অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই সংস্থাগুলি যেভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু সংকটের কারণ
The AI Carbon Bill: অ্যানথ্রোপিকের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ-জলের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫-এ ডেটা সেন্টারগুলিতে ঘণ্টা প্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহার, ৪৪৮ টেরাওয়াটে পৌঁছবে।
এআই-এর অগ্রগতির আড়ালে, বাড়ছে প্রকৃতির সংকট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিল্পকে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবান্ধব হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হলেও, সাম্প্রতিক এক আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) ফাইলিং সেই ধারণাকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিক পিবিসি সম্প্রতি তাদের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত উদ্বেগকে একটি বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একে এআই শিল্পের দ্রুত প্রসারের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা পরিবেশগত মূল্যের একটি প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে।
অ্যানথ্রোপিকের এস-১ ফাইলিংয়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে,
“জলবায়ু পরিবর্তনের ভৌত প্রভাব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে তুলতে পারে, কারণ উচ্চতর গড় তাপমাত্রা আমাদের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা করার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জলের ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে পারে।”
অ্যানথ্রোপিকের এই বক্তব্য সরাসরি স্বীকার করে, এআই মডেল চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ডেটা সেন্টারগুলির শীতলীকরণ ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই প্রত্যক্ষ ফিডব্যাক লুপ জানান দিচ্ছে এআই শিল্প যত বাড়ছে, ততই তা আরও বেশি বিদ্যুৎ ও জল ব্যবহার করছে। যা স্বাভাবিক ভাবেই জলবায়ু সংকট বাড়াতে অবদান রাখছে। আর সেই জলবায়ু সংকটই, আবার এআই-এর পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI water consumption: তথ্য বলছে, আমাদের ফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে একদিনে মাত্র দশ থেকে বারোবার চ্যাটজিপিটিকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমরা হাফ লিটারের একটা পরিশ্রুত জলের বোতল খরচা করে ফেলছি, যে খরচ হওয়া জলের বেশিরভাগটাই আর পুনর্ব্যবহার সম্ভব নয়।
অ্যানথ্রোপিক স্বীকার করেছে যে, ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনজাতি সম্প্রদায়গুলির, পরিবেশকর্মীদের ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুনামের ক্ষতি করতে পারে। ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্য নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের উপর স্থগিতাদেশ (মরেটোরিয়াম) আরোপের কথা ভাবছে, যাতে পরিবেশ ও বিদ্যুতের দামের উপর এর প্রভাব মূল্যায়ন করা যায়। এই প্রবণতা প্রমাণ করে, এআই-এর পরিবেশগত পদচিহ্ন এখন আর কোনো ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ নয়, বরং এই ধরনের প্রকল্পের জন্য একটি কেন্দ্রীয় আর্থিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
তবে অ্যানথ্রোপিকের ফাইলিংটি, শুধুমাত্র একটি কোম্পানির চিত্র নয়। এটি পুরো এআই শিল্পের, বাস্তবতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএনইউ) একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেটা সেন্টারগুলি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪৪৮ টেরাওয়াট- বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, যা ফ্রান্সের মোট বার্ষিক ব্যবহারের প্রায় সমান। এই বিদ্যুতের প্রায় ২০ শতাংশ এআই ওয়ার্কলোডের জন্য ব্যয় হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই চাহিদা, প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছতে পারে। এই বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ঘণ্টা নিঃসরণ, ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৪০০ মিলিয়ন টন সিও২ই-তে পৌঁছতে পারে, যা যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক কার্বন নির্গমনের সমতুল্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি, জলসংকটও এআই শিল্পের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ডেটা সেন্টারগুলির শীতলীকরণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ জল প্রয়োজন হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে, এআই-সম্পর্কিত জলের ব্যবহার পৃথিবীর ১.৩ বিলিয়ন মানুষের বার্ষিক গৃহস্থালির কাজে জলের প্রয়োজনের সমান হতে পারে। এই জল ব্যবহারের চাপ বিশেষত সেই অঞ্চলগুলিতে পড়বে, যেখানে ইতিমধ্যেই জলসংকট বিদ্যমান। ভূমি ব্যবহার, ই-বর্জ্য এবং ক্রিটিক্যাল মিনারেলের উপর নির্ভরতাও এআই-এর পরিবেশগত মূল্যের অংশ হিসাবে দেখা হচ্ছে।
অ্যানথ্রোপিকের ফাইলিংও স্বীকার করেছে, কিছু বিনিয়োগকারী তাদের ইএসজি (পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন) নীতি যথেষ্ট না হলে কোম্পানিতে বিনিয়োগ না-ও করতে পারেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।
অ্যানথ্রোপিকের এই ঘুরপথে জলবায়ু সংকটকে মেনে নেওয়ার ঘটনা, এআই শিল্পের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এআই-এর ‘অদৃশ্য’ পরিবেশগত প্রভাব এখন কর্পোরেট জগতের মূলধারায় প্রবেশ করছে। যে প্রযুক্তি পৃথিবীকে আরও স্মার্ট করতে চায়, সে-ই হয়তো তার নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিকেই ক্ষয় করে চলেছে, এই বোধ জাগ্রত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র
১। মানিকন্ট্রোল। ২০২৬। অ্যানথ্রোপিকস আইপিও ফাইলিং পয়েন্টস টু আ গ্রোয়িং প্রবলেম ফর এআই: ক্লাইমেট চেঞ্জ।
২। ব্লুমবার্গ। ২০২৬। অ্যানথ্রোপিক সাইটস ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাজ রিস্ক টু বিজনেস ইন এস-১।
৩। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। ২০২৬। অ্যানথ্রোপিক আইপিও ফাইলিং ওয়ার্নস অব পাওয়ার, ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট-রিলেটেড রিস্কস।
৪। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয় / ইউরেকঅ্যালার্ট। ২০২৬। বিয়ন্ড এআইস সার্জিং এনার্জি ইউজ: ইউএন ডিটেইলস এস্কালেটিং ওয়াটার, ল্যান্ড, অ্যান্ড সিও২ এমিশন কনসিকোয়েন্সেস।
৫। জাতিসংঘ ভারত। ২০২৬। এআইস এনভায়রনমেন্টাল কস্টস থ্রেটেন ওয়াটার, ল্যান্ড অ্যান্ড ক্লাইমেট।
৬। নেচার কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট। ২০২৬। র্যাপিড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডিপ্লয়মেন্ট ইনক্রিজেস নিয়ার-টার্ম প্রেশার অন গ্লোবাল কার্বন বাজেটস।






