লালন ফকির

By: Writer in Residence

August 4, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে: Google

“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায় |

 ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায় |”

এ গান আপামর বাঙালির —- যারা সেই ফকিরকে অন্তরের অনুরাগ দিয়ে আজও লালন করে চলেছেন |

লালন সাঁই – এর শিষ্যদের অনুমান অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৭৭৪ সালে | তাঁর মৃত্যু হয় ১৮৯০ সালে | বেশির ভাগ শিষ্যের মত অনুযায়ী তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্ঠিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়ানের গোড়াই নদীর তীরে ভাঁড়ারা গ্রামে লালন ফকিরের জন্ম | তাঁর পূর্বনাম জানা যায়না, তবে বাবার নাম মাধব কর, মা পদ্মাবতী |

 

আবার ১৮৮০ সালের ১৯শে জানুয়ারী রেজিস্ট্রি করা একটি দলিলের বয়ান থেকে জানা যায় —- “পাট্টা গ্রহীতা-শ্রীযুত লালন সাঁই, পিত মৃত সিরাজ সাঁই, জাতি মুসলমান, পেশা ভিক্ষা ইত্যাদি | সাকিন ছিউরে, পরগণা ভ্রাহিমপুর, ইষ্টাসন ভলকো, সাব রেজিস্টারি —- কুমারখালী |”

 

এখান থেকেই লালনের জাতি-ধর্মের পরিচয় নিরুপন জটিল হয়ে পরে | তবে সাঁইয়ের একটি পরিচয় নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই —- তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা এমন একজন মানুষ যিনি জাতি-ধর্মের সকল গন্ডির উর্ধে থেকেছেন জীবনভর |

 

ছেলেবেলায় বাবা মারা যান | আর্থিক অনটনের কারণে লেখা পোড়াও তেমন হয়নি | তাঁর মামার বাড়ি ছিল চাপড়ায় | কিন্তু মামার বাড়ির পরিবেশ তাঁর কাছে অসহ হয়ে উঠল | মনের দুঃখে উদাস হয়ে মাঠে -ঘাটে-প্রান্তরে ঘুরে-ঘুরে বাড়াতেন | কোনও ফকির মাঠের উপর দিয়ে গান গাইতে গাইতে গেলে লালন তাঁর পিছু নিতেন, একতারা বাজানো শিখতেন | এমনি করে বাল্যকাল থেকেই ফকির, বাউল, একতারা আর উদাসী ভাব তাঁর জীবনসঙ্গী হয়ে গেল |

 

বাবার মৃত্যুর পর সংসারের সব দায় তাঁর উপর এসে পড়ল | অল্প বয়সে বিয়েও হলো | কিন্তু নানা রকম সামাজিক উৎপীড়নের কারণে মা আর নতুন বৌকে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে পথে বেরিয়ে পড়তে হলো | হাঁটতে হাঁটতে সেই ভাঁড়ারা গ্রামের শেষ প্রান্ত দাসপাড়ায় এসে পৌঁছালেন | সেখানেই নতুন করে ঘর বাঁধলেন | কিন্তু ওই যে উদাসীভাব, ঘরে মন টিকতে দেয়না | তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে – এ দেহটাই কি তবে ঘর, খাঁচা নয়তো? শুরু হলো এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা |

 

একবার দাসপাড়া গ্রাম থেকে অনেকে চললো মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে গঙ্গা স্নানে | লালনও সঙ্গী হলো তাদের | বেশ কাটলো কদিন | কত নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো, কত নতুন কথা শুনলো | কিন্তু গঙ্গা স্নান সেরে ফেরার পথে লালনের গায়ে তেড়ে জ্বর এলো | সেই জ্বর গুটি বসন্তের | জ্বরের ঘোরে লালনের ভুল বোকা শুরু হলো, জ্ঞান হারিয়ে ফেলল | সকলে প্রমাদ গুনল | এই বিদেশ বিভুঁইয়ে কে দেখবে তাঁকে? সকলকে গ্রামে ফিরতে হবে তো! রাত্রিরে প্রবল জ্বর এলো, কোনও সার নেই শরীরে | সংক্রামক ব্যাধির ভয়ে সঙ্গীর তাঁর দেহ ফেলে রেখেই পালাল | কয়েকজন আবার নামমাত্র মুখাগ্নি করে কলার ভেলায় ভাসিয়ে দিল তাঁর দেহ |

