কারও ফেরা হলো না মায়ের কোলে, কারও চোখের সামনেই চলে গেলেন মা, সপ্তমীর ভিড় কেড়ে নিল চেনা মুখগুলো
Kolkata Durga Puja stampede: যে শিশুটি বাবার হাত ধরে মণ্ডপ দেখতে চেয়েছিল, কিংবা যে তরুণ উৎসবের দিনেও শুধু মায়ের হাসিমুখ দেখতে ভিড়ে সামিল হয়েছিল—মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে তাদের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।
দুর্গাপুজো মানেই আলো, আনন্দ, মানুষের ঢল আর মণ্ডপে-মণ্ডপে ঠাকুর দেখার উন্মাদনা। সেই উৎসবের ভিড়ই সপ্তমীর সন্ধ্যায় পরিণত হলো মৃত্যুমিছিলে। উত্তর কলকাতার চোরবাগানের একটি পুজোমণ্ডপে হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় প্রাণ হারালেন ১৮ জন। আহত হলেন অনেকে। যাঁরা বন্ধুদের সঙ্গে, পরিবারের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেরই আর বাড়ি ফেরা হলো না। আনন্দের সন্ধ্যা মুহূর্তে বদলে গেল আতঙ্ক, কান্না আর স্বজন হারানোর বেদনায়।
চোরবাগানের পুজোমণ্ডপের একটি অংশ ভেঙে পড়ার পর সেখানে পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ চত্বরে তীব্র বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। মুখ্যমন্ত্রী হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন এবং ১৮ জনের মৃত্যুর কথা জানান। দুর্ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, ভিড় সামলানোর যথাযথ ব্যবস্থা ছিল না। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভূমিকা নির্ধারণের জন্য তদন্তের ফল জানা জরুরি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যথেষ্ট ঘোষণা করা হয়নি। ফলে কোথা দিয়ে ঢুকতে হবে, কোন পথে বেরোতে হবে, তা নিয়ে দর্শনার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মণ্ডপে পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী ছিলেন না। তাঁদের দাবি, মূলত ভিআইপি প্রবেশপথেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশাসনের কাছ থেকে যথেষ্ট সাহায্য মেলেনি বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
এই অভিযোগগুলি দুর্ঘটনার পর ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি পথ খোলা রাখা এবং বিপর্যয়ের সময় উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে অভিযোগগুলির সত্যতা এবং দুর্ঘটনার সঙ্গে সেগুলির সম্পর্ক তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। উৎসবের সময় বিপুল জনসমাগমের ক্ষেত্রে প্রবেশ ও প্রস্থানের আলাদা পথ, ভিড়ের চাপ সামলানোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রিয়ার আর বাড়ি ফেরা হলো না
চোরবাগানের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ বছরের ছাত্রী প্রিয়া সমাদ্দার। উত্তর ২৪ পরগনার নিউ ব্যারাকপুরের লেনিনগড়ের বাসিন্দা প্রিয়া এপিসি কলেজের কলা বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় দুর্গাপুজো দেখতে বেরিয়েছিলেন তিনি। একাধিক মণ্ডপ ঘুরে চোরবাগানেও গিয়েছিলেন। সেখানেই পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর।
প্রিয়ার বাবা শ্যামল সমাদ্দার পেশায় দর্জি। তাঁর পরিবারের বাড়ি ঘোলা থানার অন্তর্গত বিলকান্দা-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার উত্তর যোগেন্দ্রনগরে। শনিবার রাতে ঘোলা থানার পুলিশকর্মীরা প্রিয়ার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। মেয়ের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছতেই শোকের ছায়া নেমে আসে। যে তরুণীর সামনে পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর ভবিষ্যতের নানা স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, পুজো দেখতে বেরিয়ে তাঁর জীবনই শেষ হয়ে গেল।
বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যু প্রাঞ্জলের
মৃতদের মধ্যে রয়েছে ১৩ বছরের প্রাঞ্জল সরকারও। আগরপাড়া থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে পুজো দেখতে এসেছিল সে। ভিড়ের চাপে কোনো এক সময় বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে প্রাঞ্জল। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি সে। উদ্ধার করার সময়ে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।
প্রাঞ্জলের মামার কথায়, হাসপাতালে সারি সারি দেহ রাখা ছিল। সেখানে গিয়ে তিনি ভাগ্নের মুখ দেখেন। তাঁর বর্ণনায়, জুতোর চাপে প্রাঞ্জলের মুখ থেঁতলে গিয়েছিল। পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে আসা একটি শিশুর পরিণতি হলো এমনই মর্মান্তিক। ভিড়ের চাপে একজন শিশু কীভাবে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে এবং সেই পরিস্থিতিতে তাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
তানিয়া ও তাঁর বান্ধবীর মৃত্যু
