয়া-নিগার আর ওয়াকিয়া-নবিস আর দারোগা-ই-ডাক। ওয়াকিয়া-নিগারের (ওয়াকিয়া অর্থ—সংবাদ, নিগার অর্থ—সুন্দর) মুঘল আখবারাত ব্যবস্থার প্রাণপুরুষ। তাঁর কাজ ছিল, সাম্রাজ্যের প্রদেশ আর জেলার ঘটনার উপযুক্ত ও নিরপেক্ষ বিবরণ রেকর্ড করা। ওয়াকিয়া-নবিস (ওয়াকিয়া অর্থ—সংবাদ, নবিশ অর্থ—লিপিকার) মুঘল সাম্রাজ্যের তথ্য সংগ্রহের দ্বিতীয় স্তরের কর্মকর্তা, মূলত ওয়াকিয়া-নিগারদের সহায়ক। আর ছিলেন স্থানীয় দারোগা-ই-ডাক (দারোগা-তত্ত্বাবধায়ক ডাক-সংবাদ আদান-প্রদান)। বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতেন, তথ্যের সত্যতা যাচাই করতেন, গুরুত্ব ও সময়ানুক্রমিকতার ভিত্তিতে তথ্য সাজিয়ে সংক্ষিপ্ত বুলেটিন প্রস্তুত করতেন। প্রতি বুলেটিনে সাধারণত ২০-৩০টি সংবাদ আইটেম থাকত। সুবাস্তরের তিন আমলার নেতৃত্বে এই সংবাদ নিয়মিত দরবারে পৌঁছত।

অ: ফারুকী আখবারাতকে ঐতিহাসিক ক্রনিকল থেকে কেন আলাদা করেছেন? আখবারাতের বস্তুনিষ্ঠতা বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

বি: মুনিস ফারুকী স্বাভাবিকভাবে আখবারাতকে ঐতিহাসিক ক্রনিকল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে একে বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন বলেছেন। কারণ, আখবারাতে সম্পাদকীয় মত বা পক্ষপাত ছিল না। ঐতিহাসিক ক্রনিকল রচনা হতো অনেক বছর পর; সেসবে লেখকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, রাজদরবারের আনুগত্য বা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেত। আখবারাতের শক্তি সমসাময়িকতা, নিরপেক্ষতা।

ফারুকী বস্তুনিষ্ঠতা বলতে বোঝান, তথ্যের নিরপেক্ষ ও সম্পূর্ণ নথিকরণ—যেখানে কোনো ঘটনাই গুরুত্বহীন মনে করে বাদ দেওয়া হতো না, আবার কোনো ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করেও উপস্থাপন করা হতো না। বস্তুনিষ্ঠতাই আখবারাতকে ঐতিহাসিকদের জন্য অমূল্য সম্পদ ও সামাজিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের স্বর্ণখনি করে তুলেছে। ফারুকী বলছেন, আখবারাত পড়ার অভিজ্ঞতা বারবার ইউরেকা বলে ওঠার মতো—সে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে, চালু ক্রনিকলের মতো নির্দিষ্ট এজেন্ডা পুশ করে না।

অনেক ঐতিহাসিক মিথ-মিথ্যা নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছে আখবারাতজাত তথ্য—তার একটিই উদাহরণ দেওয়া গেল এখানে। যদুনাথ সরকার DESPATCHES AND REPORTS IN INDIAN HISTORY প্রবন্ধে বলছেন, রাজস্থানের অম্বরের মুঘল সেনাপতি মির্জা, রাজা জয় সিংয়ের মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত জনশ্রুতি ছিল তাঁকে দ্বিতীয় পুত্র কিরাত সিং বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন। প্রবল এই প্রচারের ধাক্কায় কাছোয়া রাজপুত অভিজাতরা কিরাত সিংয়ে বংশধরদের জয়পুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে দত্তক নিতেন না। এই মিথ-মিথ্যে টড এনালসে ব্যবহার করায় এর গুরুত্ব আরও বাড়ে। যদুনাথ জয়পুরের আখবার ১৯৪০-সালে অনুবাদ করছিলেন। তিনি উক্ত প্রবন্ধে লিখলেন (দরবার সংবাদ ২২তম জমাদি-উল-আউয়াল, রাজত্বের ১০ম বর্ষ; ৩০ অক্টোবর),

১৬৬৭ সালের আখবারের যদুনাথের অনুবাদ তুলে দিলাম, সম্রাট (আওরঙ্গজেব) প্রয়াত মির্জা রাজা জয় সিংয়ের পুত্র কিরাত সিং-কে জিজ্ঞেস করলেন, "প্রয়াত রাজা কী ভাবে পায়ে আঘাত পেলেন?" তিনি উত্তর দিলেন, "একদিন হাতির পিঠে ওঠার সময় মইয়ের নিচের অংশ ঠিকমতো বসানো ছিল না, রাজার পায়ে চোট লাগে। সেই দিন থেকেই তাঁর অসুস্থতা শুরু হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি মারা যান।

