মধু সংগ্রহে ‘দাদাগিরি’! উষ্ণ পৃথিবীতে বাড়ছে বিপদ
Honeybee Behaviour: উষ্ণ পৃথিবীতে ফুলের দখল নিতে মধুমৌমাছির আগ্রাসী আচরণ কি বন্য পরাগবাহী পতঙ্গদের খাবারের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলবে? গবেষণায় উঠে এসেছে, তাপমাত্রা বাড়লে ফুলের মধুরস নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে ভোমরা, একা মৌমাছি ও হোভারফ্লাইয়ের মতো পতঙ্গদের উপর।
ফুলের উপর বসে মধু সংগ্রহ করছে একটি মৌমাছি। একটু দূরে উড়ে এসে আর একটি মৌমাছি সেই ফুলে বসতে গেল। কিন্তু তাকে সেখানে থাকতে দিল না প্রথম মৌমাছিটি। কখনও ধাক্কা দিয়ে, কখনও তাড়া করে অন্য পতঙ্গকে সরিয়ে দিল সে। এমন দৃশ্য শুনতে অস্বাভাবিক লাগলেও, প্রকৃতিতে খাবার সংগ্রহের জন্য মৌমাছিদের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতাই লক্ষ্য করেছেন গবেষকরা। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রতিযোগিতায় মধুমৌমাছি অনেক সময় অন্য বন্য পতঙ্গদের তুলনায় বেশি সুবিধা পাচ্ছে। ফুলের কাছে পৌঁছনোর লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে ভোমরা, একাকী বসবাসকারী মৌমাছি এবং হোভারফ্লাইয়ের মতো পরাগবাহী পতঙ্গ। গবেষকদের আশঙ্কা, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সম্প্রতি ইংল্যান্ডের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় এমনই তথ্য সামনে এসেছে। ‘ইকোলজিক্যাল এন্টোমোলজি’ গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশিত এই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মধুমৌমাছি শুধু ফুলে গিয়ে মধু সংগ্রহ করেই থেমে থাকছে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা অন্য পতঙ্গদের ফুল থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের খাবার সংগ্রহের সুযোগ বাড়াচ্ছে। এই আচরণের ফলে বন্য পরাগবাহীদের খাবার পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই পতঙ্গগুলির ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টি বুঝতে গবেষকরা একদিন বা দুদিন নয়, টানা দুই বছর ধরে পতঙ্গদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ শহর এবং তার আশপাশের পাঁচটি জায়গাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি জায়গাই পরিচিত মধুমৌমাছির কোনো না কোনো উপনিবেশের ৩০০ মিটারের মধ্যে ছিল।
গবেষণার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল ব্র্যাম্বল এবং আইভি গাছের ফুল। এই ফুলগুলিতে মধুরস ও পরাগরেণু পাওয়া যায়। তাই বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ খাবার সংগ্রহ করতে সেখানে ভিড় করে। গবেষকরা দেখতে চেয়েছিলেন, একই ফুলে যখন একাধিক প্রজাতির পতঙ্গ আসে, তখন তাদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়। তারা কি পাশাপাশি থেকে খাবার সংগ্রহ করে, নাকি একজন অন্যজনকে সরিয়ে দেয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মোট ৯৩ ঘণ্টা ধরে পতঙ্গদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করা হয়। মধুমৌমাছি, ভোমরা, একা বসবাসকারী মৌমাছি, হোভারফ্লাই এবং প্রজাপতি, গুবরে পোকা ও বোলতার মতো অন্যান্য পতঙ্গকে পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়েছিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Environment : এল নিনোই আসল কালপ্রিট! কীভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব বিস্তার এটি?
গবেষকরা প্রতিটি সংঘর্ষের ফলও নথিভুক্ত করেন। কোনো একটি পতঙ্গ অন্য পতঙ্গকে সরিয়ে দিয়ে ফুলে খাবার সংগ্রহের সুযোগ পেলে সেটিকে জয় হিসেবে ধরা হয়। আবার দু’টি পতঙ্গ কোনো বাধা ছাড়াই একই ফুল থেকে খাবার সংগ্রহ করতে পারলে সেটিকে একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, যে জায়গায় মধুমৌমাছির সংখ্যা বেশি, সেখানে সাধারণত অন্য পরাগবাহী পতঙ্গের সংখ্যা কম। শুধু তাই নয়, মধুমৌমাছির সঙ্গে অন্য পতঙ্গের সংঘর্ষ হলে অনেক ক্ষেত্রেই তারাই জয়ী হচ্ছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, মধুমৌমাছির ঘনত্ব দ্বিগুণ হলে ভোমরার সংখ্যা প্রায় ১৪ শতাংশ কম দেখা যায়। অন্যদিকে, আইভি ফুলের আশপাশে মধুমৌমাছির সংখ্যা বেশি হলে একা বসবাসকারী মৌমাছি এবং হোভারফ্লাইয়ের সংখ্যা কম দেখা গিয়েছে।
গবেষকরা দেখেছেন, অন্য পতঙ্গদের সঙ্গে সংঘর্ষের ক্ষেত্রে মধুমৌমাছি অনেক সময় নিজে থেকেই আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে। অর্থাৎ, তারা সব সময় শুধু আগে ফুলে পৌঁছে যাওয়ার সুবিধা পাচ্ছে, বিষয়টি তেমন নয়। কখনও অন্য পতঙ্গ ফুলে খাবার সংগ্রহ করার সময় তাদের তাড়া করে সরিয়ে দিচ্ছে।
ব্র্যাম্বল ফুলে পর্যবেক্ষণ করা ঘটনাগুলির ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্য পতঙ্গ মধুমৌমাছিকে এড়িয়ে গিয়েছে। আইভি ফুলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৬ শতাংশ। আবার যে সব প্রতিযোগিতায় মধুমৌমাছি জয়ী হয়েছিল, তার অন্তত ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে তারা শারীরিকভাবে অন্য পতঙ্গকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে অথবা তাড়া করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Environmental Pollution: প্রশাসনের তরফে অতিরিক্ত দূষণ ছড়ানো কলকারখানা সিল করে দেওয়ার মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়তো নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতেই কি সমস্যার সমাধান মিলবে? কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যক্তিগত যানবাহনের দাপট এবং বৈদ্যুতিন বর্জ্য। শ্রমবিমুখ হয়ে সবকিছু প্রস্তুত পাওয়ার মানসিকতা এবং দেশে সংস্কারের লড়াই না করে সহজে অন্য দেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতাও স্পষ্ট। এই দায় এড়িয়ে কি সার্বিক সমাধান সম্ভব?