 

গঙ্গা স্নানের যাত্রীরা দাসপাড়ায় ফিরে আসতে সারা গ্রামে রোটে গেল লালনের মৃত্যু সংবাদ | কান্নায় ভেঙে পড়লেন তাঁর মা এবং বউ | সর্বহারার অবস্থা হলো তাদের | এদিকে গঙ্গা নদীর স্রোতের তালে-তালে কলার ভেলায় লালনের দেহ ভাসতে ভাসতে চলল, কত গ্রাম পাড় হয়ে গেল | এমনি করে ঢেউয়ের ধাক্কায় ভাসতে ভাসতে কলার ভেলা একটা গ্রামের স্নানের ঘাটের কাছে একটা মস্ত বড় গাছের শিকড়ে এসে আটকে গেল | সেই ঘাটে তখন কয়েকজন গ্রাম্য বধূ স্নান করছিলেন আর নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন | হটাৎ মহিলারা একটি পুরুষ কণ্ঠের উঃ   শব্দ   শুনে সচকিত হলেন | কথাবার্তা থামিয়ে কান পেতে রইলেন | আবার ওই শব্দ, ক্ষীণ কণ্ঠের | ফিরে তাকিয়ে দেখেন গুঁড়ির কাছে ভাসমান একটি ভেলায় একটি পুরুষ মানুষের দেহ | আয়োজ করছে, মানে বেঁচে আছে তো? একজন বাদে অন্য মহিলারা ভয়ে পালিয়ে গেলেন | এদিকে তেষ্টায় লালনের ঠোঁট, গলা শুকিয়ে গেছে তবু ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন – জল, জল | জলের কথা শুনে মহিলাটি আঁতকে উঠে বললেন —– “আমরা মুসলমান” উত্তরে অনেক কষ্টে লালন বললেন —- “মানুষের আবার জাত কি? একটু জল দাও, জল” | কথা শুনে মুসলমান রমণীর মনে দোয়ার সঞ্চার হলো | লোকজন ডেকে লালনকে নিয়ে গেলেন নিজের ঘোরে | সেবায় শুশ্রূষায় সুস্থ করে তুললেন তাঁকে | কি নাম সেই রমণীর, তাঁর স্বামীর নাম কি?

 

গবেষকদের কেউ কেউ বলেছেন ওনার স্বামীর নাম মলন কারিকর, গ্রাম-ছেউড়িয়া | আর তার ওই দোয়াবতী স্ত্রীর সেবাতেই লালন সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন | তাদের ঘড়ে শে সময় সিরাজ সাঁই এসেছিলেন | সিরাজ সাঁইয়ের দেওয়া ওষুধ খেয়ে লালনের রোগ সারল | শরীরে বল ফিরে পেলেন | কিন্তু গুটি বসন্ত রোগ চিরদিনের মতো কেড়ে নিলো চোখের দৃষ্টি আর গোটা মুখ জুড়ে রোএ গেল বসন্তের দাগ |

 

কোনও কোনও গবেষক বলেন মলম কারিকর নয়, লালনকে সিরাজ সাঁই ঠাঁই দিয়েছিলেন | তার করুনায় মুগ্ধ হয়ে লালন সিরাজের সঙ্গেই পথে বেরিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন | কিন্তু সিরাজ তাঁকে সঙ্গে নেননি |

 

লালন ফিরে এলেন নিজের গ্রামে, নিজের ভিটায় | তাঁকে দেখে তার মা এবং স্ত্রী বিস্ময়ে ও আনন্দে আন্তহারা হলেন | কিন্তু গ্রামের সমাজ লালনকে মেনে নিল না | রটিয়ে দিল লালনের জাত গিয়েছে শে মুসলমানের অন্ন-জল খেয়েছে | ভাঁড়ারা গ্রামের মানুষ তাঁকে ভিটে ছাড়া করল | দুঃখে ও যাতনায় লালনের মন ভেঙে গেল | অভিমানে একতারা হাতে নিয়ে আবার পথে বেরিয়ে পড়লেন লালন | তাঁর তখন মধ্য যৌবন | তাঁর মনে বৈরাগ্যের উদং হলো | ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার সময় বউকে ডেকেছিলেন কিন্তু সে সঙ্গে এলোনা | তাঁর মনে খালি প্রশ্নের ঢেউ উঠতে থাকল —- এ কেমন জাত? এ কেমন ভগবানরে বিচার? সুতীব্র অভিমানে ও কান্নায় তাঁর অন্তেরের গভীর থেকে উঠে এসেছে এই  গান ——

               “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে?