এই তথ্য তিনি অন্য আখবারাত সূত্রেও যাচাই করেছেন। দরবার সংবাদ ২৭তম রবি-উল-আউয়াল, রাজত্বের ১০ম বর্ষ; ৬ সেপ্টেম্বর, ১৬৬৭ সালে আকিল খান সম্রাটকে জানালেন,

ইসফান্দিয়ার বেগ—যাঁকে মির্জা রাজা জয় সিংকে লাহোরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল—তিনি আমাকে চিঠিতে জানিয়েছেন, মির্জা রাজা বুরহানপুর থেকে রাজদরবারের উদ্দেশ্যে রওনা হলে তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে যান, পায়ে গুরুতর আঘাত পান এবং বুরহানপুর যাওয়ার পথেই মৃত্যুবরণ করেন।

সম্রাট মন্তব্য করলেন,

তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের দক্ষ কর্মকর্তা, অত্যন্ত বিশ্বস্ত রাজা (রাজা-ই-উমদা-ই-ইতিকাদ)।

অ: সওয়ানিহ-নবিস, খুফিয়া-নিগার, হরকরা, ডাকচৌকি নিয়ে একটু বিস্তারে বলুন। মুঘল সাম্রাজ্যের গোপন তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা ছিল তিন স্তরের—সওয়ানিহ-নবিস, খুফিয়া-নিগার আর হরকরা। প্রকাশ্য সংবাদ সংগ্রহকারীদের (ওয়াকিয়া-নবিস) পরিচিতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই এই ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। ওয়াকিয়া-নবিসরা দরবারের পরিচিত মুখ, স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের যোগসাজশ ও ভুল তথ্য দেওয়ার সম্ভাবনা থাকত। সমস্যা সমাধানে চালু হলো, সওয়ানিহ-নবিস—গোপন সংবাদ সংগ্রহক—সম্রাট নিযুক্ত প্রথম স্তরের গোপন সংবাদ সংগ্রহকর্মী। তাঁর পরিচয় যেহেতু অজানা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে জবাবদিহি চাইতে পারত না, বা চাপ দিয়ে ভুল খবর পাঠানোর কাজও করতে পারত না। তিনি প্রতিবেদন সরাসরি সম্রাটের কাছে পাঠাতেন, সুবেদারদের সে সব দেখার অধিকার ছিল না। মিরাট-ই-আহমদিতে বলা হয়েছে, পূর্ব শাসনামলে ওয়াকিয়া-নবিস নিযুক্ত ছিলেন প্রাদেশিক ঘটনা প্রতিবেদনের জন্য; কিন্তু স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের যোগসাজশের সন্দেহে, সওয়ানিহ-নিগার নিযুক্ত হন যারা গোপনে সুবায় অবস্থান করতেন এবং সংবাদ প্রতিবেদন করতেন।

আর ছিলেন অতি গোপন লেখক খুফিয়া-নিগার। খুফিয়া-নিগার ছিলেন তৃতীয়, সর্বোচ্চ গোপন স্তর। তাঁরাও সম্রাটের কাছে প্রতিবেদন পাঠাতেন এবং অতি সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করতেন। সওয়ানিহ-নবিসদের উপরও তাঁদের নজরদারি ছিল। তাঁদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কেউ জানত না, এবং তাঁদের প্রতিবেদন সরাসরি দাফতর-ই-ওয়াকিয়াতে জমা হতো।

হরকরারা মৌখিক গোয়েন্দা সংবাদ বহনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতেন—ওয়াকিয়া-নবিসদের লেখা আখবারাত থেকে আলাদা কিসিমের, তাঁদের কাজ স্মৃতিতে সংবাদ বহন করা—সাদা ভাষায় কুরিয়ার—প্রকৃতপক্ষে গুপ্তচর—মূলত অমুসলিম, আদিবাসী বা নিম্নবর্ণের মানুষ যাঁদের দুর্গম অঞ্চল, পাহাড়-জঙ্গল ও নদীপথ গমনে বিশেষ দক্ষতা ছিল; আর ছদ্মবেশে তাঁরা শত্রুপক্ষের সেনাবাহিনীতেও অনুপ্রবেশ করতেন।

গোপন তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার প্রধান প্রয়োজনীয়তা ছিল তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণ। ওয়াকিয়া-নবিসদের প্রতিবেদনে ভুল থাকলে, গোপন এজেন্টদের প্রতিবেদনে যাচাই করা যেত। আওরঙ্গজেব এই ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন—তিনি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বাড়ান, ডাক চৌকি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত করেন এবং সংবাদ সংগ্রহকারীদের আরও ভালো প্রশিক্ষণ দেন। এই চার স্তরের ব্যবস্থাই নিশ্চিত করত—সম্রাটের কাছে উপযুক্ত, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী তথ্য পৌঁছয়।

