বৈদ্যের বাটী বৈদ্যবাটী

By: Writer in Residence

August 4, 2021

Share

উনবিংশ শতাব্দীতে যে সমস্ত মানুষ অক্লান্ত প্রচেষ্টা, সাহসী পদক্ষেপ. পরিশ্রম ও নিষ্ঠার জোরে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদের পুরোনো অন্ধ সংস্কার ও কূপমুন্ডুকতার অচলায়তন থেকে উদ্ধার করে শিক্ষা ও সভ্যতার অলোকপ্রাপ্ত জগতে পৌছিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের অবদানকে স্বরণ করার জন্য ‘শব ব্যবচ্ছেদ থেকে দেহদান, এক অন্য ইতিহাস’ শীর্ষক আলোচনার ব্যবস্থা করেছিলেন একটি ইতিহাসচর্চা গোষ্ঠী | নাম — ‘ভয়েজেস ইনটু দ্য পাস্ট : অতীত প্রবাহ |’ ১৭ জুলাই, ২০২১ বিকালবেলা সেই সশ্রদ্ধ আলোচনাটি পরিবেশন করা হলো ফেসবুকে |

 

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সেযুগের ইংরেজি চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিভাবান চিকিৎসক পন্ডিত মধুসূদন গুপ্ত | মানবদেহের অসংখ্য অঙ্গ, সেগুলির সংস্থান, সেগুলির পারস্পরিক সম্মন্ধ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ইত্যাদির বিষয়ে চাক্ষুষ ও স্পষ্ট ধারণা অর্জন করার জন্য হাতে-কলমে শব ব্যবচ্ছেদ, চর্চা শুরু করার ভীষণ প্রয়োজন অনুভব করছিলেন শিক্ষকেরা | কিন্তু কার এত মনের জোর আছে যে জাতপাত, ছোয়া-ছুয়ি ও অসংখ্য ধর্মীয় কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে এগিয়ে আসবে শুধু বিদ্যা চর্চাকে অগ্রগণ্য করে? এগিয়ে এলেন পন্ডিত মধুসূধন গুপ্ত | তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ | তিনি তখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান | ব্রিটিশ শাসিত সমগ্র ভারতে সেই প্রথমবার, ১৮৩৬ সালে কলেজের Anatomy বিভাগে তিনি একটি মৃতদেহের ব্যবচ্ছেদ করলেন | তাই তাঁকে ‘The First Anatomist ‘ এই অভিধায় ভূষিত করা হলো | সেদিন তাঁর সম্মানে ব্রিটিশ শাসকের নির্দেশে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ২১বার তোপধ্বনি করা হয়েছিল |

কিন্তু অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন সেই যুগের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে সেই শবব্যবচ্ছেদ ক্রিয়া ছিল একটি দুঃসায়সিক প্রচেষ্টা | মধুসূদন গুপ্তের নিবাস ছিল হুগলি জেলার শ্রীরামপুর থানার অন্তর্গত বৈদ্যবাটী গ্রামের বৈদ্য পাড়াতে | (সেই গৃহ আজও স্বমহিমায় বিদ্যমান | তাঁর কৃতিত্বের কাহিনী সংক্ষেপে একটি মার্বেল পাথরের ফলকে গৃহের প্রবেশ দ্বারের পাশে প্রোথিত আছে |) বৈদ্যজাতি ভুক্ত একটি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮০০ খ্রিষ্ট্রাব্দে | মানসিকতার দিক থেকে সেযুগের বৈদ্য পাড়ার অধিবাসীরা অনেক পশ্চাৎ পদ ছিলেন | মধুসূধন বাবু যে এইরকম একটি সংস্কার ভাঙা দুঃসাহসিক কাজ করতে চলেছেন সেকথা জানতে পেরে এলাকার মানুষেরা নির্ধিষ্ট দিনে তাঁকে আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন | সেকথা আঁচ করতে পেরেছিলেন মধুসূধন বাবু | জনশ্রুতি আছে —– আগেরদিন মধ্যরাতে গোপনে, যখন সারা বৈদ্য পাড়া নিদ্রামগ্ন তখন একাকী বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেন | এইভাবে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে এবং প্রচুর শারীরিক ক্লেশ সহ্য করে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে এসে উপস্থিত হন | বিদ্যানুরাগ একেই বলে | তিনি আন্তরিক অনুরাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, তাই আপামর ভারতবাসী আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুফল পেতে সমর্থ হয়েছিল | বাঙালির জাতীয় জীবনে অসংখ্য গর্বের বিষয়ের মধ্যে এটিও একটি |