                লালন বলে জেতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে” |

 

পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে আবার দেখা হয়ে গেল সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গে | সিরাজ ছিলেন বাউলগুরু | লালনের শিষ্যদের মতে — “সিরাজ হলেন আমাদের সাঁইয়ের গুরু দরবেশ | সুফি সাধক |”

 

এবার নিত্য নতুন প্রশ্ন নিয়ে লালন গুরুর কাছে হাজির হতে থাকলেন | বিশ্ব সংসার ও বিচিত্র জগৎ নিয়ে লালনের হাজার কৌতূহল | সে সব কৌতূহলের নিরসন সিরাজ সাঁই | ধীরে ধীরে তিনি লালনকে শেখালেন সাধনার আর এক রূপ রংমহলের কথা | সে আসলে দেহতত্ত্বের কথা | মানব দেহ এক রংমহল | তবে সেখানে তালা লাগানো | রংমহলের ভিতরে প্রবেশ করতে গেলে সেই তালা খোলা শিখতে হয় | লালন তাই সিরাজ সাঁইয়ের কাছে নিয়ম মতো দীক্ষা নেন | মনের মধ্যে ব্যাকুলতা জাগে মনের মানুষরে সন্ধান পাওয়ার জন্য | একাকী ভাবের ঘোরে গান গান বাঁধেন —– “আমার মনের মানুষরে সোনে, মিলন হবে কত দিনে |”

 

লালন যত গুরুর নির্দেশিত পথে সাধনমার্গে এগোতে থাকেন তত নতুন নতুন উপলব্ধির সাধ পেতে থাকেন | আর সেই সব উপলব্ধি কাব্য হয়ে সুর হয়ে গান হয়ে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে |

 

জনশ্রুতি আছে, ছেউড়িয়া মৌজায় লালন-ভক্ত মলম-শাহ কারিকর লালন ফকিরকে সাড়ে ১৬ বিঘে জমি দান করে | তাঁর উপরে লালন ফকির তাঁর আখড়া গড়ে তোলেন বাংলা ১২৩০ সালে | ছেউড়িয়ায় এসে থিতু হওয়ার পর লালন প্রথম দিকে গ্রামের বাইরে একটি বনের মধ্যে আমগাছের তলায় বসে সাধনা করতেন | ধীরে ধীরে তাঁর আধ্যাতিক উন্নতি হতে থাকে | গ্রামের লোকজন তাঁকে গুরু মানতে শুরু করে | পরবর্তী কালে কখনও একা কখনও শিষ্য সঙ্গী নিয়ে পাবনা জেলা রাজশাহী, ফরিদপুরের পথে চলে যেতেন | ক্রমে শিষ্য সংখ্যা বাড়তে শুরু করে |

 

মানুষের জন্য লালনের প্রাণ সর্বদা কাঁদত | মানুষরে সেবার জন্য কবিরাজি চিকিৎসাও শুরু করেন তিনি | তিনি কেবল সাধক ফকির ছিলেন না | দুনিয়াদারির খবরও রাখতেন | ছিলেন স্বভাবকবি | প্রাণে ভাব এলে গান রচনা করতেন আর তাঁর শিষ্যেরা তা লিখে রাখতেন | তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু হরিনাথের উদ্যোগে তাঁর ‘ব্রহ্মান্ডবেদ’ সংকলনে প্রথম লালনের গান মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করেন ১২৯২ সালে | গানটি ছিল —— ‘কে বোঝে সাঁইয়ের লীলা খেলা’ |

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সঙ্গে লালনের কখনও সাক্ষাৎ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়না | তবে সিলাইদহে লালনের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে রবিঠাকুরের প্রায়ই লালনের গান ও দর্শন নিয়ে কথা হতো |

 

দিনাজপুরে এক দরবেশের কোথায় —- “সব বাউল দরবেশ নন | কিন্তু লালন ফকির ছিলেন দীক্ষায় দরবেশ আর সাধনায় বাউল”|