অ: এই ডাকচৌকি নেটওয়ার্ক সম্বন্ধে আরও কিছু বলুন।

বি: প্রতিদিনের বুলেটিন ডাক চৌকি নেটওয়ার্ক নির্ভর করে দিল্লি/ আগরায় পৌঁছত। দারোগা-ই-কুল মুমালিক-ই-মাহরুসা, কেন্দ্রীয় ডাক বিভাগ প্রধান শাহী দরবারে দায়বদ্ধ থেকে সাম্রাজ্যের ডাক ব্যবস্থার তত্ত্বাবধান করতেন। প্রতি প্রদেশে দারোগা-ই-ডাক কেন্দ্রীয় দারোগার সুপারিশে নিযুক্ত হয়ে ডাক চৌকি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। মুঘল সাম্রাজ্যের গুজরাটের প্রধান ডাক চৌকিগুলির উদাহরণ পাই মীরাত-ই-আহমদিতে—কালি, অডালজ, জোর্নাং, মেহসানা, ভান্ডু, উন্ঝা, সিদ্ধপুর, বিস্লাউ, হালদি, পালানপুর শহর, ভুতারু, দান্তিওয়ারা, খানসোওয়ারাই পানটিওয়ারা, বান্ত, বাধকনাম, ডংরি, কুডি, ভিলমাল সুন্ত, তূর্ণা, মুদ্রা, জলুর, দেবাদাস, ভুরানি, এবং খানদাবে। গোলকুন্ডা আওরঙ্গজেবের নতুন রাজধানী হলে সুরাট থেকে আহমদনগর পর্যন্ত ডাক চৌকির নতুন লাইন সংগঠিত করেন।

রানার বা মেওরারা ছিলেন ডাক চৌকি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ—এরা ছিলেন পেশাদার দৌড়বিদ—এক ডাক চৌকি থেকে পরের চৌকি পর্যন্ত দিনে প্রায় ৪০-৫০ মাইল (৬৫-৮০ কিলোমিটার) দৌড়াতেন; দুর্গম পথ, জঙ্গল ও নদী পাড়ি দিতে দক্ষ ছিলেন; স্থানীয় ভাষা ও ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছিল। মেওরা বা রানাররা মূলত অমুসলিম পটভূমি থেকে আসতেন এবং দ্রুতগতি, সহনশীলতার জন্য তাদের নির্বাচন করা হতো। সমান্তরাল পরিবহন নেটওয়ার্কে তারা সংবেদনশীল তথ্য পাঠাতেন।

গুরুত্বপূর্ণ বা জরুরি সংবাদের জন্য ঘোড়সওয়ার ব্যবহার করা হতো। প্রতিটি ডাক চৌকির ঘোড়া এক দিনে ১০০-১৫০ মাইল (১৬০-২৪০ কিলোমিটার) অতিক্রম করে সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য বহন করতেন—দিল্লি-আগ্রার ১২০ মাইল ১২-১৫ ঘণ্টায়; দিল্লি-অম্বর ১৬০ মাইল-১৮-২০ ঘণ্টায়; দিল্লি-সুরাট-৬৫০ মাইল ৩-৪ দিনে; দিল্লি-বাংলা ১,০০০ মাইল ৭-১০ দিনে; দিল্লি-দাক্ষিণ ১,২০০ মাইল-১০-১২ দিনে। মীরাত-ই-আহমদি বলছে, বার্তাবাহকরা প্রতি ঘড়িতে (২৪ মিনিট) এক কোস (প্রায় ৩.৮১ কিমি) অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় ৯০ কিমি বা ৫৬ মাইল পথ অতিক্রম করে। মেওরা (বার্তাবাহক) এবং ডাক চৌকির অন্য কর্মচারীকে নির্দেশ দেওয়া হতো, তারা যেন কৃষক ও গ্রামবাসীদের কাজে হস্তক্ষেপ না করে, এবং কেবলমাত্র রাজকীয় চিঠি ও আদেশ বহন করেন। আখবারাত নিশ্চিত করত, সাম্রাজ্যের প্রতিটি ঘটনা উপযুক্ত, নিরপেক্ষ ও সময়মতো সম্রাটের কাছে পৌঁছয়। ডাকচৌকি নিয়ে অনেকটাই বিস্তারিত বিবরণ লিখেছেন তাভার্নিয়ের সূত্রে আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতির জীবন অবলম্বনে লাইফ অব মীরজুমলা—জেনারেল অব আওরঙ্গজেব—বইতে ঐতিহাসিক জগদীশ নারায়ণ সরকার। কর্নাটক বিজয়ের পর তথ্য প্রেরণের সুবিধার্থে মীর জুমলা হায়দ্রাবাদ থেকে কর্নাটক পর্যন্ত ডাক চৌকি স্থাপন করেন। ডাক চৌকিগুলির গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ছিল, বেতওয়া, বেরেজারি, কানিজ, মাহমুদাবাদ শহর, আন্ধাজ, সেলুদ, নাদিয়াদ শহর, বোরিয়াভি, হাদগুদ, বাসাদ, রাশোলি, বরোদা শহর, ধনিয়াভি, কারভান, চোরান্দা, কারমালি, এবং ব্রোচ। ডাক চৌকিতে মোট মাসিক বেতন ছিল ১০৮ টাকা। এই টাকায় আওরঙ্গজেব ২৫ জন কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। ট্যাভার্নিয়ে লিখছেন, গান্ডিকোটায় মীর জুমলা তাঁকে বলেন তিনি গোলকুন্ডায় তাঁর পুত্রের জন্য চিঠি লিখবেন, এবং ‘তাঁর চিঠি আমাদের অনেক আগেই সেখানে (গোলকুন্ডায়) পৌঁছবে’। প্রতি দুই লিগ, প্রায় ১০ কিমি অন্তর ছোট ছোট কুটিরে রানাররা তৈরি থাকতেন। তাঁরা চিঠি হাতে নিতেন না; চিঠি রানারের পায়ের কাছে ছুঁড়ে দেওয়া হতো, তিনি তা কুড়িয়ে নিতেন। তাভার্নিয়ে আরও বলছেন অধিকাংশ হাইওয়েতে গাছের সারি ছিল, প্রতি পাঁচশো গজ পরপর পাথরের স্তূপ ছিল যা গ্রামবাসীরা নিয়মিত সাদা রং করত, যাতে বার্তাবাহকরা অন্ধকারে বা বৃষ্টির রাতে পথ না হারান।

