রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?
INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।
‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে ১ নভেম্বর, দিল্লির রামলীলা ময়দানে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ২১টি দল একদিনের জন্য একজোট হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ হওয়ার পরেই ভেতরের না-বলা ফাটলগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বামেদের প্রাধান্য: মঞ্চের বার্তায় 'ফ্যাসিবাদ' বিরোধী সুর
রামলীলার মঞ্চে বামেদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে লক্ষণীয়। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, সিপিআইএমএল লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ছাড়াও বিজু কৃষ্ণান, নেহা বোরা বক্তব্য রেখেছেন। শুধু উপস্থিতি নয়, তাঁদের বক্তব্যের সুরও ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক।
এম এ বেবি সভা থেকে ঘোষণা করেন, দেশে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তিনি এই আন্দোলনকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে অভিহিত করেন, যা আরএসএসের 'ফ্যাসিবাদী' শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই। দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এসআইআর-কে ভোটাধিকারের ওপর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বলে কটাক্ষ করেন। তিনি এসআইআর বিরোধী আন্দোলনকে দেশের কোণে কোণে ছড়িয়ে দেওয়ার ডাক দেন।
যদিও বাংলায় তৃণমূলের সঙ্গে জোটের প্রশ্নে সিপিআইএমের অনড় অবস্থান, দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে থাকলেও রাজ্যে তৃণমূলের সঙ্গে কোনো আপস নয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সতর্কবার্তা’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতা ছিল, রামলীলার সভার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ‘সিগন্যাল’। তিনি জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করেন এবং বলেন, আমরা হারিনি, আমদের জোর করে হারানো হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
INDIA Bloc Rally at Ramlila Maidan: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ২১টি বিরোধী দলের নেতা ও কর্মীরা। কে, কী বললেন?
কিন্তু এর পাশাপাশি তিনি রাহুল গান্ধীকে একটি ‘মৃদু সতর্কবার্তা’ও দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন। মমতা স্পষ্ট করেছেন তিনি শুধু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বা তৃণমূলের নেত্রী হিসেবে মঞ্চে আসেননি; জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর নিজস্ব ভূমিকা ও গুরুত্ব আছে। তিনি ‘আমার নেত্রী সোনিয়াজি’ বলে সৌজন্য দেখালেও, মঞ্চে রাহুলের ঠিক পিছনের আসনে বসার বিষয়টিকে ‘সমীকরণের রাজনীতি’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ, মমতার বার্তা স্পষ্ট, জাতীয় বিরোধী জোটে তিনি ‘অতিরিক্ত’ কেউ নন; তিনি বাংলার লড়াইকে জাতীয় লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে চান, কিন্তু নিজের স্বতন্ত্র অবস্থানও বজায় রাখতে চান।
কেন বঞ্চিত সুপ্রিয়া, সঞ্জয় রাউত, প্রিয়াঙ্কা?
রামলীলার মঞ্চে সবচেয়ে বড় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, বক্তৃতার সুযোগ নিয়ে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, শিবসেনা (ঠাকরে গোষ্ঠী)র সঞ্জয় রাউত, রাষ্ট্রবাদী কংগ্রেসের সুপ্রিয়া সুলে, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখার সুযোগ পাননি। কংগ্রেস নেতা অজয় মাকেন মঞ্চ থেকেই ‘সময়ের অভাবে’ এই নেতাদের বক্তৃতা না হওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
এই বঞ্চনার, রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। বিজেপি নেতা নবনাথ বান অভিযোগ করেছেন, সুপ্রিয়া সুলে ও সঞ্জয় রাউতকে মঞ্চে উপেক্ষা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, রাহুল গান্ধীর মহারাষ্ট্রের প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব রয়েছে।
মহারাষ্ট্রে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক এনসিপি (শরদ গোষ্ঠী) ও শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী)। এই দুই দলের শীর্ষ নেতাদেরকে বক্তৃতার সুযোগ না দেওয়া জোটের ভিতরে ‘আঞ্চলিক অসন্তোষ’ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বাংলায় তৃণমূল-বাম টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে মহারাষ্ট্রের শরিকদের বঞ্চনা ‘ইন্ডিয়া’র ভিতরের ক্ষমতার সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে।
রামলীলার পর কী?
সমাবেশের পরপরই দুই মোর্চায় রাজনীতি তুঙ্গে। একদিকে রাহুল গান্ধী মঞ্চ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—প্রথমে জ্ঞানেশ কুমার, তারপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেছেন, মোদী কোথাও পালাতে পারবেন না।
অন্যদিকে বিজেপি পাল্টা রণনীতিতে নেমেছে, ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করেছে তারা। বিজেপি নেতৃত্ব দেশজুড়ে ‘লোকতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ মিছিল করছেন। অর্থাৎ, রামলীলার পর্ব শেষ হলেও রাজনৈতিক লড়াই এখন নির্বাচন কমিশন বনাম বিরোধী জোট, এই দুই অক্ষে ঘুরবে।
বিরোধীরা কী করবেন?
রামলীলার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা, রাহুল গান্ধী জোটের অন্য নেতাদের নিজস্ব ইস্যুতে কথা বলার জায়গা দিয়েছেন। ফ্রন্টলাইনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সমাবেশের তাৎপর্য জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য ব্যাপকতর জোট-নির্মাণের সংকেত দিচ্ছে।
পরবর্তী পর্বে বিরোধীদের কৌশল হতে পারে, এসআইআর-বিরোধী আন্দোলনকে রাজ্য স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, বাংলা, মহারাষ্ট্রে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে স্থানীয়ভাবে আন্দোলন জোরদার করা। আইনি পথে চাপ দিয়ে, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা, সংসদীয় কমিটিতে দাবি তোলা।
‘রামলীলা’ শুধুই অপটিক্স, নাকি ভবিষ্যতের ভিত্তি?
রামলীলা ময়দানের সমাবেশ একদিনের ‘শো অফ স্ট্রেংথ’ হিসেবে সফল, কিন্তু বক্তৃতা বণ্টন, মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব এই ‘ছোট’ বিষয়গুলিই জোটের ভিতরে ভাঙন ধরাতে পারে। সুপ্রিয়া-সঞ্জয়ের ‘অসন্তোষ’ যদি সত্যি হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বড় আকার নিতে পারে। তৃণমূল ও বাম-কংগ্রেসের আঞ্চলিক লড়াই, জাতীয় জোটের ঐক্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। রামলীলার মঞ্চে মমতা ‘আমার নেত্রী সোনিয়া জি’ বলে সৌজন্য দেখালেও, বাংলার মাটিতে এই সৌজন্য কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। রামলীলার পর বিরোধীদের ‘কাজ’ হলো মঞ্চের বাইরে এসআইআর-আন্দোলনকে গভীরে নিয়ে যাওয়া, আইনি লড়াই শুরু করা, এবং জোটের ভিতরের ‘বাম-প্রাধান্য’, ‘মমতার সতর্কবার্তা’ ও ‘শরিক-বঞ্চনা’কে সংলাপের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা। নইলে রামলীলা ‘ঐক্যের অপটিক্স’ হয়েই থাকবে; ভিতরের ফাটল সামলানো কঠিন হবে।






