সংকীর্তন

By: Anasuya Sen

August 4, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে: Google

হিন্দী ও দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার বিখ্যাত নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী এস-পি-বালাসুব্রাহ্মনিয়ম পরলোকগমন করেছেন আজ প্রায় একবছর হতে চললো | দক্ষিণভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের নেলোর গ্রামের কাছে এক গোঁড়া তেলেগু ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ৪ঠা জুন | তাঁর পিত এস-পি সাম্বামূর্ত্তি ছিলেন সে অঞ্চলের এক জনপ্রিয় গায়ক ও শিল্পী যিনি অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে ভক্ত শ্রোতাদের ‘হরিকথা’ পরিবেশন করতেন | এক চিত্তাকর্ষক ভঙ্গীতে গল্প শোনাতে শোনাতে কাব্য, কণ্ঠসঙ্গীত, নাট্যাভিনয় ও নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি দর্শক শ্রোতাদের সামনে শ্রীমদ্ভাগবত পুরানের অসামান্য দর্শন ও ধর্মশিক্ষাকে সহজ, সরল ও বোধগম্যভাবে তুলে ধরতেন |

 

সংবাদপত্র থেকে একথা অবগত হওয়া মাত্র আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল শ্রীরাধাকৃষ্ণের লীলা-সংকীর্তনের এক ঘরোয়া আসরের কথা | বছর তিনেক আগে আমার এক বন্ধুর ঠাকুমার শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রিত ওই, বীরভূম জেলার সিউড়িতে গেছিলাম | নিয়মভঙ্গের অনুষ্ঠানের দিন সন্ধ্যাবেলা বাড়ীর প্রশস্ত উঠোনে সামিয়ানা খাটিয়ে সংকীর্তনের আসর বসানো হয়েছিল | উঠোনের মাঝখানে ছিল একটি সুউচ্চ বাঁধানো তুলসী মঞ্চ | মঞ্চটি ফুল-মালা দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল | তুলসী মঞ্চে সন্ধ্যাপ্রদীপ ও ধূপ প্রজ্জ্বলিত করে, শাঁখ বাজিয়ে সমবেত প্রণাম নিবেদনের পর তাদের পরিবারের লোকজন, অতিথিরা এবং পল্লীবাসীরা মাটিতে পাতা গালিচার উপর চারপাশ জুড়ে বসলেন | তুলসীমঞ্চের সামনে বিশেষ আসন গ্রহণ করলেন কথক ঠাকুর তথা কীর্তন গায়ক এবং তাঁর সঙ্গতকারী এক বংশীবাদক |

 

আমার বন্ধুর বাবা তাঁদের দুজনকে প্রণাম করলেন এবং গলায় রজনীগন্ধা ফুলের গোড়ের মালা পরিয়ে দিলেন | চারপাশ থেকে বেজে উঠল শাঁখ, সমবেত উলুধ্বনি ও হরি-হরি বোল-এর প্রণামাতানো পরিবেশে, শুরু হলো ‘শ্রীরাধার মানভঞ্জন পালা’ | শিল্পীরা প্রথমেই গৃহস্থ দেব-দেবীদের উদ্দেশ্যে, গ্রামস্থ দেব-দেবীদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানানোর পর উচ্চঃস্বরে গেয়ে উঠলেন জয় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর জয়, জয় প্রভুনিত্যানন্দের জয়, জয় শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর জয়, জয় শ্রীবাসাদি গৌরাঙ্গ পার্ষদদের জয়, হরি-হরি-বোল, হরি-হরি-বোল | এরপর মূল গায়েন শুরু করলেন গৌরচন্দ্রিকা | তার পর এলেন পালা কীর্তনের সূচনা-পর্বে | ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপড়ে শ্রীরাধা কেন মান করেছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ কেমন করে, কত অনুনয়ে-বিনয়ে শ্রীরাধার মান ভঞ্জন করেছিলেন সেটাই ছিল পালা গানের উপজীব্য | এই পালাগানের অসামান্য অভিনয়ের হাত ধরে অতি সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সময়ে সময়ে হাজির হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের প্রানপ্রিয় সখারা, শ্রীরাধার অষ্টসখীবৃন্দ | আবির্ভুত হচ্ছেন নারদ ঋষি তাঁর বিনা নিয়ে, আবির্ভুত হচ্ছেন ভগবান শিব এবং আরও কত দেব-দেবী | একজনমাত্র কীর্তনগায়ক গলায় শ্রীখোল ঝুলিয়ে সুন্দর বাদন, সুউচ্চ অভিনয় দক্ষতা, কথাকত, সঙ্গীতের সুরের আরোহন অবরোহন এবং কণ্ঠ- লালিত্যের অপূর্ব উপস্থাপনা ও মনোমুগ্ধকর নৃত্য (স্ত্রী এবং পুরুষ উভয় ভূমিকায়) পরিবেশনের মাধ্যমে দর্শক শ্রোতাদের ভক্তিরসে আপ্লুত করতে পারেন এবং চোখের জলে ভাসিয়ে দিতে পারেন —– তা স্বচক্ষে না দেখলে কোনদিন উপলব্ধি হতো না | এরই সঙ্গে কাব্য-নাট্যের Situation – এর সাথে সঙ্গতি রেখে বাঁশির সুরে অসামান্য আবহ -সঙ্গীত পরিবেশন করলেন বংশীবাদক | কোনও প্রশংসায়ই যথেষ্ট নয় তাঁর জন্য |