অ: আখবারাত কী ভাবে রাজশক্তি ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করত? সর্বজ্ঞ সম্রাটের ভাবমূর্তি তৈরিতে এর ভূমিকা কী ছিল?

বি: আখবারাত ছিল মুঘল সম্রাটের নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার এবং এর মাধ্যমে সম্রাট—দরবারের ঘটনা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কর্মকর্তাদের কার্যকলাপ পর্যন্ত—সাম্রাজ্যের প্রতিটি স্তরের খবর রাখতেন। শাহাজাদাদের উপর নজরদারিও করতেন; আওরঙ্গজেব পুত্রদের দৈনন্দিন রুটিন, স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পর্কেও জানতেন। অনিয়ম বা ষড়যন্ত্রের খবর দ্রুত সম্রাটের কাছে পৌঁছত। ফলে আখবারাত সর্বজ্ঞ সম্রাটের ভাবমূর্তিও তৈরি করত। ইংরেজ রাষ্ট্রদূত স্যার উইলিয়াম নরিস বলেছিলেন, পুরনো বাদশাহ খুব চতুর এবং তিনি গুপ্তচর রাখেন... কেউ এমন কোনো কথা বলতে পারে না যা তিনি জানেন না। এই ভাবমূর্তি বিরোধীদের নিরুৎসাহিত করত এবং আমলাদের সতর্ক রাখত। আওরঙ্গজেবের মতে, তথ্য সংগ্রহ শাসনের প্রধান স্তম্ভ—তিনি পুত্রদের সতর্ক করতেন এই বলে, একদিন তথ্য সংগ্রহের শিথিলতা মুঘল শাসনকে বিপন্ন করবে। আখবারাতের মাধ্যমেই সম্রাট তাঁর সর্বব্যাপী নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতেন, যা সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি ছিল।

অ: ১৬৯৯ সালে আওরঙ্গজেবের আখবারাত নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হয়েছিল? এই ব্যর্থতা কী নির্দেশ করে?

বি: আখবারাত ব্যবস্থা মুঘল প্রশাসনের এতটাই গভীরে প্রোথিত ছিল যে তা সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। বিপুল সংখ্যক গোপন এজেন্ট (সওয়ানিহ-নিগার, খুফিয়া-নিগার, হরকরা) সম্রাটের নির্দেশ উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যান। অভিজাত, শাহাজাদারা আখবারাতের উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিলেন—নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের তথ্য পেতে আখবারাত ব্যবহার করতেন, তাই তাঁরা এর বন্ধের বিরোধিতা করেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্তরে আখবারাতের প্রয়োজনীয়তা এতটাই অপরিহার্য ছিল যে তা বন্ধ করা অসম্ভব ছিল। এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে মুঘল সাম্রাজ্য তার নিজস্ব তথ্য ব্যবস্থার উপর এতটাই নির্ভরশীল ছিল যে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে সাম্রাজ্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ত। আওরঙ্গজেবের কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতা এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়। এই কাঠামোর দুর্বল হয়ে পড়া অর্থাৎ সম্রাট নিজের তৈরি বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলাই ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের দিকে এক পা এগোনো—পরের অযোগ্য শাসকদের জন্য বিপদের সংকেত।

অ: শাহাজাদাদের উপর নজরদারিতে আখবারাতের ভূমিকা এবং ফারুকীর দেওয়া নতুন তথ্য গুলি কী কী?

