সত্যজিতের ‘অনঙ্গ বৌ’ পাকিস্তান-বাংলাদেশের চিরকালীন হার্টথ্রব

By: Writer in Residence

August 5, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে: Google

তখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার রাজপথে উত্তাল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান চলছে। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের বজ্রহুঙ্কার ‘আয়ুবশাহী মূর্দাবাদ’ রুখতে প্রেসিডেন্ট আয়ুব খান নামিয়ে দিলেন ট্যাংক বাহিনি। গুলি চলছে, কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটছে। ঢাকার সেই রক্তাক্ত সময়টিতে গলিঘুঁজি পেরিয়ে ঘামে ভেজা কোনো যুবক যখন বন্দুকের নল এড়িয়ে যখন বাসায় ফিরত, তার চোখ চলে যেত পাঁচিলে সাঁটানো সিনেমার পোস্টারে ববিতার মু়খখানি।

ববিতা-যিনি পাকিস্তানের চিরকালীন হাটথ্রব হয়ে থেকে গিয়েছেন। এমনকি পাকিস্তান টুকরো হয়ে বাংলাদেশ তৈরির পরেও ইসলামাবাদ, করাচি, পেশোয়ার, লাহোরের সিঁতারা মেহফিলে
চর্চিত তাঁর নাম। আর বাংলাদেশে তিনি কিংবদন্তি, প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া নায়িকা-‘অনঙ্গ বৌ’। এই অভিনেত্রীর বর্নিল জীবনের মোড় ঘুরেছিল সত্যজিত রায়ের সংস্পর্শে।

জেনে নেওয়া যাক ঢাকাইয়া ছবির ববিতার কিছু কথা। আসল নাম ফরিদা আক্তার পপি। তবে বেশি পরিচিত ববিতা নামেই। ১৯৫৩ সালে জন্মসূত্রে পাকিস্তানের নাগরিক। সুন্দরবনবাসিনী তিনি। তাঁর জন্মস্থল বাগেরহাট ভারত সীমান্তের ওপারে বৃহত্তর সুন্দরবনাঞ্চলের অন্যতম জনপদ। সুরূপা ববিতা পাকিস্তানের সিনেমা দুনিয়ায় প্রবেশের আগে তাঁর দিদি সুচন্দা মাত করছিলেন দর্শকদের। পাকিস্তান সিনেমা ইতিহাসে সুচন্দা অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা।

দিদির অভিনয় জীবনে প্রবল আকর্ষিত হন ববিতা। মা চিকিৎসক। বাড়িতে খোলামেলা পরিবেশ। অচিরেই সুচন্দার মতো ববিতা ঢুকে পড়লেন ঢাকাইয়া ফিল্মি দুনিয়ায়। পূর্ব পাকিস্তানবাসী তখন রাজ্জাক-সুচন্দা জুটিতে মশগুল। বিরাট নাম নিয়ে পুরো পাকিস্তান কাঁপিয়ে দিচ্ছিলেন শবনম (ঝর্না বসাক)। এমন ঝড়ের মুখে ববিতার শুকুটা কঠিন তো বটেই।

অবিভক্ত পাকিস্তানের বাংলা ছবির কিংবদন্তি পরিচালক জাহির রায়হান। তাঁর ছবিতে নাম লেখানো মানেই সাড়া ফেলে দেওয়া। দমবন্ধকপা আয়ুবশাহী সামরিক শাসনের পরিবেশে জাহির রায়হানের ছবি যেন একটু প্রশান্তি। একদিন বিক্ষোভরত ক্ষুব্ধ সরকার বিরোধী আন্দোলনে রক্তাক্ত হওয়া পাকিস্তানের বাঙালিরা হঠাৎ দেখলেন গলির মোড়ে, রাস্তার ধারে সিনেমার পোস্টারে জ্বলজ্বল করছে ববিতা নাম।

আয়ুব খান শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের রক্তাক্ত সময়েই আত্মপ্রকাশ হলো ববিতার। পরিচালক জাহির রায়হানের ছবি জ্বলতে সূরজ থেকে শুরু পাকিস্তান জুড়ে ববিতার আলোচনা। আর পিছনে হাঁটা নয়। পরপর হিট বাংলা-উর্দু ছবি। পাকিস্তান কাঁপছে তখন ববিতা নামে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক আন্দোলনের মোড় দ্রুত বাঁক নিচ্ছিল পাকিস্তান জুড়ে। সেখান থেকেই শুরু বাংলাদেশ তৈরির রক্তাক্ত পর্বটি। সত্তরের দশকে পাক অভিনেত্রী-অভিনেতা যারা ঢাকার চলচ্চিত্রে যুক্ত ছিলেন তাঁরাও সরকার বিরোধী আন্দোলনে সামিল হতে থাকেন। তৎকালীন অভিনেত্রী কবরী তাঁর আত্মকথায় সেই সময়টি লিখেছেন।

