মণিপুরে কেন কুকি শিবিরের নিয়ন্ত্রণ নিল যৌথ বাহিনী?
Manipur SoO camp raid: মণিপুরে SoO চুক্তির আওতায় থাকা কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর শিবিরে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও ১৭ জনের গ্রেফতারি কি শান্তিচুক্তির নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনছে?
মণিপুরে জাতিগত সংঘাতের মধ্যে কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির জন্য নির্দিষ্ট একটি শিবিরে অভিযান চালিয়ে ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। পুলিশের দাবি, ধৃত ব্যক্তিরা সরকারি নথিতে নথিভুক্ত সাসপেনশন অফ অপারেশনস বা ‘SoO’ চুক্তির আওতায় থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য বলে পরিচয় দিচ্ছিলেন। কিন্তু পরিচয় যাচাইয়ের সময় তাঁদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে নথিভুক্ত সদস্যদের পরিচয়ের মিল পাওয়া যায়নি। এই অভিযানে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৮টি ম্যাগাজিন, প্রচুর গুলি, বিস্ফোরক, বেতার যোগাযোগের সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
২৩ অক্টোবর কাংপোকপি জেলার সাইনাই শিবিরে এই যৌথ অভিযান চালানো হয়। মণিপুর পুলিশ, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (CRPF) কুইক অ্যাকশন টিম এবং কোবরা (CoBRA) বাহিনীর সদস্যরা অভিযানে অংশ নেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী শিবিরটির নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নেয়। ২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত হিংসা শুরু হওয়ার পর থেকে এই ধরনের নির্দিষ্ট শিবিরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ধৃত ১৭ জনের মধ্যে আটজন নিজেদের কুকি ন্যাশনাল আর্মি (KNA) এবং ন'জন কুকি লিবারেশন আর্মি (KLA)-র সদস্য বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু যাচাইয়ে তাঁদের পরিচয় নথিভুক্ত সদস্যদের সঙ্গে মেলেনি। তাঁদের বিরুদ্ধে ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে চুক্তির আওতাভুক্ত সদস্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনায় শিবিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা, অস্ত্র রাখার বৈধতা এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।
তবে এই গ্রেফতারির ঘটনাকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে, শিবিরে যদি নথিভুক্ত সদস্যদের বদলে অন্য ব্যক্তিরা অবস্থান করে থাকেন, তা হলে তাঁদের সেখানে থাকার অনুমতি কে দিয়েছিল? একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া বিপুল অস্ত্রশস্ত্র কীভাবে শিবিরে এল, তার উৎস কী এবং সেগুলি কারা ব্যবহার করছিলেন, তা-ও তদন্তের বিষয়। এখনও পর্যন্ত তদন্তকারীরা এই প্রশ্নগুলির চূড়ান্ত উত্তর প্রকাশ করেননি। ফলে পুলিশের অভিযোগকে তদন্তে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
কী এই SoO চুক্তি?