বি: চেঙ্গিজি-তৈমুরী গুরখানি (জামাই) বংশের উত্তরাধিকারী শাহজাদারা সিংহাসন দখলে লক্ষ্যে লড়াই করতেন। ফারুকী আখবারাত সূত্রে দেখিয়েছেন আওরঙ্গজেব পুত্রদের দরবার থেকে দূরে রাখলেও নিয়মিত নজরদারি চালাতেন। তিনি বলছেন আখবারাত শুধু শাহাজাদাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপই নয়, ব্যক্তিগত জীবনও রেকর্ড রাখত—রুটিন, অভ্যাস, স্বাস্থ্য, পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব—সবকিছু। আখবারাত ব্যবহার করে দ্বিতীয় পুত্র মির্জা মুহাম্মদ মুআজ্জমের দাক্ষিণাত্য রাজনীতি আগ্রহ, আযমের উচ্চাভিলাষ, শিয়া ইসলামে আকর্ষণ, কাম বখশের কার্যকলাপের তথ্য পেতেন। মুনিস বলছেন, আখবারাতের মতো সাম্রাজ্য থাকবন্দীর নাটবল্টু মুঘল সাম্রাজ্যের চলন বুঝতে যাহায্য করে। ফারুকী দেখেছেন, আখবারাত কাঠামো ব্যবহার করে রাজশক্তি শুধু তার প্রান্তই নিয়ন্ত্রণ করত না, শাহাজাদারা এই কাঠামো ব্যবহার করত আগামী দিনে চূড়ান্ত সিংহাসন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে নিজেদের এবং স্বাভাবিকভাবে সাম্রাজ্যের শক্তি বিস্তৃত করতে—নেটওয়ার্ক অফ ফ্রেন্ডস অ্যান্ড অ্যালাইসের মাধ্যমে। মুনিস ফারুকী তাঁর প্রথম বই, প্রিন্সেস অব মুঘল এম্পায়ারে একটা ইন্টারেস্টিং ফ্যালাসি বলছেন, সুবায় শাহজাদাদের ক্ষমতা বাড়লে কেন্দ্রও জোরদার হয়—সে অর্জিত বিপুল ক্ষমতা নিয়ে অন্য সুবায় শাসক ভাইদের আর কেন্দ্রে বাবাকে চ্যালেঞ্জ জানাত এবং সেই ক্ষমতা বলে সম্রাট হতো।

অ: ওয়াকিলরা আখবারাত ব্যবস্থায় কী ভূমিকা পালন করতেন? কেন একই দিনের দুটি ভিন্ন আখবারাত লেখার ঘটনা ঘটত?

বি: ওয়াকিল-উকিল-প্রতিনিধিরা আখবারাত ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কলকব্জা। আঞ্চলিক অভিজাতদের হয়ে দরবারে নিযুক্ত ওয়াকিল আখবারাতের কপি সংগ্রহ করে মনিবদের পাঠাতেন। তাঁদের অন্যতম প্রধান কাজ—দরবারের প্রতিদিনের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ; গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ; ক্ষমতাকেন্দ্রের স্বার্থ রক্ষা; প্রতিদ্বন্দ্বীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ। ওয়াকিলরা শুধু মনিবদের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতেন না, তারা সম্রাটের কাছেও তথ্য পাঠাতেন—ফলে তাঁরা ছিলেন দ্বিমুখী তথ্য প্রবাহের মাধ্যম।

কখনও কখনও একই দিনের ভিন্ন সূত্র থেকে আলাদা আখবারাত আসত। অভিজাতরা একাধিক উৎস থেকে তথ্য যাচাই করতেন–একাধিক উৎস থেকে তথ্য পেলে তার সত্যতা যাচাই করা সহজ হয়। কোনো এক উৎস পক্ষপাতদুষ্ট হলে অন্য উৎস থেকে উপযুক্ত তথ্য পাওয়া যায়। কেউ মিথ্যা তথ্য দিতে চাইলে একাধিক উৎস সেই মিথ্যাচা্রকে ধরিয়ে দিত এই সমান্তরাল কাঠামো আখবারাত ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাকে নিশ্চিত করত।

অ: ফারুখি কেন বলছেন যে, শাহজাদাদের প্রতিযোগিতা মুঘল রাষ্ট্র গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল?