চোরবাগানের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে নিউ টাউনের গৌরাঙ্গনগর নতুনপল্লি সুভাষসরণির বাসিন্দা তানিয়া বিশ্বাসও। একাদশ শ্রেণির ছাত্রী তানিয়া বিকেলে দুই বান্ধবীর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল। তিনজনই দুর্ঘটনার সময় চোরবাগানের মণ্ডপে উপস্থিত ছিল। পদপিষ্ট হয়ে তানিয়া এবং তাঁর এক বান্ধবীর মৃত্যু হয়। তাঁদের সঙ্গে থাকা তৃতীয় বান্ধবী অবশ্য সুস্থ রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের কাছে দুর্ঘটনার খবর পৌঁছে দেয় পুলিশ। পরে ভিডিও কলের মাধ্যমে ছবি দেখে মৃত দুই ছাত্রীর দেহ শনাক্ত করেন তাঁদের পরিবারের লোকজন। প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর তাঁদের পরিবারের উপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গিয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। যে বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠার কথা, সেই বয়সেই এমন মর্মান্তিক পরিণতি দুই পরিবারের কাছে অপূরণীয় ক্ষতি।
এই ঘটনায় আরও একবার সামনে এসেছে, জনবহুল উৎসবে কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভিড়ের মধ্যে কেউ পড়ে গেলে দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করা, পরিবারের সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং বিপদের সময় দর্শনার্থীদের সঠিক নির্দেশ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
শ্রীপর্ণার ফেরা হলো না বাড়ি
সপ্তমীর সকালে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন শ্রীপর্ণা পোদ্দার। বাড়ির লোকজন জানতেন, বন্ধুদের সঙ্গে পুজো কাটাচ্ছেন তিনি। সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ তাঁর বাবার কাছে ফোন আসে। সেই ফোনেই জানতে পারেন, মেয়ে আর বেঁচে নেই। চাপা পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে এবং দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছতে হবে। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পরিবারের সব হিসাব। বর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান শ্রীপর্ণার মামা বিশ্বনাথ দে।
শ্রীপর্ণার পরিবারের কাছে সপ্তমীর সন্ধে হয়ে রইল এক দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। উৎসবের দিনেও বাড়ির মানুষ যে নিরাপদে ফিরবেন, সেই সাধারণ প্রত্যাশাটুকু পূরণ হলো না।
চোখের সামনে মাকে হারালেন সোনু
চোরবাগানের দুর্ঘটনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী ২৫ বছরের সোনু পাল। কুমোরটুলির বাসিন্দা সোনু সপ্তমীর সন্ধেয় মায়ের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন। সেই সন্ধেতেই তাঁর চোখের সামনে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় মায়ের। নিজের জীবনও যে কোনও মুহূর্তে বিপন্ন হয়ে পড়েছিল, সেই আতঙ্ক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
সোনুর বর্ণনা অনুযায়ী, উত্তর কলকাতায় তখন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে অনেক দর্শনার্থী মণ্ডপের ভিতরে ছিলেন। অন্য দিকে, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন প্রবেশপথ দিয়ে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। ফলে প্রবেশপথে চাপ বাড়তে থাকে। এক সময় সেই চাপ সামলানো সম্ভব হয়নি। মণ্ডপের ভিতরে মানুষ একে অপরের গায়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যান।
সোনু জানিয়েছেন, তিনিও ভিড়ের চাপে পড়ে গিয়েছিলেন। কোনো রকমে নিজেকে সামলে মায়ের কাছে পৌঁছে দেখেন, মা আর বেঁচে নেই। তাঁর কথায়, সেই পরিস্থিতিতে তিনিও হয়তো প্রাণ হারাতে পারতেন।
বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে দর্শনার্থীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে মণ্ডপের প্রবেশপথে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। সেই চাপ সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, বিকল্প পথ এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যদিও চোরবাগানের দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ এখনও তদন্তসাপেক্ষ, সোনুর বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, প্রবেশপথে মানুষের চাপ পরিস্থিতিকে কতটা জটিল করে তুলেছিল।
কলকাতার দুর্গাপুজোয় প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় বেরোন। জনপ্রিয় মণ্ডপগুলিতে দর্শনার্থীদের চাপ সামলাতে প্রশাসন, পুলিশ এবং পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মণ্ডপের কাঠামো কতটা নিরাপদ, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ যথেষ্ট প্রশস্ত কি না, ভিড়ের চাপ বাড়লে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিপদের সময় দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব কি না—এই প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং অ্যাম্বুল্যান্সের যাতায়াতের পথ খোলা রাখাও প্রয়োজন।
চোরবাগানের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের তোলা অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কোথায় ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল, কীভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল এবং আহতদের উদ্ধার ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি হয়েছিল কি না, তার উত্তর খুঁজতে হবে।