 

পালা-নাট্যের মধ্যবর্তী পর্বে এলো সেই কাহিনী যেখানে শ্রীকৃষ্ণ শিক্ষা দিচ্ছেন —– কেন অভিমান বর্জন করা উচিত | পর্বটি এরকম—– শ্রীকৃষ্ণ প্রচুর অনুনয় বিনয় করেছেন শ্রীরাধার অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য | কিন্তু শতঅনুরোধেও শ্রীরাধার মন পাচ্ছেন না | এমন সময় আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে শ্রীকৃষ্ণ বললেন শ্রীরাধাকে —— দ্যাখো প্রিয়ে আমার গভীর ভালবাসা বর্ষার ঘনঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘের অবিশ্রান্ত বারিধারা হয়ে তোমার উপড় ধরে পড়তে চেয়েছিল | কিন্তু তোমার মানপাবনের প্রচন্ড বাতাসের আঘাতে সেই বারিপূর্ণ মেঘমালা উড়ে চলে গেল আর তুমি স্নিগ্ধবর্ষণ হতে বঞ্চিত রয়ে গেলে |

 

এই অপূর্ব কাব্য-নাট্য-সঙ্গীতের উপস্থাপনা দেখে ও শুনে সকলে হরি-হরি-বোল, হরি-হরি-বোল ধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করলেন | এ এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা | গ্রামবাংলার এক শিল্পীর পক্ষে Performing Art -এর উপস্থাপনায় অতি উচ্চ নিদর্শন | এই প্রকারে দর্শক শ্রোতাদের শ্রদ্ধা ভক্তিকে কত সহজ সরল ভাবে ঈশ্বরের পাদপদ্যে পৌছিয়ে দেওয়া যায় |

 

‘সঙ্গীতের মুক্তি’ প্রবন্ধে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন —- ‘চৈতন্যের আবির্ভাবে বাংলাদেশে বৈষ্ণব ধর্ম যে হিল্লোল তুলিয়াছিল সে একটা শাস্ত্রছাড়া ব্যাপার | তাহাতে মানুষের মুক্তি-পাওয়া চিত্ত ভক্তিরসের আবেগে আত্মপ্রকাশ করিতে ব্যাকুল হইল | সেই অবস্থায় মানুষ কেবল স্থাবরভাবে ভোগ করে না, অচল ভাবে সৃষ্টি করে | এই জন্য সেদিন কাব্যে ও সঙ্গীতে বাঙালি আত্মপ্রকাশ করিতে বসিল, তখন পয়ার ত্রিপদীর বাঁধা ছন্দে প্রচলিত রাধাকাহিনী পুনঃপুনঃ আবৃত্তি করা আর চলিল না | বাঁধন ভাঙিল—– সেই বাঁধন ভাঙা বস্তুত প্রলয় নহে, তাহার সৃষ্টির উদ্দম আকাশে নীহারিকার যে ব্যাপকতা তার একটা অপরূপ মহিমা আছে | কিন্তু সৃষ্টির অভিব্যক্তি সেই ব্যাপকতায় নহে | প্রত্যেকে তারা আপনাকে আপনি স্বতন্ত্র হইয়া নক্ষত্রলোকের বিরাট ঐক্যকে যখন বিচিত্র কোরিয়া তোলে, তখন তাহাতেই সৃষ্টির পরিণতি | বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব কাব্যেই সেই বৈচিত্র চেষ্টা প্রথম দেখিতে পাই | সাহিত্যে এই রূপ স্বাতন্ত্র্যে উদ্যোমকেই ইংরেজিতে ‘রোমান্টিক মুভমেন্ট’ বলে | এই স্বাতন্ত্র্যে চেষ্টা কেবল কাব্য ছন্দের মধ্যে নয়, সঙ্গীতেও দেখা দিল |”