বি: মুনিস ফারুখি দেখিয়েছেন—শাহজাদাদের শাহী শিক্ষা দিয়ে, সম্রাটের মিরর প্রশাসন দিয়ে, সাম্রাজ্য সেবার সুবায় পাঠানো হতো। সুবাদার, সুবায় মুঘল সাম্রাজ্য কাঠামো/ফোল্ডের বাইরে থাকা ব্যক্তি, কাঠামো, গোষ্ঠী, গোত্র, সমাজকে সাম্রাজ্যফোল্ডে নিয়ে আসত শক্তি সঞ্চয় করতে যাতে সে সেই শক্তি নির্ভর করে একে অপরের বিরুদ্ধে সিংহাসন দখলের লড়াইয়ের যুদ্ধে লড়ে কেন্দ্রিয় ক্ষমতা দখল করতে পারে। শাহজাদারা বাচ্চা বয়স থেকেই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে, সাম্রাজ্য সেবায় সুবা শাসনে অভিবাসিত হতেন। সুবাদার হিসেবে মুঘল সাম্রাজ্য কাঠামো/ ফোল্ডের বাইরের ব্যক্তি, কাঠামো, সমাজকে নিজপক্ষে আনতেন শক্তি সঞ্চয় করতে। সেই আঞ্চলিক শক্তির উপর নির্ভর করে সুবাদার এক ভাই বিপুল ক্ষমতা নিয়ে অন্য সুবায় শাসক ভাই আর কেন্দ্রে বাবাকে চ্যালেঞ্জ জানাতেন। এই ফ্যালাসির সর্বোত্তম প্রয়োগ দেখি আলমগীর আওরঙ্গজেবে। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে ১৬৩৫ থেকে কার্যত ১৬৫৮ সাল পর্যন্ত সুবায় কাটিয়েছেন, বছরের পর বছর কেন্দ্রে বাবা-দাদা-দিদি অক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করে। দরবারে এলেও পরিবারের ন্যূনতম সাহচর্য পাননি, বরং দারা-আওরঙ্গজেব বিবাদে সম্রাট ১০ মাস দরবার থেকে তাঁকে বিসর্জন দিয়েছেন। দারার সমস্যা ছিল সম্রাটের থেকেও বেশি ক্ষমতা নিয়ে সারাজীবন কেন্দ্রিয় ক্ষমতায় বসে থাকা আর সুবায় দরকষাকষির অভিজ্ঞতা না হওয়া—সিংহাসনের লড়াইয়ের আগে একবার ছাড়া যুদ্ধ করেননি—রুড ছিলেন, মানুষ চিনতেন না। আওরঙ্গজেব নিজের উপর আসা প্রতিটি বিপক্ষের ঘা ব্যবহার করেছেন নিজেকে শান দিয়ে মেজে ঘরে তৈরি করতে—তাঁর বরাবরের লক্ষ্য শাহজাহানাবাদের ময়ুরতক্ত।

সুবায় শাহজাদারা কী ভাবে ক্ষমতা বাড়াত, সুবাদার আলমগিরের উদ্যমে তার একটা ঝলক দেখি। দক্ষিণে (আমরা যাকে দাক্ষিণাত্য বলি) হাবসিরা সম্রাট শাহজাহানের সময় পর্যন্ত এলিট ছিল—বড় পদে কাজ করত—মারাঠিরা প্রান্তিক গোষ্ঠী। সুবাদার আওরঙ্গজেব মারাঠি গোত্রগুলিকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে এলিটত্ব দেওয়ালেন—তাঁর জন্মদিনে গোত্র নেতাদের ডাকতেন, সম্মান দিতেন এবং বড় অংশের মারাঠা সর্দার সিংহাসন লড়াই পর্বে বিজয়ে বিপুল সাহায্য করেছেন। তিনি একই কাজ করেছেন আকবরের সময় বিদ্রোহ করে সাম্রাজ্য কাঠামো থেকে প্রায় ১৫০ বছর বাইরে থাকা আফগানদের গোষ্ঠীনেতাদের সঙ্গে। সম্রাট আকবরের পর তিনিই প্রথম সম্রাট যিনি তাঁদের মুঘল বাহিনীতে নিলেন। আফগান আর মারাঠিরা তার দু’দিকে দু’টো ঠ্যাকনা হলো। দাদা দারার মতো সম্পদশালী, ক্ষমতাবান না হয়েও শেষ পর্যন্ত সিংহাসন দখল করলেন সারাজীবন সুবায় কাটানো আওরঙ্গজেব।

অ: ফারুকীর গবেষণায় আখবারাত কী ভাবে আওরঙ্গজেবের ধর্ম পরিবর্তন নীতি নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে?