তবে এই গর্বের বিষয় বৈদ্যবাটী এলাকার খুব কম মানুষ জানেন বা মনে রেখেছেন | এলাকার একটি রাস্তা কেবলমাত্র মধূসূধন গুপ্তর নাম উৎসর্গীকৃত |

বৈদ্যবাটির ইতিহাস ঘাটলে আরও কিছু স্বরণীয় বস্তু উঠে আসে | বিখ্যাত নিরদর্পণ নাটকের রচয়িতা কবি দীনবন্ধু গুপ্তের রচনায় বৈদ্যবাটির সম্মন্ধে এই রকম উল্লেখ পাওয়া যায় —

ভদ্রপল্লী বৈদ্যবাটী ,

পন্ডিতের বাস |

শাস্ত্রআলাপন যথা ,

হয় বারোমাস ||

উনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট লেখক টেকচাঁদ ঠাকুর রচিত ‘আলালের ঘরের দুলাল’- কে সেযুগের বন্ড সমাজের একটি অবিসংবাদী দর্পন হিসাবে গণ্য করা হয় | লোককথা অনুযায়ী টেকচাঁদ ঠাকুর গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন এই বৈদ্যবাটী গ্রামেই |

কথিত আছে —— ‘গঙ্গার পশ্চিম কূল বারাণসী সমতুল’ | গঙ্গার পশ্চিমকূলে অবস্থিত এই বৈদ্যবাটী নগরের আরেকটি নিদর্শনের সঙ্গে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নাম জড়িয়ে রয়েছে | সেটি ‘নিমাইতীর্থ ঘাট’ | জনশ্রুতি অনুযায়ী শ্রী কেশব ভারতীয় নিকট দীক্ষা গ্রহণের পর কাটোয়া থেকে গঙ্গাপথে নৌকাযোগে নিমাই সন্যাসী বৈদ্যবাটির ঘাটে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং সেই এলাকায় স্বল্প কিছুদিন বিশ্রাম গ্রহণের জন্য থেকেছিলেন | বিশ্রামান্তে বৈদ্যবাটী থেকে পদব্রজে পুরী ধামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন | বাংলা বছরের শ্রাবন মাসে এবং চৈত্র মাসে এই নিমাইতীর্থ ঘাট থেকে ঘটে অথবা ঘোড়ায় করে গঙ্গাজল তুলে তারকেশ্বর ধামে বাবা তারোকনাথের মাথায় জল ঢালার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী |

বৈদ্যবাটী-শেওড়াফুলি যুগ্ম শহরের আরেক উজ্জ্বল ইতিহাস প্রসিদ্ধ নিদর্শন হলো শেওড়াফুলি রাজ্ পরিবারের প্রতিষ্ঠিত গঙ্গা তীরবর্তী মা নিস্তারিণীর কালী মন্দির | এখানে মা দক্ষিণাকালী রূপে বিরাজ করছেন |

 

একেকটি এলাকার কিছু চিহ্নিত মানুষের মধ্যে কিছু মহামূল্যবান সারবত্তা (Potentiality) থাকে | তাঁরাই হন ইতিহাসের শ্রষ্টা এবং ইতিহাসের ধারক-বাহক |