মরমীয়া সুফি সাধনার ক্ষেত্র কাশ্মীর

By: Anasuya Sen

August 5, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে: Google

কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে কয়েক হাজার সুফি তীর্থস্থান | কাশ্মীর উপত্যকা ‘পীরাওয়ার’ নামেও খ্যাত | ‘পীরাওয়ার’ কথার অর্থ হলো সুফি সাধকদের উদ্যান | বলা হয়, সুফি অতীন্দ্রিয়বাদীদের ধর্মপ্রচারের কারণেই কাশ্মীর উপত্যকার জনগণ ইসলাম ধর্মকে নিজের করে নিয়েছিলেন | এইসব ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কুবরাভি সুফি সাধক মীর সঈদ আলি হামাদানি এবং তাঁর শিষ্যগণ | কাশ্মীর চর্চার আতিনায় অন্যতম বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ চিত্রলেখক জুৎসির এমনটাই মত | এইসব সুফি সাধকরা কোনওএকটি স্থানে আবদ্ধ হয়ে থাকতেন না | তাঁরা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে ধর্মের বাণী নিয়ে মানুষের দুয়ারে উপস্থিত হতেন | তাঁদের হাত ধরেই কাশ্মীরের গ্রামে গ্রামে নিত্য নতুন কারুশিল্প ও শিল্প-চর্চার দক্ষতার শিক্ষা পৌঁছেছিল | অনেকের মতে কাশ্মীরের বিখ্যাত সুফি সাধক শাহ-ই-হামাদান-এর সঙ্গী হয়ে এসেছিল একদল পরিযায়ী শিল্পী, হস্তলিপি – বিষারদ, স্হপতি ইত্যাদি | তারাই কাশ্মীর উপত্যকায় কাঠ-খোদাই, শাল-বয়ন, কার্পেট বয়ন, পুস্তকের ও চিত্রের উপড়ে অপূর্ব সুন্দর হস্তাক্ষরের অলঙ্করণ ইত্যাদি শিল্প-রীতির প্রবর্তন করেন | এআইডিওকম ভাবে কাশ্মীরের সমাজ ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করেছিলেন সুফি সাধকরা |

সুফি অতীন্দ্রিয়বাদ এবং ভ্রাতৃজ্ঞানে সবাইকে একসঙ্গে আপন করে নিয়ে চলার শিক্ষার আবেদন আজও এই সংঘাতপূর্ণ সমস্যাসঙ্কুল কাশ্মীরের বুকে সেখানকার মানুষদের আঘাত সইবার শক্তি জোগাচ্ছে |

সেক্ষেত্রে সুফি-সাধনা এবং তার মূল্যবান দিকগুলি প্রতি আলোকপাত করা বিশেষ প্রয়োজন |

একথা বলা যায় যে একদিকে কাশ্মীরি পন্ডিত ও অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ চলতে থাকলেও, সামগ্রিক ভাবে উপত্যকায় ধর্মীয় সহনশীলতার বাতাবরণ এখনও মুছে যায়নি | এই সহনশীলতার মূলত দুটি উৎস —— বিবিধ জনগোষ্ঠীর দ্বারা গড়ে ওঠা সমাজ এবং অন্যদিকে সুফি সাধকদের মানবতাবাদী শিক্ষার প্রভাব |

ইসলাম ধর্মমতের আঙিনা থেকে উঠে এলেও সুফি সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন ধর্মমতের মানুষদের জন্যেও এক মিলনক্ষেত্র রচনা করেছে | এর প্রকৃষ্ট প্রমান হচ্ছে সুফি ধর্মাবলম্বীদের বাৎসরিক ‘উরস’ উৎসব | একজন প্রাচীন সুফি-সাধকের মৃত্যুবার্ষিকীর এই উৎসবে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মানুষরাই অংশগ্রহণ করেন | কাশ্মীর উপত্যকায় এমন বহু তীর্থস্থান আছে যেখানে কাশ্মীরি মুসলিম কাশ্মীরি পন্ডিত উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা শ্রদ্ধা-ভক্তি নিবেদন করতে যান | এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো চতুর্দশ শতাব্দীর সাধক শেখ নুরুদ্দিন ওয়ালির স্মৃতি-বিজড়িত চারার-এ-শরিফ | অন্য দৃষ্টান্তগুলো হলো আয়িশামুকমে অবস্থিত বাবা জইনুদ্দিনের দরগা এবং শ্রীনগরে অবস্থিত শেখ হামজা মাখদম-এর দরগা |