বি: আখবারাত—মুঘল দরবারের দৈনিক সংবাদ বুলেটিন সূত্রে ফারুখি দেখেছেন, ব্যাপক ধর্মান্তরের প্রমাণ বাড়ন্ত। মুনিসের সঙ্গে অড্রে ট্রুস্কেও বলেছেন, আওরঙ্গজেব গভীর ভাবে ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু তিনি অমুসলিম প্রজাদের ধর্মান্তর করতে বাধ্য করেননি এবং এই শিক্ষা তিনি পেয়েছেন সম্রাট হুমায়ুনের আর সম্রাট আকবরের থেকে। আওরঙ্গজেব ইসলাম-অনুপ্রাণিত সমাধান ব্যবহার করতেন শাসন সমস্যা সমাধানে—রাজস্ব সংকট মোকাবিলা, সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে। জিজিয়া ছিল প্রতীকী সার্বভৌমত্বের দাবি, অর্থনৈতিক চাপ ও আইনি বিতর্কের ফল, ধর্মীয় বৈরিতার পরিচয় নয়।

অ: আখবারাতে জিনাত-উন-নিসার আবির্ভাব কী ভাবে মুঘল হারেমের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা বদলে দেয়?

বি: প্রাচ্যবাদী উপনিবেশিক ইতিহাসে দেখানো হয়েছে, মুঘল হারেম বিচ্ছিন্ন, রাজনীতির বাইরের আর বেলেল্লাপনার ক্ষেত্র—তাকে শাসনে রাখতে হয়। আখবারাত এই ধারণা ভেঙেছে। ফারুকী বলছেন, আখবারাতে হারেম আর খোজার ব্যাপক উল্লেখ, ক্রনিকলকারদের কাজে নেই। আখবারাত পাঠে বুঝি আওরঙ্গজেবের দ্বিতীয় কন্যা শাহাজাদী জিনাত-উন-নিসা সম্রাজ্যের দ্বিতীয়-সবচেয়ে-ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হয়ে শাহী পরিবারের মধ্যস্থতা করতেন; পুত্রদের বিবাদ মেটাতেন; গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাবশালী ভূমিকা নিতেন; সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় হারেমের কোষাগার ব্যবহার করতেন। ফারুকী দেখান হারেম ছিল রাজনীতির সক্রিয় কেন্দ্র। শাহাজাদী জিনাত-উন-নিসার মতো নারীরা শুধু রাজনীতিতে অংশ নেননি, তারা রাজনীতি পরিচালনা করেছেন—ঠিক যেমন রুবি লাল সম্রাট আকবরের সময় বিশ্লেষণ করে দেখান।

অ: আখবারাতে উল্লিখিত শিখ সম্প্রদায়ের সঙ্গে মুঘলদের সম্পর্ক নিয়ে ফারুকী নতুন কী বলেছেন?

বি: আখবারাত শিখ-মুঘল সম্পর্কের চালু মিথ ভেঙেছে। ফারুকী বলছেন, দৈনিক বুলেটিনসূত্রে তিনি বুঝেছেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ের শিখ-মুঘল সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল, বহুমাত্রিক ছিল। শিখ সম্প্রদায় নিয়ে আওরঙ্গজেবের নীতি বারবার বদলেছে মূলত রাজনৈতিক প্রয়োজনে, সামরিক পরিস্থিতি সূত্রে এবং প্রশাসনিক বাস্তবতায় প্রভাবিত হয়ে। আখবারাতে কিন্তু গুরু তেগ বাহাদুরের শাহাদাতের সরাসরি উল্লেখ নেই। ফলে এই সূত্র মুঘল দরবারকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে সাহায্য করে।

অ: ফারুখি কেন বলছেন, আওরঙ্গজেবের মন্দির ধ্বংসের কিংবদন্তি অতিরঞ্জন?

বি: আওরঙ্গজেবের মন্দির ধ্বংসের ঘটনা মূলত রাজনৈতিক শত্রু দমনের কৌশল, ধর্মীয় উদ্দেশ্যপূরণে নয়। ফারুখির (ঈটন, ট্রুস্কে ইত্যাদিও) মতে, এই ধ্বংস ঘটেছে যুদ্ধ ও বিদ্রোহ সূত্রে—বিশেষ করে শাহাজাদা, স্থানীয় শাসকের বিদ্রোহে। কয়েকটি উদাহরণ তিনি দিচ্ছেন—কাশী বিশ্বনাথ মন্দির (১৬৬৯) ধ্বংস হয় মন্দিরের কিছু ব্রাহ্মণ শিবাজিকে পালাতে সাহায্য করে; মথুরার কেশবরায় মন্দির (১৬৭০)—গোকলা জাটের নেতৃত্বে জাট বিদ্রোহ দমনের পর ধ্বংস হয়; যোধপুর, উদয়পুরের মন্দির (১৬৭৯-৮০)—রাজপুত বিদ্রোহ সূত্রে ধ্বংস করা হয়। ফারুকী লিখেছেন, যদি আওরঙ্গজেব মন্দির ধ্বংস করতে চাইতেন, তবে তিনি কেন ১০৭৭ হিজরিতে একটা মন্দির ধ্বংস করলেন এবং অন্যটা করলেন (বিশ্বনাথ) ১০৮০ হিজরিতে? আদেশে এত বিলম্ব কেন?

