মেঘনাদ-বধ কাব্য, ছুছুন্দরী-বধ কাব্য ও স্বামীজী

By: Anasuya Sen

August 4, 2021

Share

ছবি সৌজন্যে: Google

সময়টা তখন উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ | বাংলার পরিবেশ তখন রীতিমতো ঘটনাবহুল আর মেজাজটি ছটফটে —– রবীন্দ্রগানের ভাষায় ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক’ ! রাজা রামমোহন রায় বিলেত গেলেন সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সওয়াল করতে, আইন পাশ করাতে | কলকাতায় সম্পন্ন ঘরের ছেলেদের ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে শুরু হচ্ছে হিন্দু কলেজ (পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্সি কলেজ) | শ্রীরামপুর থেকে প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা খবরের কাগজ | তারুণ্য ভরপুর ছাত্রদের নিয়ে ‘ইয়ং বেঙ্গল সোসাইটি’ গড়ে তুলছেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিয়ো এবং ডাক দিচ্ছেন সকলপ্রকার পুরাতন ধর্মীয় বেড়াজাল ভেঙে ফেলতে আর একদিকে অনুশাসনের রাজশক্তি ও অন্যদিকে সমাজপতিদের দ্বারা চাপিয়ে দেওয়াসমস্ত অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে | কবি মধুসূদন  দত্ত ছিলেন এই ‘ইয়ং বেঙ্গল’ আন্দোলনের ফসন | তিনি ছিলেন হিন্দু কলেজের অন্যতম সেরা প্রতিভাবান ছাত্র | প্রকৃতিতে আপোষহীন ও বিদ্রোহী | ইংরেজি শিক্ষায় উচ্চস্তরের শিক্ষাপ্রাপ্ত এবং আপাদমস্তক সাহেবি কায়দায় বেড়ে উঠলেও ভারতীয় সাহিত্য, দর্শন ও সভ্যতার প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ | তবে তিনি ছিলেন পুরুষকারের পূজারী, দৈবের নয় তাই ‘রামায়ণ মহাকাব্যের  রাবন’ হলেন তাঁর প্রিয়তম বীর | রামের হাতে রাবনের বিপর্য্যয় তাঁকে সুতীব্র ভাবে বেদনাহত করল | তিনি লিখলেন ——– “I despise Ram and his rabble. The idea of Ravan elevates and kindles my imagination.”

 

বিদ্রোহের সঙ্গে সঙ্গে কবিপ্রতিভা এবং কবি হিসেবে স্বদেশে এবং বিলেতে যশ লেভার ইচ্ছা ছিল তাঁর রক্তে | ১৮৪৮ সালে তিনি ইংরেজী ভাষায় রচনা করেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ | কিন্তু সে কাব্য জনপ্রিয় হলনা | বেথুন সাহেব তাঁকে ইংরেজীতে না লিখে মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা করার উপদেশ দিলেন |

 

১৮৬১ সালে, মধুসূদন অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচনা করলেন ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ | আজ থেকে ১৬০ বছর আগে রামকে গুরুত্ব না দিয়ে রাবণকে আপন করে যেভাবে তিনি নতুন ভাব-ভাষা-ছন্দ-রূপকল্প ও ভঙ্গিতে এই কাব্য রচনা করলেন তা ছিল অকল্পনীয় | তাঁর কাব্যের মধ্যে দিয়ে পাঠককূল ‘রামায়ণ’ – কাহিনীনিকে নতুন করে দেখতে শিখল | পন্ডিতরা ধন্য ধন্য করলেন, অনেকে বিখ্যাত ইংরেজ কবি মিল্টনের রচিত কাব্য  ‘Paradise Lost ‘ -এর সঙ্গে তুলনা শুরু করলেন | কবি মধুসূদন কিন্তু সে প্রশংসায় বিচলিত হলেন না, লিখলেন —— “—মিল্টনের থেকে ভাল আর কিছুই হতে পারে না —- মিল্টন ঐশ্বরিক |”

 