 

রবীন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন —– “বাংলায় একদিন বৈষ্ণবভাবের প্রাবল্যে ধর্মসাধনায় বা ধর্মরসভোগে একটা ডিমোক্রেসি যুগ এলো | সেদিন সম্মিলিত চিত্তের আবেগের সম্মিলিত কণ্ঠে প্রকাশ পেতে চেয়েছিল | সে প্রকাশ সভার আসরে নয়, রাস্তায় ঘাটে | বাংলার কীর্তনের সেই জনসাধারণের ভাবছ্বাস গলায় মেলাবার খুব একটা প্রশস্থ জায়গা হলো |”

 

কলকাতার বরানগর পাঠবাড়ির সেবা – প্রতিষ্ঠাতা পরম বৈষ্ণব রামদাস বাবাজি (১৮৭৬ – ১৯৫৩ ) বলেছেন —– ” শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু প্রবর্তিত নাম সংকীর্তনে ইর্ষা , দ্বেষ , জাতপাতের বিভেদ আদি মুছে গিয়ে প্রেমের উদয় হয় | ক্রমে মানুষের অন্তরে বিস্মৃত কৃষ্ণ- স্মৃতি জাগে | তারপর দেখে বিশ্বজুড়ে সবি ,সবাই কৃষ্ণদাস | তখন নিখিল বিশ্বের  সবকিছুই ‘ আমার প্রভুর ‘ এ বোধ আসবে | বিশ্ব বৈষ্ণবের সেবা করে ধন্য হবে , সুখী হবে | “

 

প্রকৃত পক্ষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দেশের বুকে একটি সমাজবিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন | সেই বিপ্লবের অভিঘাতে শুধু ধর্ম-দর্শন চর্চায় নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে, শিল্প-সাহিত্য-নাট্য-সঙ্গীত চর্চার জগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল | নিত্য-নতুন সৃষ্টির দ্বার খুলে গিয়েছিল | সেই বিপ্লবের ঢেউ শুধুমাত্র বঙ্গভূমিকে আলোড়িত করেনি, ওড়িষ্যাপ্রদেশ এবং দক্ষিণভারতেও সেই ঢেউ আছড়ে পড়েছিল | মহাপ্রভুর অনুগামীদের হাত ধরে সেই আন্দোলন ত্রিপুরা এবং মণিপুর রাজ্যও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল | সেই আন্দোলনের প্রভাব সমগ্র দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল | কিঞ্চিৎ স্তিমিত ভাবে হলেও, আজও সেই আন্দোলন জাগরুক আছে |

 

বৈষ্ণব ভক্তদের মোতে নয় প্রকার ভক্তির মধ্যে নামসংকীর্তনই সর্বশ্রেষ্ঠ | শ্রীকৃষ্ণের নাম আর নামী (অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং) অভিন্ন | কীর্তনীয়াদের কাজ হলো নামীকে মাটির মানুষের কাছে নামিয়ে এনে তাঁর কৃপামধুর্য্য বিতরণ করা | এযুগে এর চাইতে মহত্তর দান আর নেই | পরম বস্তু নিজে ভোগ না করে যে অপরকে বিলায়, সেই তো প্রকৃত বৈষ্ণব |

Source: “Songitchinta” By Rabindranath Tagore and Newspaper