কবরী, সুচন্দা থেকে ববিতা অবিভক্ত পাকিস্তানের অভিনেত্রীদের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছিল বিতর্ক। একইসাথে চলচ্চিত্রেও সাড়া ফেলছিলেন তাঁরা। সত্তরের সেই দশকে পূর্ব পাকিস্তানের উপর সামরিক আইন আরও জোরদার করে পাক সরকার। ১৯৭১ সালে শুরু হলো বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ। ভয়াবহ সেই মুহূর্ত। মৃতদেহের ঢাকা পড়েছিল ঢাকা মহানগর। চলছিল গেরিলা যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের সেই মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয় ভারতীয়-মুক্তিবাহিনির সামনে পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণ পর্বে। জন্ম নেয় বাংলাদেশ।

রক্তাক্ত সময় পেরিয়ে আসার পর ববিতা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নেন। সত্তরের দশকেই তিনি সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশবাসীর কাছে হৃদয় নিংড়ে উঠে আসা নাম। এই দশকেই ববিতার বিশ্ব পরিচিত হলো।

ঢাকার একটি চলচ্চিত্র পত্রিকায় ববিতার ছবি দেখে চমকে যান সত্যজিৎ রায়। যোগাযোগ করেন ববিতার সঙ্গে। সত্যজিৎ রায় তখন অশনি সংকেত চলচিত্র তৈরি করবেন ঠিক করেছেন। চরিত্রানুযায়ী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টি অনঙ্গ বৌ-কে খুঁজে পেলেন ববিতার মধ্যে। কিংবদন্তি ভারতীয় পরিচালকের সঙ্গে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হার্টথ্রব নায়িকা ববিতার যোগাযোগ হলো। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পেল অশনি সংকেত।

বি়ভূতি়ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি “অশনি সংকেত” এর পটভূমি ১৯৪৩-৪৪ সালে  দুর্ভিক্ষপীড়িত বৃহত্তর বাংলাপ্রদেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনির জন্য অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করলে ততকালীন যুক্ত বাংলার  গ্রামাঞ্চলে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেয়। প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এই ‘ম্যানমেড’ দুর্ভিক্ষ পারিবারিক জীবনে কেমন প্রভাব ফেলেছিল সেকথা লিখেছেন বিভূতিভূষণ। এমন কাহিনি নিয়েই সত্যজিৎ রায় মেতে উঠেছিলেন।

অশনি সংকেত মূল কাহিনিতে অনঙ্গ বৌ চরিত্রটি তীব্র কৌতূহলের কেন্দ্রে। বাংলাদেশি অভিনেত্রী ববিতা একেবারে মিশে গিয়েছিলেন চরিত্রের সঙ্গে। অশনি সংকেত মুক্তি পেতেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন ববিতা। কলকাতা ও ঢাকায় তখন ববিতার নাম নিয়েই চর্চা চলছে। অশনি সংকেত ১৯৭৩ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে গোল্ডেন বিয়ার পুরষ্কার পায়।  এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রশংসিত হন ববিতা।

অশনি সংকেত চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ঢাকার বাণিজ্যিক সিনেমাতে তখন ববিতার কদর প্রবল। ৩৫০ টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের পর টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান।  ১৯৮৫ সালে আরেকবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হন।  ১৯৯৬ সালে শ্রেষ্ঠ প্রযোজক, ২০০২ ও ২০১১ সালে পার্শ্ব চরিত্রের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী। ২০১৬ সালে তাঁকে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য  “আজীবন সম্মাননা”প্রদান করে।

এমনই ববিতা, তবে পশ্চিমবঙ্গে আর তেমন সাড়া ফেলতে পারেননি। তবে সত্যজিতের ক্যামেরায় আলোছায়া হয়ে রয়েছেন।

সৌজন্যে:

  • ববিতার কষ্ট দূর করতে ঈদের আয়োজন করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: বিবিসি বাংলা
  • Babita remembers her ‘guiding light’ Soumitra Chattopadhyay: TOI

More Articles