SoO-এর পুরো নাম ‘Suspension of Operations’। বাংলায় এর অর্থ সামরিক অভিযান স্থগিত রাখা। ২০০৮ সালের অগাস্টে কেন্দ্রীয় সরকার, মণিপুর সরকার এবং কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র সংঘর্ষ কমানো এবং আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি করা।
কুকি ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (KNO) এবং ইউনাইটেড পিপলস ফ্রন্ট (UPF) নামের দুটি সংগঠনের অধীনে থাকা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এই চুক্তির আওতায় রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের নির্দিষ্ট শিবিরে থাকার কথা। তাঁদের অস্ত্রশস্ত্রও নির্ধারিত নিয়মে সংরক্ষিত থাকার কথা। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির কার্যকলাপের উপর নজরদারি রাখা এবং নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আশঙ্কা কমানো।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manipur Violence 2023: ইনার লাইন পারমিট সিস্টেম চালু হলে যারা মণিপুরের বাসিন্দা নন তাদের মণিপুরে আসতে গেলে এক অতিরিক্ত অনুমতিপত্র করাতে হবে।
কিন্তু মণিপুরে ২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া জাতিগত সংঘাতের পর এই চুক্তি নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে। মেইতেই সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন চুক্তির আওতায় থাকা কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে, চুক্তির উদ্দেশ্য এবং তার শর্ত কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট শিবিরগুলিতে কারা থাকছেন, তাঁদের পরিচয় কী এবং অস্ত্রশস্ত্র কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১৫৯ জনের শিবিরে পাওয়া গেল মাত্র একজন নথিভুক্ত সদস্য
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে ১৫৯ জন নথিভুক্ত সদস্যের থাকার কথা ছিল। কিন্তু অভিযানের সময় তাঁদের মধ্যে মাত্র একজনকে পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ১৭ জন এমন ব্যক্তিকে পাওয়া যায়, যাঁদের পরিচয় নথিভুক্ত সদস্যদের সঙ্গে মেলেনি। তাঁদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে।
এই তথ্য শিবিরটির নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। নথিভুক্ত সদস্যদের অধিকাংশ কোথায় রয়েছেন, তাঁরা অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন কি না, কিংবা তাঁদের অনুপস্থিতির অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা এখনও যাচাই করা হচ্ছে। তাঁদের অনুপস্থিতি থেকেই তাঁরা কোনো বেআইনি কাজে যুক্ত ছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট শিবিরে থাকার কথা থাকলে এতজন সদস্যের অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা পাওয়া জরুরি।
তিন মেইতেই নাগরিকের হত্যার পর অভিযান
এই অভিযানের ঠিক আগে মণিপুরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ১৯ অক্টোবর ইম্ফল পূর্ব জেলার খংবান সুনুরোক এলাকার কাছে তিন মেইতেই নাগরিককে হত্যা করা হয়। তাঁরা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই ঘটনার পর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং সন্দেহভাজনদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়।
ঘটনাটির পর সাইনাই শিবিরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সংগঠন শিবিরটির কার্যকলাপ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার তদন্তের দাবি জানান। এই প্রেক্ষাপটেই নিরাপত্তা বাহিনী শিবিরে অভিযান চালায়।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। তিন নাগরিকের হত্যাকাণ্ড এবং সাইনাই শিবির থেকে ১৭ জনের গ্রেফতারি একই সময়ের ঘটনাপ্রবাহের অংশ হলেও, গ্রেফতার হওয়া এই ১৭ জনের সঙ্গে ওই হত্যাকাণ্ডের সরাসরি যোগসূত্র এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ এর আগে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। দুটি তদন্তের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে তদন্তে উঠে আসা তথ্যের উপর।
চুক্তির মেয়াদ শেষ, কিন্তু বিতর্কের অবসান হয়নি
মণিপুরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দাস কোন্থৌজম জানিয়েছেন, SoO চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর ৪ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে এবং তা আর নবীকরণ করা হয়নি। তবে চুক্তি নবীকরণ না হওয়া এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি বাতিল হওয়া এক বিষয় নয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তি পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা সূত্রের বক্তব্য, আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট শিবিরে থাকা এবং অস্ত্র সংক্রান্ত শর্ত মানার বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ধৃত ১৭ জনকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আট দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, অস্ত্র আইন, ভারতীয় ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি আইন এবং বিস্ফোরক পদার্থ আইনের প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা করা হয়েছে। তদন্ত চলছে।
মণিপুরে দীর্ঘদিনের জাতিগত সংঘাতের মধ্যে এই ঘটনা প্রশাসনের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে: শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি চুক্তির শর্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর করা হয়েছে? শিবিরে সদস্যদের পরিচয় যাচাই, অস্ত্রের হিসাব রাখা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে এমন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে, কোনো সম্প্রদায়ের সকল মানুষকে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যকলাপের জন্য দায়ী না করে, নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের উৎস, নথিভুক্ত সদস্যদের অনুপস্থিতির কারণ এবং শিবির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে স্বচ্ছ তদন্তই নির্ধারণ করবে, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন অনিয়ম, না কি SoO ব্যবস্থার নজরদারিতে আরও বড় কোনো সমস্যার ইঙ্গিত।