সে যুগের  উজ্জ্বল সাহিত্যিক তথা সমগ্র মহাভারতের বাংলাভাষায় অনুবাদকারী কালীপ্রসন্ন সিংহ মহাশয়ের নেতৃত্বে  ‘বিদ্যাৎসাহিনী সভা’ সংবর্ধনা দিলেন মধুসূদনকে | উপহার দিলেন রুপোর সুদৃশ্য পানপাত্র | অভিনন্দিত করে বললেন —– “আপনি বাংলা-ভাষার আদিকবি বলিয়া পরিগণিত হইবেন, আপনি বাংলাভাষাকে অনুত্তম অলঙ্কারে অলঙ্কৃত করিলেন, আপনা হইতে একটি নূতন সাহিত্য বাংলাভাষায় আবিষ্কৃত হইল |”

 

কিন্তু কাব্যপাঠকেরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে গেলেন | এই প্রসঙ্গে পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় লিখলেন — “বঙ্গীয় পাঠকজন মধুসূদনের স্বপক্ষ ও বিপক্ষ, দুই দলে বিভক্ত হইল | একদল ‘প্রাদানিয়া’, ‘সন্তনিয়া’, বলিয়া উপহাস করিতে লাগিল | এবং মধুসূদনের অনুসরণে কাব্য লিখিয়া তাঁহাকে অপদস্থ করার চেষ্টা করিতে লাগিলেন | তাহার প্রমাণস্বরূপ ‘ছছন্দরী-বধ’ কাব্যের উল্লেখ করা যাইতে পারে |

 

প্রকৃতপক্ষে তার আগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশেষ্যপদের গড়ন পাল্টে ক্রিয়াপদ হিসেবে—– যেমন প্রদানিয়া (প্রদান কোরিয়া), সন্তনিয়া (সান্তনা দিয়া) ইত্যাদি প্রয়োগ কখনও ছিলনা | ‘মেঘনাদ-বধ’ কাব্যে ভাষায় ওজস্বীতা ও নুতন্তের স্বাদ আনার জন্য মধুসূদন এটি করেছিলেন |

 

১৮৬৮ সালে ‘ছুছুন্দরী বধ’ কাব্য প্রকাশিত হয় | লেখক হলেন জগবন্ধ ভদ্র | বাংলা ১২৭৫ সালে অমৃতবাজার পত্রিকার অশ্বিন সংখ্যায় ‘ছুছুন্দরী কাব্য’ প্রকাশিত হতে পাঠকমহলে শোরগোল পড়ে যায় | এটি আসলে মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ কাব্যের’ একটি প্যারোডি | মধুসূদনের রচনা-ভঙ্গীকে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করে তার রচনা | যারা শিক্ষিত ও রসপিপাসু তাঁরা এই প্যারোডি উপভোগ করলেন | রাজনারায়ণ বসু লিখলেন —- “আমি ইংরাজিতে হোমর প্রভৃতি কবির অনুকরণ পাঠ করিয়াছি | কিন্তু এই হাস্যকর অনুকরণটি তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট | অনেকে মনে করেন যে ব্যক্তি এইরূপ হাস্যকর অনুকরণ রচনা করেন, তিনি কবির অমর্য্যাদা করেন | বাস্তবিক তাহা নহে” |

 

এই প্যারোডি কাব্য সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিক্রিয়ার অনুষঙ্গে আমরা পেয়ে যায় কবি মধুসূদন ও তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ সম্পর্কে স্বামীজীর সপ্রশংস মূল্যায়ন |  সাহিত্যিকতা এবং কবিপ্রাণতা অঙ্গাঙ্গিভাবে স্বামীর সঙ্গে জড়িত ছিল | এর প্রমান তাঁর ইংরেজী ও বাংলায় লিখিত কবিতাবলী ও সংগীতসমূহ | এছাড়া তাঁর কাছ থেকে আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের স্বরূপ সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত পেয়েছি, যা আমাদের সাহিত্য – ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছে |

 