(চলবে)

লিখেছেন
Atri Bhattacharya
Atri Bhattacharya
10 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।

কর্নওয়ালিস স্ট্রিট থেকে বিধান সরণি, ধর্মতলা থেকে লেনিন সরণি: যেভাবে ক্ষমতাসীনরা বদলেছে কলকাতার রাস্তার নাম

Renaming politics of kolkata's street: লটারি কমিটির কর্নওয়ালিস স্ট্রিট নির্মাণ থেকে বামফ্রন্টের লেনিন সরণি, হো চি মিন সরণি—কলকাতার রাস্তার নামকরণ প্রথম থেকেই রাজনৈতিক ছিল। ২০২৬ সালে, বিজেপি সরকারের উৎসাহে দশ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে লেনিন, কার্ল মার্কস ও হো চি মিন সরণির নাম বদলের সুপারিশ করতে। কিন্তু নাম বদলালেই কি মানুষের স্মৃতি বদলায়?

মাছে-ভাতে বাঙালি, দুর্গাপুজোর ভোগেও আমিষের চল, কী বলছে শোভাবাজার রাজবাড়ির ২৭০ বছরের ইতিহাস?

Durga Puja non vegetarian food: পুজোর দিনগুলিতে সকালে রাজবাড়ির সদস্যরা উপোস করে অঞ্জলি দেন এবং পুজোর কাজে অংশ নেন। দিনের সেই সময়ে তাঁরা নিরামিষ খাবারই গ্রহণ করেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর আমিষ খাবার খাওয়ার রীতি রয়েছে। অর্থাৎ পুজোর প্রত্যেক দিনই পরিবারের সদস্যরা মাছ-মাংস খান।

পেরিয়ারের মৃত্যু নেই, যে লড়াই আজও চলছে

Periyar’s 148th Birth Anniversary: পেরিয়ারের ১৪৬তম জন্মদিনেও এক শতাব্দী আগে তিনি যে প্রশ্নগুলি তুলেছিলেন, সেগুলিই নতুন করে সামনে আনতে হচ্ছে। কেন বারবার জাতের পরিচয় হিংসার কারণ হয়ে ওঠে? কেন সংবিধান ও আইন থাকা সত্ত্বেও জাতিভেদ, সামাজিক ক্ষমতা এবং বৈষম্যের এই কাঠামো এখনও ভাঙা যায়নি?

গণতন্ত্রের আলো প্রতিফলিত হয় ব্যক্তির চরিত্রে, শিখিয়েছিলেন সুমিত সরকার

Historian Pradip Kumar Datta on Sumit Sarkar's historiographical legacy: ‘হিস্ট্রি ফ্রম বিলো’ থেকে আখ্যান বিশ্লেষণ, সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস থেকে হিন্দুত্বের উত্থান—সুমিত সরকারের চিন্তার নানা পর্বের সঙ্গে দীর্ঘ বৌদ্ধিক সম্পর্ক রয়েছে ইতিহাসবিদ প্রদীপ কুমার দত্তের। ‘কারভিং ব্লকস’ ও ‘হেটেরোজিনিয়েটিস’-এর সূত্র ধরে ইতিহাস, সাম্প্রদায়িকতা ও মিথ-হিস্ট্রির রাজনীতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য।

রাজনীতির অভিধানে ‘পিতৃতন্ত্র’ ঢুকছে? রাহুলের বক্তৃতা কি নতুন কোনো শুরু?

Rahul Gandhi patriarchy: পুনের ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ অনুষ্ঠানে রাহুল গান্ধীর বক্তৃতা সম্পূর্ণ নতুন বয়ান তৈরি করল। এই প্রথম কোনো মূলধারার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সরাসরি “পিতৃতন্ত্র নিপাত যাক” এই স্লোগান তুললেন। লক্ষ্য করার মতো বিষয়, এই কথাগুলি তিনি বলেছিলেন সরাসরি তরুণী জেন জি শ্রোতাদের সামনে দাঁড়িয়ে।

এআইয়ের বাড়বাড়ন্তে বিপদে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি?

AI Threat to China’s Communist Party: এআই শুধু প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বদলাবে, নাকি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনীতিতেও তৈরি করবে নতুন সংকট? কেন চিনের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্তা এআইকে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছেন? বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে এআই গেলে কী ধরনের বিপদ তৈরি হতে পারে? আর কেন শি জিনপিং এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলছেন?

টোকিওর জিম্বোচো: বইয়ের শহরে পাঠকের খোঁজে

Tokyo book market: কফিহাউজ যেমন কলেজস্ট্রিটের প্রাণকেন্দ্র, তেমনই জিম্বোচোতে রয়েছে একাধিক কিস্‌সাতেন—শান্ত নিঝ্‌ঝুম কফির দোকান। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো কিস্‌সাতেনের নাম সাবোরু।