ভাবুন, একটি ছোট ফুলে সামান্য মধুরস সংগ্রহ করতে এসে কোনো বন্য মৌমাছি হয়তো বারবার বাধার মুখে পড়ছে। একবার তাড়া খেয়ে অন্য ফুলে গেল, সেখানেও যদি একই পরিস্থিতি হয়, তা হলে তার খাবার সংগ্রহের সুযোগ কতটা কমে যেতে পারে! গবেষণার পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, ফুলের কাছে এমন প্রতিযোগিতা বন্য পতঙ্গদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
সব বন্য পতঙ্গ যে মধুমৌমাছির সামনে পিছিয়ে যায়, তা নয়। গবেষণায় আইভি বি নামে এক ধরনের একা বসবাসকারী মৌমাছিকে ব্যতিক্রমী আচরণ করতে দেখা গিয়েছে। অন্য অনেক পতঙ্গ যেখানে মধুমৌমাছিকে এড়িয়ে চলে, সেখানে আইভি বি কখনও কখনও পাল্টা তাড়া করে তাদের সরিয়ে দিয়েছে। ফলে নিজেরাও ফুল থেকে খাবার সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছে।
এই প্রজাতিটি ব্রিটেনের স্থানীয় নয়। ২০০১ সালে প্রথম ব্রিটেনে এর উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছিল। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে এই মৌমাছিই একমাত্র পরাগবাহী পতঙ্গ, যাকে সক্রিয়ভাবে মধুমৌমাছিকে চ্যালেঞ্জ করতে দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতার ময়দানে সব পতঙ্গের আচরণ এক নয়। কোনও কোনও প্রজাতি নিজেদের খাবারের জায়গা রক্ষা করতেও সক্ষম।
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল পৃথিবীর তাপমাত্রা। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়ায় পতঙ্গদের মধ্যে খাবার নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা বেড়েছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে এই সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
এর একটি কারণ হতে পারে ফুলের মধুরসের পরিমাণ। অতিরিক্ত গরমে গাছের উপর চাপ তৈরি হলে কিছু গাছে মধুরসের উৎপাদন কমে যেতে পারে। ফলে আগে যেখানে অনেক পতঙ্গের খাবার জোগাড় করা সম্ভব হত, সেখানে খাবারের পরিমাণ কমে গেলে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
তাপমাত্রা সব পতঙ্গের উপর একই প্রভাব ফেলে না। ভোমরা এবং হোভারফ্লাইয়ের মতো পতঙ্গ অতিরিক্ত গরমে তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় হতে পারে। অন্যদিকে, তাপমাত্রা বাড়লে মধুমৌমাছির কার্যকলাপ বাড়তে পারে। আগের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বাসা থেকে বেরিয়ে আসা মধুমৌমাছির সংখ্যা দশ গুণ পর্যন্ত বেড়েছিল।
এই পার্থক্যের ফলে উষ্ণ আবহাওয়ায় মধুমৌমাছি খাবার সংগ্রহের ক্ষেত্রে আরও বেশি সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে, গরমের কারণে ফুলে খাবারের জোগান কমে গেলে বন্য পতঙ্গদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণার ফলাফল সামনে আসার পর এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, "মধুচাষ কি বন্ধ করে দেওয়া উচিত?"। কিন্তু গবেষকদের উদ্দেশ্য মধুচাষ বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া নয়। গবেষণার প্রধান লেখক ভিক্টোরিয়া বাকল জানিয়েছেন, এই কাজের লক্ষ্য হল বন্য পরাগবাহী পতঙ্গদের সংরক্ষণের জন্য প্রতিযোগিতার বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝা।
ব্রিটেনে নথিভুক্ত মৌচাষির সংখ্যা ২০১০ সালে প্রায় ১৯ হাজার ছিল। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪৭ হাজারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, সেখানে মধুচাষের পরিধি বেড়েছে। তাই মধুমৌমাছির উপনিবেশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্য পতঙ্গদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও উপযুক্ত পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে যেখানে অনেক মৌচাক রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির পতঙ্গের সহাবস্থান নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় শুধু মধুমৌমাছি নয়, বন্য মৌমাছি এবং অন্যান্য পরাগবাহী পতঙ্গেরও ভূমিকা রয়েছে।