কাশ্মীরের সুফি-সংস্কৃতি যে শুধুমাত্র বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সৌহাদ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তা নয় | এটি একইসঙ্গে পুরুষ শাসিত সমাজের মধ্যে মহিলাদের জন্যেও এক মুক্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে | এরফলে কাশ্মীরের মহিলারা এখন বৃহৎ মসজিদ ও ধর্মস্থানে উপস্থিত হয়ে নামাজ পাঠ করতে পারেন, যেমন —– দস্তগীর সাহিব, মখদুম সাহিব, হযরতবাল মসজিদ ইত্যাদি |

কাশ্মীর উপত্যকা বর্তমানে লাগাতার সংঘাত, সংঘর্ষ ও মৃত্যুর সাক্ষী | স্বজন হারানোর  ব্যাথা সেখানকার মানুষদের জীবনে গভীর ভাবে রেখাপাত করেছে | কিন্তু সুফি-সংস্কৃতির শিক্ষার প্রভাবে উপত্যকার বহু মানুষ বিশ্বাস করেন যে জীবনের কোনও আঘাত, কোনও স্বজন-বিয়োগ-ব্যথাই অর্থহীন নয় | পরম কল্যাণময় ঈশ্বরের করুনার স্পর্শ সবকিছুর মধ্যেই আছে এবং সেই করুণাই তাদের জীবনে দুঃখ-বেদনার থেকে উত্তরণ ঘটাবে | তাই সুখে-দুঃখে সম্পদে-বিপদে উপত্যকার মানুষেরা বিভিন্ন তীর্থ -স্থানের প্রতিটি অনুষ্ঠানে সমবেত হয়ে পরলোকগত সাধকদের পুন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন | বিগত বছরে (২০২০) সেখানে গুজব ছড়িয়েছিল যে আকাশ থেকে একটি গ্রহপিণ্ড খসে পড়বে এবং পৃথিবীকে পিষ্ট করে দিয়ে যাবে | কিন্তু সেই গুজবকে উপেক্ষা করেই কাশ্মীরের ভক্তরা সমবেত হয়েছিলেন চারার-এ-শরিফ তীর্থস্থানে প্রার্থনা জানাতে | ঈশ্বরের অমোঘ বিধান, তাঁর নির্দেশিত পথ মূল্যবোধকে যারা নম্রতার সঙ্গে মেনে নেন এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে যারা থাকেন তারাই সেখানে প্রকৃত মুসলমানের গুনবিশিষ্ট বলে বিবেচিত এবং সম্মানিত হন —- এমনটাই ব্যাখ্যা করেছেন বিশিষ্ট গবেষক তারিক রামাদান | এদিক থেকে দেখলে বিবেচনায় আসে যে সুফি-সংস্কৃতি যেন জাগতিক আসক্তির বিষয়গুলি থেকে মুক্ত হতেই তৎপর |

তবে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন সময় সময় সুফি আন্দোলের প্রবক্তারা রাজনীতির আঙিনাতেও অবতীর্ণ হয়েছেন | দৃষ্টান্তস্বরূপ ইতিহাসের পাতা থেকে বলা যায় যেমন —- ফরাসী ও ইটালিয়া উপনিবেশবাদ ও তার প্রভুত্বের বিরুদ্ধের কোয়াদিরিয়া আন্দোলনে সামিল হয়েছিল আলজেরিয়ার অধিবামীবৃন্দ এবং লিবিয়ার মানুষের যোগদান করেছিল সানুসি সুফি আন্দোলনে |

এই সানুসি সুফি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ওমর-আল-মুখতার | তাঁর জীবন এবং সংগ্রামকে আধারিত করে ১৯৮১ সালে একটি চলচিত্র নির্মাণ হয়েছিল Lion of the Desert — এই নামে সেই থেকে তিনি কাশ্মীরি যুবসমাজের কাছে একজন বীর হিসাবে পরিগণিত হন |

ঠিক এইরকম ভাবে ডোগরা শাসনের হাত থেকে মুক্তিলাভের আন্দোলনেও সুফি-ধর্মনেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন|

কাশ্মীর উপত্যকার ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে চর্চা করেন এমন অনেক গবেষক ব্যক্তি আছেন যারা কাশ্মীরি অস্মিতাকে, ‘কাশ্মীরিয়ৎ’ বলে বর্ণনা করেন | এই ‘কাশ্মীরিয়ৎ’ – এর অন্যতম ভিত্তিভূমি হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেকার সৌভ্রাতৃত্ত্বা —-যেটি নিঃসন্দেহে সুফি ধর্মচর্চার অবদান |