স্বামীজীর প্রিয় শিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী রচিত ‘স্বামী-শিষ্য সংবাদ’ গ্রন্থে স্বামীজী কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক গ্রন্থকার শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে কবি ভারতচন্দ্রের সাহিত্য-কৃতির আলোচনা প্রসঙ্গে স্বামীজী কবি মধুসূদনের নাম উল্লেখ করে বলেন —– “ঐ একটা অদ্ভুত Genius  তোদের দেশে জন্মেছিল | মেঘনাদবধের মত দ্বিতীয় কাব্য বাংলা ভাসতে তো নাই-ই, সমগ্র ইউরোপেও অমন একখানা কাব্য ইদানিং পাওয়া দুর্লব |” এরপরেই মধুসূদনের শব্দাড়ম্বরপ্রিয়তার কথা তুলতেই কবির সপক্ষে স্বামীজী বলেন —- “তোদের দেশে কেউ কিছু নতুন করলেই তোরা তাকে তাড়া করিস | আগে ভাল করে দেখ লোকটা কী বলছে, তা না যাই কিছু আগেকার মত না হলো অমনি দেশের লোকে তাঁর পিছু লাগল | এই ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ —- যা তোদের বাংলা ভাষার মুকুটমণি —— তাকে অপদস্থ করতে কিনা ‘ছুঁচো বধ কাব্য’ লেখা হলো | তা যত পারিস লেখ না তাতে কি? সেই ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ এখনও হিমাচলের নেয় অটল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে | কিন্তু তার খুঁত ধরতেই যাঁরা ব্যস্ত ছিলেন সেই Critic -দের মত ও লেখাগুলি কোথায় ভেসে গাছে | মাইকেল নতুন ছন্দে, ওজস্বীনি ভাষায় যে কাব্য লিখে গেছেন —– তা সাধারণ কি বুঝবে?”

 

নয়টি সর্গ – সমন্বিত এই মহাকাব্যের সপ্তম সর্গ ‘শক্তিনির্ভেদ’ সর্গটির বীররসের প্রতি স্বামীজীর স্ববিশেষ আকর্ষণ ছিল | স্বামীজী শরৎচন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করেন, “বল দিকি —- এই কাব্যের কোন অংশটি সর্ব্বোৎকৃষ্ট?” উত্তরে স্বামীজী নিজেই জানান, ‘যেখানে ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধে নিহত হয়েছে, মন্দোদরী শোকে মুহ্যমানা হয়ে রাবণকে যুদ্ধে যেতে নিষেধ করছে, কিন্তু রাবন পুত্রশোক মন থেকে জোর করে ঠেলে ফেলে মহাবীরের নেয় যুদ্ধে কৃতসংকল্প, প্রতিহিংসা পি ক্রোধানলে স্ত্রীপুত্র সব ভুলে যুদ্ধের জন্যে বহির্গমনোন্মুখ —– সেই স্থান হচ্ছে কাব্যের শ্রেষ্ট কল্পনা | যা হবার হোকগে —- আমার কর্তব্য আমি ভুলবো না, এতে দুনিয়া থাকে আর যাক  —– এই হচ্ছে বীরের বাক্য | মাইকেল অনুপ্রাণিত হয়ে কাব্যের ওই অংশ লিখেছিলেন “| এরপরেই স্বামীজী সেই অংশটি আন্তমগ্ন হয়ে উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করতে শুরু করেন | স্বামীজীর এই অনুরাগের মধ্যে আমরা সেই কঠিন – ব্রতী বীর সন্ন্যাসীকেই প্রতক্ষ করি, যিনি লক্ষে উপনীত হবার পথের সকল বাঁধাকে চূর্ণ করে প্রত্যয় – দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়েছিলেন | কবি মধুসূদনের মূল্যায়নের মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন স্বামী বিবেকানন্দ স্বয়ং |

 

আসলে সে যুগটা ছিল গুণগ্রাহীতার ও রোসাসাধনের, এত রাগা-রাগী চটা-চটির নয় | শোনা যায় যে কলকাতা হাই কোর্টের বার লাইব্রেরিতে বসে কবি – ব্যারিস্টার মধুসূদনও নাকি নিজের সেই সুবিখ্যাত কাব্যের প্যারোডি ‘ছুছুন্দরী বধ কাব্য’ শুনে খুব হেসেছিলেন |